ইসলাম শিক্ষা (৮ম)

১। অনুচ্ছেদটি পড় এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:

অন্তরে প্রতারণা, শঠতা ও কুফরি ভাব রেখে অনেকে প্রকাশ্যে আল্লাহর আনুগত্য ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য় দেখায়। এরূপ দ্বিমুখী ব্যক্তিরা মিথ্যা বলে, ওয়াদা ভঙ্গ এবং আমানতের খিয়ানত করে। এহেন জঘন্যতম পাপ কাজে একমাত্র মুনাফিকরাই রত হয়। যাদের পরিণতি খুবই ভয়াবহ।

 ক. নিফাক শব্দের অর্থ কী?

 খ. মুনাফিক কাকে বলে?

 গ. কোন কোন লক্ষণ দেখে একজন মুনাফিককে তুমি চিহ্নিত করবে?

 ঘ. মুনাফিকদের সামাজিক দুর্গতির কারণগুলো কী কী? উল্লেখ কর।

উত্তর:

ক জ্ঞান: নিফাক: নিফাক আরবি শব্দ। শব্দটির শাব্দিক অর্থ হলো_প্রতারণা, ধোঁকাবাজি, ভণ্ডামি, কপটতা ও দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করা।

সংজ্ঞা: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়_ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবার আশায় অন্তরে কুফরিভাব ও অবাধ্যতা গোপন রেখে বাহ্যিকভাবে ইসলামের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা ও লোক দেখানো ইবাদত করাকে নিফাক বলে। আর যে ব্যক্তি এরূপ আচরণ করে তাকে বলা হয় মুনাফিক।

খ. অনুধাবন: মুনাফিক কে?

মুনাফিক শব্দটি আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ কপট, ভণ্ড, ধোঁকাবাজ, ও দ্বিমুখী ভাব পোষণকারী। (Vileness, hypocrisy and cheating). ইসলামী পরিভাষায়_ যে ব্যক্তি অন্তরে কুফর ও অবাধ্যতা গোপন রেখে মুখে ঈমানদারসূলভ বাক্য উচ্চারণ করে এবং লোক দেখানো ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা ইবাদাত করে তাকে মুনাফিক বলে।

মুনাফিকরা কাফির, মুশরিকদের থেকেও নিকৃষ্ট। কাফিররা প্রকাশ্যে কিন্তু মুনাফিকরা গোপনে ইসলামের ক্ষতিসাধন করে।

গ. প্রয়োগ: যেসব লক্ষণ দেখে একজন মুনাফিককে চিহ্নিত করা যায়:

হাদীসে মহানবী (স) মুনাফিকদের পরিচয় দিয়ে বলেছেন_

মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি_যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তা খেলাফ করে, যখন তার কাছে কোনো আমানত রাখা হয়, তার খিয়ানত করে। (বুখারী)

এছাড়াও মুনাফিকদের চিহ্নিত করার আরও কতকগুলো আলামত হলো_

১) মুনাফিকদের যখন বলা হয় _ “তোমরা প্রকৃত ঈমানদারের মতো হয়ে যাও তখন তারা বলে, আমরা কি নির্বোধের ন্যায় ঈমান আনব।” (সূরা বাকারা)

২) তারা সমাজে সব সময় অশান্তি সৃষ্টি করে এবং লোকদের ভালো কাজে বাধা প্রদান করে।

৩) তাদের কথা ও কাজে মিল থাকে না এবং সব সময় মিথ্যার আশ্রয় নেয়।

৪) মুনাফিকরা দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করে। অর্থাৎ কাফির ও মুসলমানদের উভয় দলেই থাকতে চায় এবং উভয় দল থেকেই ফায়দা লুটতে চায়।

মুনাফিকরা কাফিরদের চেয়ে জঘন্য ও খারাপ। কাফিররা প্রকাশ্যে কিন্তু মুনাফিকরা গোপনে ইসলামের ক্ষতি সাধন করে। এজন্যই আল্লাহর কঠোর শাস্তি তাদের জন্য অবধারিত। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন- “নিশ্চয়ই মুনাফিকদের স্থান জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে”। (সূরা নিসা: ১৪৫)

অথবা: ব্যবসা-বাণিজ্যে কখন এবং কীভাবে একজন ব্যবসায়ী মুনাফিক হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে? (প্রয়োগ)

উত্তর: আল্লাহ তায়ালা মানুষকে নির্দেশ করেছেন সৎভাবে হালাল রিযিক উপার্জন করতে ও সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে। এবং মানুষের সেবা করতে।

মূলত মানুষের সেবার জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ সেবার সর্বোচ্চ সুযোগ ব্যবসায়ীদের মুঠোয়। তারাই পারেন সৎ ব্যবসার মাধ্যমে জনসেবার সর্বোচ্চ স্বাক্ষর রেখে জান্নাতেরর্ স্বোচ্চ মাকাম অর্জন করে নিতে।

কিন্তু একজন ব্যবসায়ী যখন_

* ব্যবসার সম্পদ মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মালামালের দাম দ্বিগুণ থেকে কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে জনগণকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়, তখন সে অভিশপ্ত মুনাফিক হিসেবে গণ্য হয়।

* ব্যবসায়ী যখন মালে ভেজাল মেশায়, যখন মিথ্যা শপথ করে ব্যবসার পণ্যের দোষ-ত্রুটি গোপন রেখে ক্রেতাসাধারণকে ঠকায় তখন তাকে মুনাফিক বললে অত্যুক্তি হবে না।

* ব্যবসায়ী যখন ওজনে কম দিয়ে ক্রেতাসাধারণকে ক্ষতিগস্ত করে তখন সে অভিশপ্ত মুনাফিকে পরিণত হয়।

* ব্যবসায়ী যখন উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে মধ্যস্বত্ব ভোগী একদল দালাল তৈরি করে যেকোনো পণ্যকে গলা কাটা দামে জন সাধারণকে কিনতে বাধ্য করে তখন তাকে ধোঁকাবাজ মুনাফিকে অভিযুক্ত করা যুক্তিসঙ্গত।

অতএব, প্রতারণা, ধোঁকাবাজি ও জুলুমের আশ্রয় নেয়ার কারণে যে কোনো ব্যবসায়ী মুনাফিক বা জাতীয় বেঈমান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

ঘ. উচ্চতর দক্ষতা: “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে।” আয়াত খানার বিশ্লেষণ।

নিফাক জঘন্যতম পাপ। আর এই নিফাকের ব্যাধি যাদের রয়েছে তাদের অপকর্মের বর্ণনা দিয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা সূরা “মুনাফিকুন” নামে একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল করেন। এছাড়া ও পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় মুনাফিকদের অভ্যাসগুলো আল্লাহ তুলে ধরেছেন।

মুনাফিকরা অন্তরে অবিশ্বাস ও অবাধ্যতা লুকিয়ে রেখে বাহ্যিকভাবে মুসলমানসূলভ লোক দেখানো আচার অনুষ্ঠান করে। তাই তারা কাফির অপেক্ষাও মারাত্মক ক্ষতিকর ইসলামের দুশমন।

এরা ইসলাম ও মুসলমানদের জঘন্য শত্রু। কারণ এরা সমাজকে প্রতারিত করে বিভিন্ন সুযোগ_সুবিধা ভোগ করে থাকে। সমাজ ও জাতির গোপন দুর্বলতা সম্পর্কে শত্রুকে অবহিত করে শত্রুর গুপ্তচর হিসেবে কাজ করে। প্রকাশ্য দুশমন থেকে সাবধান থাকা যায়, কিন্তু গোপন শত্রুর অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকা কঠিন। মুনাফিকরা গোপন ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা করে মুসলমানদের ক্ষতি করে।

এদের চরিত্র সম্পর্কে আল্লাহ বলেন_ “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী”।

আল্লাহ আরো বলেন_ মুনাফিকরা তাদের শপথগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত্ত রাখে। (সূরা মুনাফিকুন:২)

তাই এদের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ পাক জানিয়ে দেন, “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে।” তারা দুনিয়াতে ও লাঞ্চিত ও চির ঘৃণিত আর আখেরাতে তারা সবচাইতে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে।

 প্রশ্ন-২: অনুচ্ছেদটি পড় এবং নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :

আতিক, আরিফ ও আসিফ ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কয়েকদিন আগে আতিক তার একটি বই আসিফকে ধার দেয়। আতিক আসিফের কাছে বইটি ফেরত চাইলে আসিফ তা অস্বীকার করে। অর্থাৎ, বইটি সে নেয়নি বলে জানায়। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। আতিক আসিফকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে। বিষয়টি মীমাংসার জন্য তারা শিক্ষক মহোদয়ের শরণাপন্ন হয়। তিনি তাদেরকে বলেন, ”তোমরা নিফাক করেছ। তোমরা সংশোধিত না হলে মুনাফিক হয়ে যাবে। নিফাক সমাজ, পরিবার ও জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।”

 ক. নিফাক শব্দের অর্থ কী?

 খ. আতিক ও আফিসের কর্মকাণ্ড নিফাকের পর্যায়ে পড়ে কেন?

 গ. আতিক ও আসিফকে নিফাক থেকে বিরত থাকার জন্য শিক্ষক কী কী উপদেশ দিতে পারতেন? ব্যাখ্যা কর।

 ঘ. ”নিফাক সমাজ, পরিবার ও জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।”- কুরআন ও হাদিসের আলোকে উক্তিটির সত্যতা যাচাই কর।

উত্তর:

ক. জ্ঞান: নিফাক : নিফাক আরবি শব্দ। এটি নাফাকুন মূল ধাতু থেকে এসেছে। শব্দটির শাব্দিক অর্থ হলো কপটতা, প্রতারণা, ধোঁকাবাজি, ভন্ডামি, দ্বিমুখীভাব পোষণ করা।

খ. অনুধাবন: আতিক ও আসিফের কর্মকাণ্ড যে কারণে নিফাকের পর্যায়ে পড়ে: অনুচ্ছেদটি পাঠ করে আমরা জানতে পারি যে, আসিফ আতিকের কাছ থেকে একটি বই ধার নেয়। আতিক বইটি ফেরত চাইলে তা অস্বীকার করে অর্থাৎ আসিফ বইটি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা কথা বলে। মহানবী (স) একটি হাদিসে নিফাকের যে তিনটি চিহ্নের কথা বলেছেন, মিথ্যা তন্মধ্যে একটি। এদিক থেকে বিচার করলে আসিফের কর্মকাণ্ড নিফাকের পর্যায়ে পড়ে। অন্যদিকে, আতিক আসিফকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে। মহানবী (স) অন্য একটি হাদিসে অশ্লীল ভাষায় কথোপকথনকে নিফাক বলে অভিহিত করেছেন। সে হিসেবে আতিকের কর্মকাণ্ডও নিফাকের পর্যায়ভুক্ত।

গ. প্রয়োগ: শিক্ষক যেসব উপদেশ দিতে পারতেন : শিক্ষক আতিক ও আসিফকে নিফাক থেকে বিরত রাখতে আরও কিছু উপদেশ দিতে পারতেন। যেমন-মানুষ দুনিয়াবি স্বার্থ, লোভ, ভয় প্রভৃতির কারণে মুনাফিকী করে থাকে। দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। তোমরা মুনাফিকী থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখবে। যদি তোমরা জীবনে সবসময় সভ্য কথা বল, ওয়াদা ভঙ্গ না কর, আমানতের খিয়ানত না কর এবং ঝগড়ার সময় গালিগালাজ ও অশ্লীল ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাক তাহলে তোমরা জীবনে অনেক সফলতা লাভ করতে পারবে। লোকে তোমাদেরকে সম্মান করবে। সর্বোপরি, আল্লাহ তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট হবে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের কল্যাণ হবে।

ঘ. উচ্চতর দক্ষতা: কুরআন ও হাদিসের আলোকে উক্তিটির সত্যতা যাচাই : নিফাক মানুষকে ইসলামের মৌলিক আকীদা, বিশ্বাস থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যে ব্যক্তির অন্তর নিফাকে পূর্ণ তার দ্বারা নানা ধরনের হীন ও পাপ কাজ সংঘটিত হতে পারে। কারণ সে তখন আল্লাহর পথে পরিচালিত না হয়ে নফস বা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে, সে পাপাচারে লিপ্ত হয়। তখন মিথ্যাবাদিতা, ওয়াদা ভঙ্গ এবং আমানতের খিয়ানত চলতে থাকে। অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা চরমভাবে দেখা যায়।

আল্লাহ বলেন, (ইন্নাল মুনাফিকীনা লাকাযিবুন)- ”নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী।” আল্লাহ অন্যত্র বলেন, (ইত্তাখাযু আইমানুহুম জুন্নাতান ফাসাদ্দু আন সাবীলিল্লাহ) অর্থ: ”তারা নিজেদের শপথসমূহকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং তারা অন্যদেরকে আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত্ত রাখে।”

নিফাক চলতে থাকলে সার্বিকভাবে সকল প্রকার অন্যায়, মিথ্যা, অবিশ্বাস প্রভৃতি সমাজে শিকড় গেড়ে বসে। ফলে সে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নানারকম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। অন্যদিকে, পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা।

মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s