জিহাদ

জিহাদ শব্দটি কুরআনের একটি পরিভাষা জিহাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে চেষ্টাসাধনা করা বা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো বা সংগ্রাম করা ঈমানের দাবি হচ্ছে জিহাদ ঈমানের সর্বোচ্চ চূড়া জিহাদ জিহাদ নিয়ে আতঙ্ক বিভ্রান্তির কিছু নেই জিহাদ হচ্ছে কোনো ল্য অর্জনে জান, মাল, মেধা, চরিত্র, জ্ঞানসহ সর্বপ্রকার কলাকৌশল প্রয়োগ করে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো কেউ কোনো কিছু অর্জন করতে চাইলে, সে তার জন্য অবশ্যই চেষ্টাসাধনা করবে যে ধর্মনিরপে মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায় সে তা প্রতিষ্ঠার জন্যই জিহাদ বা চেষ্টাসাধনা করবে যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় সে তা প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ বা চেষ্টাসাধনা করবে যে ব্যক্তি আল্লাহর আইন চায়, সে ব্যক্তি অবশ্যই সে আইন প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ বা চেষ্টাসাধনা করবে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা আল্লাহ তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে তারা সংগ্রাম করে আল্লাহর পথে, আর যারা আল্লাহর সাথে কুফরি করছে তারা সংগ্রাম করে তাগুতের পথে অতএব তোমরা সংগ্রাম করো শয়তান তার চেলাচামুণ্ডাদের বিরুদ্ধে’ (সূরা আন নিসা৭৬) অথচ জিহাদ কথাটি এখন এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন খোলা তরবারি হাতে মৃত্যুর যমদূত তেড়ে আসছে, যাকে সামনে পাবে তাকেই হত্যা করবে জিহাদ সম্পর্কে এমন ধারণা সঠিক নয় আসলে জিহাদ হতে হবে মেধা, চরিত্র, সম্পদ প্রয়োজনে জীবন দানের মাধ্যমে আক্রান্ত হলে প্রতিবাদ প্রতিরোধ করতে জীবন দানের প্রশ্ন আসবে, তখন মারতে হবে আর অবস্থায় মরতেও হতে পারে কোনো অবস্থাতেই আগে আক্রমণ করা যাবে না

জিহাদ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ হচ্ছে, ‘আর তোমরা আল্লাহর জন্য জিহাদ করো, যেমনি জিহাদ করা প্রয়োজন তিনি দুনিয়ায় নেতৃত্বের জন্য তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে কোনো সঙ্কীর্ণতা রাখেননি তোমরা তোমাদের (জাতির) পিতা ইব্রাহিমের মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো আল্লাহ আগেই তোমাদের নাম মুসলিম রেখেছিলেন আর কুরআনেও যেন রাসূল সা: তোমাদের জন্য সাী হন, আর তোমরা সাী হও সব লোকের জন্য অতএব তোমরা সালাত কায়েম করো, জাকাত আদায় করো এবং আল্লাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো তিনিই তোমাদের অভিভাবক, তিনি বড়ই উত্তম অভিভাবক সাহায্যকারী’ (সূরা হজ৭৮) ওই আয়াতে জিহাদের নির্দেশসহ কিভাবে কেন জিহাদ করতে হবে আল্লাহ তায়ালা তা ব্যক্ত করেছেন

আয়াতে প্রথমত নির্দেশ হচ্ছে, তোমরা আল্লাহর জন্য জিহাদ করো হক আদায় করে, যেমনি জিহাদ করা প্রয়োজন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ করো তোমাদের জান মাল দিয়ে’ (আস সাফ১১)নিশ্চয়ই ঈমানদার ব্যক্তি হচ্ছে তারা, যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাঁর রাসূল সা:-এর ওপর অতঃপর কোনো প্রকার সন্দেহসংশয় পোষণ করেনি এবং তারা তাদের জান মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে এরাই হচ্ছে ঈমানের দাবিতে সত্যবাদী’(সূরা হুজরাত১৫)তোমরা কি মনে করো এমনি এমনিই তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করে যাবে? অথচ আল্লাহ পরীার মাধ্যমে কথা জেনে নেবেন না যে, কে আল্লাহর পথে জিহাদ করতে প্রস্তুত হয়েছে এবং কে বিপদে ধৈর্য ধারণ করেছে’ (সূরা আল ইমরান১৪২)যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে; তারাই আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশা করতে পারে’ (বাকারা২১৮)হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর দিকে (ধাবিত হওয়ার জন্য) উপায় খুঁজতে থাকো (তার বিশেষ একটি উপায় হচ্ছে) তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ করো’ (আল মায়েদা৩৫)হযরত আবুযার রা: হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদা রাসূল সা:-কে প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল সা: কোন আমল সর্বোত্তম বা উৎকৃষ্ট তা আমাকে বলে দিন উত্তরে রাসূল সা: বললেন, আল্লাহ তায়ালার প্রতি ঈমান এবং তাঁর পথে জিহাদ হচ্ছে সর্বোত্তম আমল’ (বুখারি মুসলিম) হজরত উবাদা ইবনুস সামেত রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমরা যেখানেই থাকো আল্লাহর আইন দণ্ডবিধি কার্যকর করবে এবং অবশ্যই আল্লাহর পথে জিহাদ করবে’ (মুসনাদে আহমদ বায়হাকি) হক আদায় করে জিহাদের ব্যাপারে হজরত ইবনে আব্বাস রা: বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের আশায় জিহাদ করা, তাতে জাগতিক নাম যশ বৈষয়িক কোনো লাভের আশা না করা, জিহাদে পূর্ণ শক্তি ব্যয় করা, কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারে কর্ণপাত না করাই হচ্ছে জিহাদের হক

আরো বলা হয়েছে, ‘তিনি (আল্লাহ দুনিয়ায় নেতৃত্বের জন্য) তোমাদের মনোনীত করেছেন, আর দ্বীনের ব্যাপারে কোনো প্রকার সঙ্কীর্ণতা রাখেননি আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টির সূচনালগ্নে ফেরেশতাদের ডেকে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি পাঠাতে চাই’ (সূরা বাকারা৩০) অতএব আল্লাহর প্রতিনিধিগণই দুনিয়ায় নেতৃত্ব দেবে এটাই স্বাভাবিক আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করার েেত্র করণীয় বর্জনীয় বিধিবিধানগুলো মেনে নেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ভালো কথাগুলো যে সত্য বলে মেনে নেবে, আমি অবশ্যই তার চলার পথ সহজ করে দেবো’ (সূরা আল লাইল ) আরো বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান শক্ত করে আঁকড়ে ধরবে, সে অবশ্যই সোজা পথ পাবে’ (সূরা আল ইমরান১০১)আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত জীবনবিধান বা দ্বীন হচ্ছে ইসলাম’ (সূরা আল ইমরান১৯) আরো বলা হয়েছে, ‘আজকের এই দিনে আমি তোমাদের জন্য দ্বীন পরিপূর্ণ করে দিলাম এটা আমার থেকে তোমাদের জন্য আমার প্রতিশ্রুত নিয়ামত আর আমি ইসলামকেই তোমাদের জন্য জীবনবিধান হিসেবে মনোনীত করে দিলাম’ (সূরা আল মায়েদা) অতএব দ্বীনের ব্যাপারে কোনো সঙ্কীর্ণতার অবকাশ নেই

আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করছেন, ‘তোমরা তোমাদের (জাতির) পিতা ইব্রাহিমের মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকো আল্লাহ তায়ালা আগেই তোমাদের নাম রেখেছিলেন মুসলিম, আর কুরআনেও মিল্লাত শব্দের অর্থ হচ্ছে জাতি বা দল আল্লাহ তায়ালা বলছেন, ‘(হে নবী) আপনি তাদের বলে দিন, অবশ্যই আমার প্রতিপালক আমাকে সঠিক পথ দেখিয়েছেনÑ যা ছিল সুপ্রতিষ্ঠিত জীবনবিধান, এটাই হচ্ছে ইব্রাহিমের একনিষ্ঠ পথ তিনি কখনো মোশরেকদের দলভুক্ত ছিলেন না’ (সূরা আনয়াম১৬১) ইব্রাহিম ইসমাইল : দুজনেই কাবাঘর মেরামতের পর দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমাদের রব, তুমি আমাদের দুজনকেই তোমার মুসলিম বান্দা বানাও আর আমাদের বংশধর থেকেও তোমার একদল মুসলিম বান্দা বানিয়ে দাও’ (সূরা বাকারা১২৮) রাসূল সা: বলেছেন, ‘সব মানুষই দ্বীনের েেত্র কোরাইশদের অনুগামী’ (মাযহারি) মূলত ইব্রাহিম : ছিলেন কোরাইশ বংশেরই লোক মুসলিম নাম রাখার কারণ, আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করছেন, ‘যখন আমি তাকে (ইব্রাহিমকে) নির্দেশ দিলাম, মুসলিম হয়ে যাও, সে বলল আমি সৃষ্টিকুলের মালিকের আনুগত্য স্বীকার করছি’ (বাকারা১৩১)

আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, যেন রাসূল সা: তোমাদের ব্যাপারে সাী থাকেন, আর তোমরা যেন সাী হও সব লোকের জন্য রাসূল সা: আমাদের যে দ্বীনের মধ্যে রেখে গেছেন তা ছিল পরিপূর্ণ সূরা আল মায়েদার নম্বর আয়াতে ব্যাপার উল্লেখ আছে সবশেষে রাসূল সা: কথাও বলে গেছেন, আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যে পর্যন্ত তোমরা দুটি জিনিস আঁকড়ে ধরে রাখবে সে পর্যন্ত তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না তার একটি হলো আল্লাহর কুরআন অপরটি আমার সুন্নাহ বা হাদিস’ (মাযহারি) আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সাী বানাবেন, অন্যান্য নবীর অনুসারী যেমনÑ ইহুদি, খ্রিষ্টানসহ আরো যত মত পথের লোক আছে যেমনÑ ধর্মনিরপেবাদী, জাতীয়তাবাদী, সমাজতান্ত্রিক প্রভৃতি তাদের ভুল ভাঙানো বা তাদেরকে আল্লাহর দ্বীনের পথে আহ্বান করা হচ্ছে আমাদের দায়িত্ব আমরা যদি দায়িত্ব পালন না করি তাহলে আমাদের আশপাশে যার বসবাস যেমনÑ স্ত্রী, পুত্রকন্যা, ভাইবোন, পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের পাশ কাটিয়ে কেউই মুক্তি পাবো না কারণ হাশরের দিন জাহান্নামিদের শেষ ফরিয়াদের কথা সূরা আরাফ৩৮ হামিম আস সাজদা২৯ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে

আরো নির্দেশ হচ্ছে, অতএব তোমরা সালাত কায়েম করো জাকাত আদায় করো তোমরা আল্লাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো সালাত কায়েম করা আর জাকাত আদায় করা এটা সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘আমি যদি (মুসলমানদের) জমিনে প্রতিষ্ঠা দান করি (রাষ্ট্রীয় মতা দিই) তা হলে তার দায়িত্ব হবে সালাত কায়েম করা, জাকাত আদায় করা’ (সূরা হজ৪১) আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীন বা আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা যে রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন বা দ্বীন কায়েম থাকবে সে রাষ্ট্রে অশ্লীলতা, ুধাদারিদ্র্য থাকবে না আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘আর জনপদের মানুষ যদি আল্লাহর ওপর ঈমান আনত, আর তাঁকে ভয় করে (তাঁর আইন মেনে) চলত, তাহলে আমি তাদের জন্য আসমান জমিনের সমস্ত বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম’ (সূরা আরাফ৯৬) আল্লাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার অর্থ হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ বা সংগঠিত হওয়া আরো বলা হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর রশিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরো এবং কখনো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (ইমরান১০৩)তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করো, পরস্পর এতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না’ (আশ শুরা১৩)নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ওইসব লোককে ভালো বাসেন, যারা সুসংগঠিতভাবে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, যেন তারা এক সীসাঢালা সুদৃঢ় প্রাচীর’ (সূরা আস সফ)

আয়াতে সবশেষ ঘোষণা হচ্ছে অর্থাৎ তিনি (আল্লাহ) তোমাদের অভিভাবক, তিনি বড়ই উত্তম অভিভাবক উত্তম সাহায্যকারী আল্লাহ তায়ালার সুস্পষ্ট ঘোষণা হচ্ছে, তুমি কি জানো না আসমানসমূহ জমিনের সার্বভৌমত্ব শুধু আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো বন্ধু বা অভিভাবক নেই, আর নেই কোনো সাহায্যকারীও’ (সূরা বাকারা১০৭) আরো বলা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর ওপর ঈমান আনে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক বা বন্ধু’ (সূরা বাকারা২৫৭)

অতএব ইব্রাহিম :-এর মুসলিম মিল্লাতের কর্তব্য হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর আইন বা দ্বীন জমিনে প্রতিষ্ঠার জন্য সব উপায় উপকরণসহ জান মাল দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, দুনিয়ায় শান্তি আখেরাতে মুক্তির আশায় জিহাদ করা জিহাদ একটি মৌলিক ইবাদত এটা ফরজ আর এরই নাম জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ

 

গাজী মো: শওকত আলী

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s