কুরআন না বুঝে পড়া

 

ছেলেবেলায় কুরআন পড়ার জন্য অন্যান্য মুসলিম শিশুদের মত আরবী ভাষা পড়তে লিখতে শিখেছি। তবে এই আরবী শিক্ষা কুরআন পড়ার মধ্যেই সীমিত ছিল, পূর্নাঙ্গ ভাষা হিসাব কখনো আমাদের আরবী শেখানো হয়নি। কুরআন খতম করাই ছিল মূল বিবেচ্য বিষয়, কুরআনের অর্থ জানা হল কিনা সেটা নিয়ে খুব একটা ভাবা হতোনা, কারণ এর জন্যতো মাওলানারাই রয়েছেন। নামাজের সময় তোতা পাখীর মত কিছু মুখস্ত সুরা পড়ি, আর ইমাম সাহেবের কেরাত নিরবে শুনি। দোয়ার উদ্দেশ্যে দুহাত তুলে অনেক সময় কেঁদে ভাসাই বুক, কিন্তু আরবীতে স্রষ্টার কাছে কি চাইছি তাও জানিনা। দীর্ঘ দিন পর আজ মনে হচ্ছে, কোথাও যেনো একটা বিশাল ফাঁক রয়ে গেছে। আরবী ভাষা লিখতে পড়তে শিখলাম, অথচ ভাষা শিক্ষার সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ দিক অর্থাৎ ভাষার মানেটাই জানা হলোনা। এই প্রসঙ্গে আমার একজন বন্ধু থেকে শোনা একটি ছোট্ট ঘটনা বলি। সৌদি আরবে বসবাসরত একজন ভারতীয় মাওলানা খুব সুন্দর করে কুরআন পড়তে পারতেন। মাওলানার সুললিত কন্ঠের কেরাত শুনে মসজিদের মুসল্লিরা তাঁকে একবার নামাজে ইমামতি করতে অনুরোধ করলেন। নামাজ শেষে করে ওই ভদ্রলোক দেখলেন, একজন আরব তার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন। হাসির কারণ জানতে চাইলে আরব মুসল্লী বললেন, “কেরাত খুবই সুন্দর হয়েছে, তবে তুমি নামাজের শুরুতে হযরত ইউসুফ (আঃ) কে সেই যে গর্তে ফেললে, নামাজ শেষ করে দিলে, অথচ তাঁকে গর্ত থেকে টেনে তুললেনা” (সূরা ইউসুফ ১২ঃ১৪২১)

 কুরআন শব্দের উৎপত্তি قرأ থেকে, যার অর্থ হল পড়া। মুসলিমদের বিশ্বাস মতে, কুরআন হল মানব জাতির জন্য খোদার দেয়া গাইডবুক বা ম্যানুয়াল। এতে প্রতিটি মুসলিমের জীবন পরিচালনার জন্য রয়েছে দিক নির্দেশনা, রয়েছে ভালো কাজের জন্য পুরস্কার, আর মন্দের জন্য শাস্তির কথা। অথচ সেই ম্যানুয়ালে কি বলা হল সেটাই যদি না বুঝি, তাহলে আল্লাহর নির্দেশ বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করবো কি করে ? কুরআন বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত পুস্তক হলেও, সর্বাধিক নাবুঝে পড়া গ্রন্থও বটে! বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যার মাত্র ১৫ ভাগ হল আরবী। অনারব মুসলিমদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক মুসলিমই আরবী ভাষা জানেন। আরবী জানেন এমন মুসলিমদের বাদ দিলে দেখা যায়, মুসলিম জনতার প্রায় ৮০ভাগই আরবী জানেননা। ফলে কুরআনের সাথে মুসলিমদের যোগসুত্র খুবই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

 কুরআনের প্রতি বাহ্যিক সন্মান প্রদর্শন করতে আমরা সর্বদা সচেষ্ট থাকি। পবিত্র গ্রন্থ হিসাবে সন্মান করার দরকার আছে, তবে খেয়াল রাখতে হবে অতিরিক্ত বাহ্যিক সন্মান দেখাতে গিয়ে কুরআন যাতে আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে না যায়। কুরআন সাধারণতঃ আমরা মখমল কাপড়ে মুড়িয়ে, যতœ করে চুমু দিয়ে, উঁচু কোথাও তুলে রাখি। এছাড়া কুরআন পড়া স্পর্শ করা নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা। যেমনদাঁড়িয়ে কিংবা ভ্রমণের সময় পড়া যাবেনা, কাজে, জুতা পরে স্পর্শ করা যাবেনা, কিবলার দিকে মুখ না করে পড়া যাবেনা ইত্যাদি। এমন সব জটিলতার কারণে, কুরআনের প্রতি আকর্ষণের বদলে অনেকে বিকর্ষণ অনুভব করেণ, আর কুরআন পাঠের ব্যাপারে নিরৎসাহিত হয়ে পড়েন। ফলে কুরআন আমাদের হাতের কাছে থাকলেও, কুরআনের বানী আমাদের আত্মাকে ছুঁতে পারছেনা, আলোকিত করতে পারছেনা আমাদের হৃদয়। অনেকে বলে থাকেন, শুধু কুরআন পড়লেই যথেষ্ট, কারণ এতে ছোয়াব পাওয়া যায়। হাদিস কুরআনে এর স্বপক্ষে প্রমান রয়েছে (কুরআন ২৯ঃ৪৫) হাদীস মতে কুরআনের একটি অক্ষর পাঠ করলে ১০টি নেকী পাওয়া যায় (হাদীস নং ১০০৩, তিরমিজী) কিন্তু মানব জাতির কাছে কুরআন পাঠানোর উদ্দেশ্য কি কেবল নেকী অর্জন করা?

 বাংলাদেশে ভাষা শিক্ষার বিষয়টা অনেকাংশে ক্যারিয়ার ভিত্তিক মনে পড়ে, ছাত্রজীবনে আমার মূল লক্ষ্য ছিল কিভাবে ভালো ইংরেজী শেখা যায়, শুধু তাই নয় আমার অনেক বন্ধুদের ফ্রান্স, জার্মানী জাপানী ভাষাও শিখতে দেখেছি। ক্যারিয়ারে কথা ভেবে উন্নত দেশের ভাষা শেখার এই প্রবনতা সহজেই বোধগম্য। ইংরেজীর সাথে সাথে আরবী ভাষা শিক্ষাও যে বাস্তব জীবনে বাড়তি প্লাস পয়েন্ট যোগ করতে পারতো, সেটা আমরা কখনো ভেবে দেখিনি। আরবীকে কেবল ধর্মীয় ভাষা হিসাবেই গন্য করা হয়, ফলে আরবী ভাষার বানিজ্যিক ফায়দার দিকটা বরাবরই অবহেলিত রয়ে গেছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক রেমিটেন্সর সিংহভাগ আসছে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের কাছ থেকে। আরবী ভাষা জানা থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে যারা কাজ করছেন, তারা যে কতটা লাভবান হতেন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

 মাতৃভাষার পাশাপাশি পৃথিবীর বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা যদি আরবী ভাষার চর্চা চালু রাখতো, তাহলে ইরেজীর মতো আরবী ভাষাও একটি আর্ন্তজাতিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেতো। বাড়তি কিছু ভাষা জানা থাকা কখনোই ক্ষতিকারক নয়। তবে ভাষা শেখার সর্বোত্তম সময় হল শিশুকাল। ভাষাবিদদের মতে একজন শিশু একই সাথে ৫টি ভাষা রপ্ত করতে পারে। তাই ছোটবেলায় ইংরেজীর পাশাপাশি, আরবী ভাষা শিক্ষার সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় এখন খুবই আফসোস হয়। তবে ইচ্ছে থাকলে বয়সটা বাধা হবার কথা নয়। বিশেষতঃ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করা অনেক আমেরিকান, অষ্ট্রেলিয়ানদের আমি পরিণত বয়সে আরবী ভাষা রপ্ত করতে দেখেছি। যেকোনো ভাষা আয়ত্বে আনতে হলে ওই ভাষার শব্দ ভান্ডার (ঠড়পঁনঁষধৎু) রপ্ত করা প্রয়োজন। কুরআনে একই শব্দ বার বার ব্যবহৃত হয়েছে, যেমনقال ১৬১৮, كانا ১৩৫৮, এবং علم ৩৮২ বার বিভিন্ন বাক্যে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কুরআনে ব্যবহৃত প্রায় ৪০০টি অনন্য শব্দ (unique word) শিখতে পারলে, কুরআনের শতকরা ৮০ ভাগ অর্থ বোঝা সম্ভব।

 মনে রাখতে হবে, কোনো ভাষারই যথার্থ অর্থ, ভাব, অন্য ভাষায় পুরোপুরি অনুবাদ করা যায়না। কুরআনের বানীরও তেমনি শতভাগ অনুবাদ করা সম্ভব নয়। তার মানে আরবী ভাষা রপ্ত না করলে কি কুরআন বোঝা সম্ভব নয় ? তাহলে কুরআন সর্বকালের এবং সর্বভাষার মানুষের জন্য হয় কি করে ? এমন প্রশ্ন মনে জাগতেই পারে। তবে আরবী না জানলে হতাশ হবার কারণ নেই, অনুবাদ পড়েও কুরআনের বানীর গুরুত্ব এবং অধিকাংশ মর্মার্থ হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব। এর পরেও সমস্যা হলে, বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিতে হবে। আরবী ভাষা জানা থাকলে সুবিধা হল, ভুল ব্যাখ্যার কারণে ধোকা খাওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা, ইবাদতের সময় আরবীতে যে সব দোয়া কালাম পড়া হয় সেগুলোর মর্মার্থ সহজেই হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত হয়; ফলে সৃষ্টিকর্তার সাথে একধরণের আত্মিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হয়। পবিত্র কুরআনে অল্লাহতায়ালা বার বার বলেছেন, (আলকামার ৫৪: ১৭, ২২, ৩২, ৪০) – “And We have indeed made the Quran easy to understand and remember: then is there any that will receive admonition? ” (Yusuf Ali). এই আয়াতে আরবী ভাষায় দক্ষ হতে বলা হয়নি। তবে কুরআন বুঝার চেষ্টা করলে আল্লাহতায়ালার সরাসরি সাহায্য আশা করা যায়।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, বাংলা ভাষায় কুরআনের অনুবাদ মানুষের হাতে আসে সেটা খুব বেশী দিনের কথা নয়। কুরআন মুলিমদের ধর্মগ্রন্থ হলেও, বাংলা ভাষায় কুরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদক হলেন একজন অমুসলিম! বাবু গিরিশ চন্দ্র সেন, ১৮৮৬ সালে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কুরআনের বাংলা অনুবাদ করেণ। কিন্তু গিরিশ চন্দ্রের অনুবাদ বাঙ্গালী মুসলিম সমাজে তেমন সমাদৃত হয়নি। কুরআনের প্রথম মুসলিম বাংলা অনুবাদক হলেন কলকাতার আব্বাস আলী (১৯০৯) এবং ঢাকার আব্দুর রহমান খান (১৯৬২) তবে মুসলিম সমাজ, নিজ মাতৃভাষায় কুরআন অনুবাদ করার ব্যাপারে কখনোই খুব একটা উৎসাহী ছিলনা। দীর্ঘসময় ধরে মুসলিম ওলামাগনের কুরআন অনুবাদের বিরোধিতাই ছিল এর অন্যতম একটি কারণ। ওলামাগনের যুক্তি হল, আরবী ভাষায় নাজিল হওয়া কুরআন যেহেতু পরিপূর্ণরূপে অনুবাদ করা সম্ভব নয়, অনুবাদ করতে গিয়ে কুরআনে ভুল ব্যাখার সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু আমাদের উপমহাদেশে তৎকালীন বঙ্গদেশের চিত্রটা ছিল আরো একটু ভিন্নতর। ১৩০০ থেকে ১৮০০, এই পাঁচ শত বছরের মোগল শাসনামলে, ফার্সী ছিল সরকারী ভাষা। শুধু তাই নয়, ফার্সী ভাষাকেই আরবীর পরে ধর্মীয় ভাষা হিসাবে গন্য করা হতো। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে পুরানো ভাষার একটি হলেও বাংলা, তৎকালীন বঙ্গদেশেও কখনো সরকারী ভাষার স্বীকৃতি পায়নি। নতুন গবেষণা থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে ইসলামের প্রসার ঘটে মোগলদের বাংলা দখলের আরো অনেক আগে, খলিফা হারুনউররশীদের আমলে (৭৮৬৮০৯) কিন্তু মুসলিম এবং মুসলিম শাসকরা, বাংলা ভাষাকে বিধর্মীদের ভাষা হিসাবে গন্য করতো, তাই কুরআন কিংবা ধর্মীয় পুস্তক অনুবাদ করার জন্য ফার্সী ভাষাই প্রাধান্য পেতো। আমাদের উপমহাদেশে ফার্সী ভাষাতেই সর্বপ্রথম কুরআন অনুদিত হয় (শাহ ওয়ালি উল্লাহঃ ১৭০৩১৭৬২)

 এখন পৃথিবীর প্রধান সব ভাষাতেই কুরআনের অনুবাদ পাওয়া যাচ্ছে। নীচে কুরআনের অনুবাদ আরবী ভাষা শিক্ষার জন্য দরকারী কিছু ওয়েবসাইটের ঠিকানা দিচ্ছিঃ

 tanzil.info – বাংলা সহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ রয়েছে।

corpus.quran.com – অসাধারণ! এতে কুরআনের প্রতিটি শব্দের অর্থসহ ব্যকারণিক বিশ্লেষণও রয়েছে।

http://www.lqtoronto.comএতে রয়েছে আরবী ক্লাসের ভিডিও। ঘরে বসে আরবী/কুরআন শিক্ষার ভার্চুয়াল ক্লাস করা যাবে।

http://www.sunnipath.com/ http://www.bayyinah.com/রআন আরবী শিক্ষার অনলাইন কোর্স।

 

আলমামুন     

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s