চ্যালেঞ্জের মুখে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব

 

 

আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্তের মূল ভিত্তি হলআলোর বেগ সর্ব অবস্থায় ধ্রুব”, অর্থাৎ জগতের ভরবাহী কোনো বস্তু আলোর গতিবেগ অতিক্রম করতে পারবেনা। গত নভেম্বরে ইউরোপের জগদ্বিখ্যাত ল্যাবেরটরী সার্ণে (CERN – European Centre for Nuclear Research) গবেষণারত একটি বিজ্ঞানী দল, আলোর গতি সর্বোচ্চ নয় বলে দাবী করেছেন। এই খবর শুনে বিশ্বের বিজ্ঞানী সমাজ বৈদ্যুতিক ঘা খাওয়ার মতো চমকে উঠেছেন। কি কথা? শত বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত আইনস্টাইনের স্বতঃসিদ্ধ কি তাহলে মিথ্যে হতে চলেছে?

 সুইজারল্যান্ডের সার্ণ ল্যাবে মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটন করার জন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরণের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০০৮ সালে সার্ণের ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘলার্জ হেড্রন কলাইডারে” (Large Hadron Collider), পরমাণু কণিকার মধ্যে অতি উচ্চ বেগে টক্কর ঘটিয়ে মহা বিস্ফোরণ বা Big Bang এর ঠিক পর মুহূর্তে কি ঘটেছিল সেই দৃশ্যপট তৈরী করার জন্য যে পরীক্ষা করা হয়, তা বিশ্বে আলোড়ন তোলে। বিজ্ঞানীদের ভয়, এই পরীক্ষার সময় যে ধরণের তাপমাত্রা উৎপন্ন হবে ( ট্রিলিয়ন ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড!), তা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্ল্যাকহোলের সৃষ্টি করবে। আর এই ব্ল্যাকহোল কিছুদিনের মধ্যে বিশাল আকার ধারণ করে বিশ্বকে গিলে ফেলবে। খোদ মানব জাতির অস্তিত্ব যখন বিপন্ন হতে চলেছে, তখন কি চুপ করে থাকা যায়? তাই বেশ কিছু বিজ্ঞানী ইউরোপিয়ান মানবাধিকার কমিশনের আদালতে, এই পরীক্ষা বন্ধ করার জন্য রীতিমত মামলা ঠুকে দেন। তবে বাস্তবে ভয়ংকর তেমন কিছু ঘটেনি। এই ধরণের পরীক্ষা সময় ব্ল্যাকহোলের সৃষ্টি হয় ঠিকই কিন্তু সেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ নয়।

 এই সার্ণ ল্যাবরেটরীরই একটি প্রজেক্ট হলঅপেরা” (OPERA – Oscillating Project with Emulsion-Tracking Apparatus) এই প্রজেক্টে বিজ্ঞানীরা নিউট্রিনো নামক মৌলিক কণা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তারা সার্ণ ল্যাবরেটরী থেকে কিছু নিউট্রিনো কণা ৭৩০ কিলোমিটার দুরে ইটালীরগ্রান সাসোল্যাবরেটরীতে পাঠান। দেখা গেলা, নিউট্রিনো কণা আলোর গতির চেয়ে এক সেকেন্ডের ৬০ বিলিয়ন ভাগের একভাগ আগে (৬০ ন্যানোসেকেন্ড) ইটালীর ল্যাবে পৌঁছে গেছে। এভাবে পাঠানো প্রায় ১৫,০০০ নিউট্রিনো কণিকার গতি বিজ্ঞানীর পরিমাপ করে দেখলেন, নিউট্রিনো কণাগুলো আলোর গতিবেগের (সেকেন্ডে লক্ষ কিলোমিটার) চেয়ে কিলোমিটার দ্রুতবেগে ভ্রমণ করেছে। প্রায় ছয় মাস ধরে বার বার পরীক্ষা করে অবশেষে গত নভেম্বরে তাঁরা এই আবিস্কারের খবর প্রকাশ করেন।

 সাধারণ মানুষের কাছে ৬০ ন্যানোসেকেন্ড সময়ের ব্যবধান নগন্য মনে হলেও তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানে এর প্রভাব অকল্পনীয়। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব (Special Theory of Relativity) অনুযায়ী, কোনো বস্তুর বেগ যত বাড়বে ভর ততই বাড়তে থাকবে, সময় ধীরে চলবে এবং দৈর্ঘ সঙ্কুচিত হতে থাকবে। আলোর কাছাকাছি বেগে চলতে থাকলে বস্তুর ভর অসীম হয়ে যাবে। আর অসীম ভরের কোনো বস্তুকে আলোর বেগে চালাতে হলে অসীম শক্তির দরকার। তাই ভরবাহী কোনো পদার্থের গতিবেগ আলোর গতিবেগ দ্বারা সীমিত। তবে আলোক তরঙ্গকণাফোটনভরশূণ্য বলে আলোর বেগে চললে ফোটনের ভর বেড়ে গিয়ে অসীমে দাঁড়াবার সম্ভাবনা থাকেনা। কিন্তু নিউট্রিনোর ভর অন্যান্য মৌলিক কণার তুলনায় খুব নগন্য হলেও, ফোটনের মত ভরশূণ্য নয়। তাই সার্ণের পরীক্ষায়, ভর অসীম না হয়ে নিউট্রিনো কণাগুলো কিভাবে আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে ৭৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিল, সেটাই অনেক বিজ্ঞানীদের মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি করেছে।

 সংশয়বাদী বিজ্ঞানীদের অভিমত হল, সার্ণের পরীক্ষায় কোথাও কোনো ভুল রয়েছে যা এখনো আমাদের চোখে পড়ছেনা। যে সব বিষয় নিয়ে তাদের সন্দেহ হচ্ছে সেগুলো হলআপেক্ষিকতার প্রভাব, সময়ের ক্রমাঙ্কন, নিউট্রনের পাড়ি দেয়া দুরত্বের মাপ, সঠিকভাবে নিউট্রিনো কণা শনাক্তকরণ ইত্যাদি। জেনেভা এবং ইটালীতে সময় মাপার সময় দুজায়গার ঘড়ির উপর মহাকর্ষ বলের প্রভাব হিসাবে না নেয়ায়, লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজের বিজ্ঞানী কার্লো কন্টাল্ডি সার্ণের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর মতে, গ্রান সাসোর তুলনায় সার্ণের অবস্থান পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দুরে হওয়ায়, মহাকর্ষ বলের তারতম্যের কারণে সার্ণের ঘড়ি গ্রান সাসো থেকে সামান্য ধীরে চলবে। এদিকে ইতালীর গ্রান সাসোতে, “ইকারুস”(ICARUS) নামের পরীক্ষায়, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল সার্ণ হতে ইতালীতে পাঠানো নিউট্রিনো কণাগুলো থেকে বিকীর্ণ শক্তি মেপে দেখেছেন। আলোর চেয়ে বেশী বেগে ভ্রমণ করলে নিউট্রিনোগুলো ইলেক্ট্রন পজিট্রন বিকিরণ করে শক্তি ক্ষয় করে ফেলার কথা। কিন্তু ইকারুস পরীক্ষায় শক্তি ক্ষয় হবার কোনো প্রমাণ মেলেনি। এখানেও বিজ্ঞানীরাঅপেরাগবেষণার ফলাফলের সাথে মিল খুঁজে পাননি।

 বিজ্ঞানের কোনো তত্ত্ব কিংবা সূত্র চিরস্থায়ী নয়। পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে অসঙ্গতি ধরা পড়লে পুরোনো তত্ত্ব প্রত্যাখান করে নতুন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়। সেই কথাই এখন বলছি। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের কথা। আইনস্টাইন তখন সবেমাত্র পি এচি ডি ডিগ্রী শেষ করে সুইস প্যাটেন্ট অফিসে একটি তৃতীয় শ্রেণীর কেরানির চাকুরী করছেন। সেই সময় নিউটনই ছিলেন বিজ্ঞান জগতের শাহান শাহ। ১৬৮৭ সালে নিউটনের লেখাপ্রিন্সিপিয়াগ্রন্থে বর্ণিত মহাকর্ষ তত্ত্ব দিয়েই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কাজ চলে যাচ্ছিল। নিউটন তাঁর অভিকর্ষ তত্ত্ব দিয়ে প্রমাণ করলেন জগতে স্থির বলতে কিছু নেই, সবই গতিশীল। ওই যুগে কালের নিরপেক্ষতা (Absolute Time) সম্পর্কে সবার বিশ্বাস ছিল সুদৃঢ়। কিন্তু আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে, যুগান্তকারী আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব দিয়ে বদলে দিলেন নিউটনের ধ্যান ধ্যারণাকে। তিনি বললেন, স্থান (Space), কাল (Time) সবই আপেক্ষিক। জগতের কোন কিছুই আলোর গতির চেয়ে দ্রুত চলতে পারেনা। আর আলোর কাছাকাছি বেগে চলতে থাকলে বস্তুর ভর অসীম হয়ে যাবে। পদার্থের ভর শক্তি সম্পর্কিত মাত্র তিন অক্ষরের একটি ছোট্ট সমীকরণ (E=mc2) দিয়ে তিনি সেটা প্রমাণও করলেন।

 এই আপেক্ষিকতার তত্ত্ব আইনস্টাইনকে বানিয়ে দিল বিজ্ঞানের নতুন সুপারষ্টার। কিন্তু তা বলে আমরা যদি মনে করি নিউটনের সূত্র ভুল, সেটা ঠিক হবেনা। যখন বস্তুর গতিবেগ থাকে অল্প, তখন নিউটন এবং আইনস্টাইনের তত্ত্ব একই রকম ফলাফল দেয়। কেবল বিশেষ ক্ষেত্রেই নিউটনের সূত্র ভেঙ্গে পড়ে, যেমন যখন মাধ্যাকর্ষণ বল প্রচন্ড বেশী হয়, অথবা বস্তু কণা যখন আলোর বেগের কাছাকাছি চলতে থাকে। পরবর্তীতে আইনস্টাইন নিউটনের মহাকর্ষকেই আপেক্ষিকতার আলোকে ব্যাখ্যা করে দিলেন নতুন তত্ত্ব, “আপেক্ষিকতার ব্যাপক তত্ত্ব” (General Theory of Relativity). তাই আজকে যারা আইনস্টাইনের তত্ত্ব মিথ্যে হয়ে গেলো বলে সন্দেহ করছেন তাদের ধারণা ঠিক নয়। নিউট্রিনো আলোর গতির চেয়ে দ্রুত চললেও আইনস্টাইনের তত্ত্ব ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবেনা, কিছু ধ্রুবকের মান পরিবর্তিত হয়ে হয়তো এই তত্ত্ব আরো ব্যাপকতা লাভ করবে।

 প্রয়াত জ্যোতির্বিদ বিজ্ঞানী কার্ল স্যাগানের ভাষায়, “Outstanding statements require outstanding proof”, অর্থাৎ অসাধারণ দাবীর জন্য অসাধারণ প্রমাণ দেয়া দরকার। আইনস্টাইনের তত্ত্ব গত এক শতকে হাজারো পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে বার বার। কখনো কোনো ধরণের বিচ্যুতি কিংবা সংশয় পরীক্ষার ফলাফলকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাই সার্ণের বিজ্ঞানীরা যদি তাদের অসামান্য দাবীকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে আরো বহু পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে অসাধারণ প্রমাণ পেশ করতে হবে। একমাত্র তখনই এই ফলাফল সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

আলমামুন

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s