থাইরয়েড হরমোনজনিত অসুখ

মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র ইত্যাদি পরিচালনায় থাইরয়েডের অবদান রয়েছে। এই হরমোন নিঃসরণে সামান্য এদিক-ওদিক হলেই নানা সমস্যা দেখা দেয়, যা মারাত্মক বিপদও ডেকে আনতে পারে। লিখেছেন হরমোন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও ইবনে সিনা ডিল্যাবের কনসালট্যান্ট ডা. আহসানুল হক আমিন

 শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য নালিবিহীন গ্রন্থি বা এন্ডোক্রাইন গ্ল্যান্ড থেকে যে রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়, তাকে হরমোন বলা হয়। হরমোনের কাজ বিভিন্ন ধরনের; যেমন_ইনসুলিন দেহে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। এ রকমই আরেকটি হরমোন হলো থাইরয়েড। আমাদের গ্রীবার সামনে কণ্ঠার দুই পাশে প্রজাপতি আকারের যে গ্রন্থিটি রয়েছে সেটি থেকে অতি প্রয়োজনীয় হরমোনটির নিঃসরণ হয়। আকারে ও ওজনে ছোট (৫৫ সেমি ও ২০ গ্রাম) হলেও কোষের বিপাক, শক্তি উৎপাদন ও বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে থাইরয়েডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

 দেহের ওপর থাইরয়েডের প্রভাব

 বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রম, যেমন_মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র ইত্যাদি পরিচালনায় থাইরয়েডের অবদান রয়েছে। কাজেই এ হরমোন নিঃসরণে সামান্য তারতম্য (কম মাত্রায় নিঃসরণ বা আধিক্য) হলেই নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। এ সময় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বা সমস্যার কারণ নির্ণয় করা না হলে ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলো মারাত্মক বিপদও ডেকে আনতে পারে। আবার হরমোন যেহেতু ব্যাপক হারে আমাদের দৈহিক কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করে, সেহেতু এ থেকে সৃষ্ট সমস্যার উপসর্গগুলোও হয় নানা ধরনের। সাধারণত তিনটি কারণে থাইরয়েড সমস্যাজনিত উপসর্গ দেখা দেয়; যেমন_গলগণ্ড, অধিক মাত্রায় ও অল্প মাত্রায় থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণের কারণে সৃষ্ট সমস্যা।

 গলগণ্ড

 এই উপসর্গ আমাদের দেশের আয়োডিনবঞ্চিত অঞ্চলে বেশ প্রকট। গলার সামনের অংশ সামান্য ফোলা থেকে শুরু করে এটা বিশাল আকৃতি পর্যন্ত হতে পারে। হরমোনজনিত অসুবিধা ছাড়াও এটা পার্শ্ববর্তী শ্বাসনালি ও খাদ্যনালির ওপর চাপের সৃষ্টি করে।

 থাইরয়েডের অভাবজনিত উপসর্গ

 শরীরের প্রায় প্রতিটি কাজই থাইরয়েড হরমোনের অভাবে ব্যাহত হয়। গলগণ্ড, অবসন্নতা, দুর্বলতা, ঘুমের আধিক্য, ওজন বৃদ্ধি পাওয়া, শরীর ফুলে যাওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, অত্যধিক শীত লাগা, চুল পড়ে যাওয়া এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে মাসিকের সমস্যা, বন্ধ্যত্ব_এসবের অন্যতম প্রধান উপসর্গ। সমস্যাগুলো অনেক ক্ষেত্রে ধীরগতিতে প্রকাশিত হয়। এ কারণে যখন রোগী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়, তখন দেখা যায় রোগ জটিল আকার ধারণ করেছে।

 কেন হয়

 আয়োডিনের অভাব, অটোইমিউনিটি প্রভৃতির কারণে থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণের পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের ব্রেইন বা মস্তিষ্কের বিকাশ থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ বৃদ্ধি থাইরয়েড হরমোনের ওপর নির্ভর করে। এই প্রয়োজনীয় সময়ে মায়ের শরীরে থাইরয়েড হরমোনের অভাব বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধিতার কারণ হতে পারে।

 থাইরয়েড আধিক্যের কারণে সৃষ্ট সমস্যা

 অধিক পরিমাণ থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণের ফলে কোষের বিপাকজনিত কার্যক্রম অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে; যেমন_অস্থিরতা, বুক ধড়ফড়, অত্যধিক ঘাম, ওজন হ্রাস, গলগণ্ড, চোখ ফুলে যাওয়া, ডায়রিয়া, অনিদ্রা ইত্যাদি। দীর্ঘস্থায়ী রোগে হৃদরোগ ও অস্থিক্ষয়ও হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, সবার ক্ষেত্রে শারীরিক অসুবিধাগুলো একই মাত্রায় প্রকাশিত হয় না। ব্যক্তিবিশেষে এসবে তারতম্য ঘটে।

 থাইরয়েডজনিত সমস্যা ও বাংলাদেশ

 থাইরয়েড গ্রন্থি হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন নামের যৌগের ওপর নির্ভরশীল। ভৌগোলিকভাবেই বাংলাদেশের অবস্থান আয়োডিনের অভাবগ্রস্ত অঞ্চলে। উপরন্তু ফিবছর বন্যা হওয়ায় আমাদের দেশের মাটিতে যেটুকু আয়োডিন আছে, সেটুকুও ক্ষয় হয়ে যায়। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় অপুষ্টি। এসব কারণে আমাদের দেশে থাইরয়েডজনিত অসুস্থতার হার ব্যাপক। মানুষের মধ্যে হরমোন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকাও এ সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আরেকটি কারণ। অথচ সহজলভ্য কয়েকটি পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে হরমোনের মাত্রা নির্ণয় এবং তারতম্যের পরিমাণ জানা যায়। রোগের প্রকৃতি জানার জন্য বিশেষায়িত পরীক্ষাগুলো, যেমন_’রেডিও অ্যাকটিভ আয়োডিন আপটেকঅথবা থাইরয়েড অ্যান্টিবডির মাত্রা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে সম্পন্ন করা যায়।

 থাইরয়েডজনিত সমস্যার চিকিৎসা

 হরমোনের অভাব অতি সহজে মুখে গ্রহণযোগ্য ওষুধের মাধ্যমে পূরণ করা যায়। এগুলো দেশে স্বল্প মূল্যে ও মানসম্মতভাবে তৈরি হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আজীবন সঠিক মাত্রার ওষুধ গ্রহণ করে আক্রান্ত ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন। অধিক হরমোন নিঃসরণের চিকিৎসা কয়েকভাবে করা যায়; যেমন_মুখে খাওয়ার ওষুধ, সার্জারি ও রেডিও অ্যাকটিভ আয়োডিন প্রয়োগ। রোগীর বয়স, রোগের প্রকৃতি, গর্ভাবস্থা ও চিকিৎসা পদ্ধতির সহজলভ্যতার ওপর এর প্রকাশ নির্ভর করে।

 অন্যান্য ক্যান্সারের তুলনায় কম হলেও থাইরয়েড ক্যান্সার অতীতের তুলনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে সমস্যার সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। সঠিক সময়ে সন্দেহজনক থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের কোষ পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা যায়। এ ক্ষেত্রে আলট্রাসনোগ্রামের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

 আমাদের দেশে থাইরয়েডজনিত জটিলতার হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সচেতনতার অভাবে প্রায়ই এগুলো অনির্ণীত থেকে যাচ্ছে। কাজেই আপনি যদি কোনো একটি উপসর্গ অনুভব করেন, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং সুস্থ জীবনযাপন নিশ্চিত করুন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s