মুসলমানদের নামকরণ – একটি ভাবনা

 

কথায় বলে – “নামে নয়, কাজের মাঝেই খুঁজে পাবে সবার পরিচয় কিন্তু এর পরেও, প্রতিটি বাবা মা, সন্তানের জন্য একটি সুন্দর নামের খোঁজ করেন। কেউ সুন্দর অর্থ দেখে অথবা সুন্দর একটা কিছুর সাথে সামঞ্জস্য রেখে নাম রাখেন; কেউবা আবার বিশ্ববরেণ্য মানুষ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নাম রাখেন, যাতে ওই বিখ্যাত নাম, সন্তানকে সামজিক ব্যক্তিগত জীবনে সফল হতে প্রেরণা যোগায়। মানুষের উপর নামের প্রভাব অনেক সময় কাজ করে, ইতিহাস ঘাটলে তার প্রমান মেলে। আরবী নাম হল ইসলামিক, এই ধারণায়, আমাদের দেশে মুসলিমদের নাম প্রধানতঃ আরবীতেই রাখা হয়। ইদানিং দেশে বাংলায় নাম রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের মজ্জাগত ধারণার ফলে, বাংলা নাম শুনলে কেনো জানি অমুসলিম অমুসলিম মনে হত। কৈশরের খেলার মাঠের বন্ধুস্বপন নাম শুনেই আমরা ধরে নিয়েছিলাম স্বপন হল হিন্দু। ঈদের মাঠে দেখা হবার পর ভুল ভাঙ্গে। তবে আরবী নামধারী হলেই কেউ মুসলিম হবে, এমন ভাবাটাও ভুল। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশে, মুসলিমদের পাশাপাশি প্রচুর আরব খৃষ্টানও বসবাস করছেন। বিশিষ্ট আরব খৃষ্টানদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্বখ্যাত কবি খলিল জিব্রান, ইরাকের তারিক আজিজ, জর্দানের সুলাইমান মুসাসহ আরো অনেকে।

 ইসলামীক বা মুসলিম নাম কি? শুধু আরবী ভাষাতেই নাম রাখতে হবে কেনো? বাংলা কিংবা নিজ মাতৃভাষায় মুসলিমদের নাম রাখতে অসুবিধা কোথায়? উপরের প্রশ্নেগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে সীমিত পড়াশুনা করে যা জেনেছি, পাঠকের উদ্দেশ্যে তা তুলে ধরছি।

নামকরণপ্রসঙ্গেইসলামকিবলে?

 নামের প্রসঙ্গে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হাদিসটি হল – “On the Day of Resurrection, you will be called by your names and by your fathers’ names, so give yourselves good names.” (আবু দাউদ) এই হাদিস থেকে নামের যে গুরুত্ব রয়েছে তা সহজেই বোঝা যায়। ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে নাম নির্বাচনের মূল নীতি হলসুন্দর অর্থবহ নাম রাখা; ইসলামিক চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক, মন্দ এবং অনিষ্টকর অর্থের নাম পরিহার করা।

 অনেকের ধারণা, একজন মুসলিমের নাম আরবীতেই হতে হবে। কিন্তু ইসলামে আরবী ভাষায় নাম রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নিজ মাতৃভাষায় সুন্দর অর্থবহ নাম রাখা যেতে পারে। যেমন রাসুল (সাঃ) এর সন্তান ইব্রাহীমের জন্মদাত্রী মারিয়া, তাঁর কপ্টিক নামেই পরিচিত ছিলেন এবং ওই নাম মহানবী (সাঃ) বদলে দেননি। এছাড়া অনেক সাহাবাদের নাম উদ্ভিদ/গাছ (তালহা, হানযালা), পশুপক্ষী (আসাদ), বস্তু/প্রকৃতি (বাহার, জাবাল) ইত্যাদির নামেও ছিল। শান্ত/শান্তি (মূল আরবী সালাম), আলো, আকাশ, দীপ, কোমলসহ অনেক সুন্দর বাংলা নাম রাখতে কোনো সমস্যা দেখিনা।

 যে সব নাম ইসলামের মূল বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক, সেই ধরণের নাম রাখা ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ। যেমনআল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব ঈঙ্গিতকারী নামআব্দুল হোসেন, আব্দুল ক্বাবা, আব্দুন্নবী, দুর্গাদাস, উবহহরং (গ্রীক দেবতা Dionysus থেকে উদ্ভূত) ইত্যাদি। শুধু মন্দ অর্থের কারণে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বেশ কিছু নাম পরিবর্তন করেছেন বলে হাদিস থেকে জানা যায় (আবু দাউদ), যেমন আসিয়াকে (অবাধ্য) জামিলা (সুন্দর) (মুসলিম, আবু দাউদ) আল্লাহ, নবী রাসুল, সচ্চরিত্র, ন্যায়পরায়ন মানুষের নামে নাম রাখা উত্তম। Call yourselves by the names of the Prophets…..” (আবু দাউদ)

 বাবারনামেনামঃ

সন্তানের নামের সাথে পিতার নাম যুক্ত করে আরব দেশে নামকরণ করা হয়। ইসলাম এটাকে অনুমোদন করেছে। “Call them by (the names of) their father’s, that is more just in the sight of Allah…” (Al-Ahzab 33:5, Yusuf Ali)| পিতা পূর্বসুরীদের নাম ব্যবহারের রীতি শুধু মুসলিম নয়, প্রায় সব সমাজেই বিদ্যমান। পশ্চিমা দেশে নামের শেষ অংশটুকু (Surname/Family Name) সাধারণতঃ পিতা কিংবা বংশ পদবী নির্দেশ করে। অনেক সমাজে মায়ের নামেও নাম রাখা হয় বলে জানা যায়, তবে এটা নির্ভর করে সমাজে নারীদের পদমর্যাদার উপর। কুরআনে হযরত ঈসা (আঃ)’ নাম, মায়ের নামে রাখা হয়েছে – “ঈসা ইবনে মরিয়ম” (৬১ঃ১৪)

 পশ্চিমা কালচারে বিয়ের পর, নারীদের নামের শেষে বাবার নামের পরিবর্তে স্বামীর নাম যুক্ত করা হয়ে থাকে। ব্যাংক একাউন্ট, সম্পত্তির যৌথ মালিকানা ইত্যাদি বিষয়ে জাটিলতা এড়াবার জন্য ধরণের পরিবর্তন করা হয়। তবে আমি যতদুর জানি, অষ্ট্রেলিয়া কিংবা বৃটেনে, বিয়ের পর মহিলাদের নাম পরিবর্তনের জন্য কোনো আইনী বাধ্যবাধকতা নেই; কেউ চাইলে নিজের নাম অপরিবর্তিত রাখতে পারেন। বিয়ের পরে স্বামীর নাম যুক্ত করার রীতি নারীর মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে বলে আমি মনে করি। শুধু নারীকেই কেনো নাম পরিবর্তন করতে হবে? বিয়ের পর নারীদের নাম থেকে বাবার নাম বাদ দেয়া ইসলাম সমর্থন করেনা। “Allah has cursed the one who claims to belong to someone other than his father.” (মুসনাদ আহমদ)

 নামেরভুলব্যবহারঃ

বাস্তবতার প্রয়োজনে, পশ্চিমা দেশে যাবার পর অনেকেই তাদের নাম, Given Name/Surname এর ছাঁচে পুনবিন্যাস করে থাকেন। শহীদুল্লাহ, মইনুদ্দিন ইত্যাদি নামের উল্লাহ উদ্দিন সাধারণতঃ Surname হিসাবে ব্যবহার করা হয়। উল্লাহ এবং উদ্দিন হল দুই শব্দবিশিষ্ট নামের একটি অংশ মাত্র, যা এককভাবে ব্যবহার করা যায়না। অষ্ট্রেলিয়ায় দেখেছি, যাদের নাম আব্দুল্লাহ তাদের অনেক সময় সংক্ষেপে আব্দুল বলেই ডাকা হয়। আব্দুল মানে হল Servant of the, তাই ভাবি আব্দুল বলে কি কাউকে ডাকা উচিত? এছাড়া, আরবী ভাষায় দখল না থাকায়, নিজের অজান্তেই আমরা অনেক সময় নামের ভূল ব্যবহার করে থাকি। কারো নাম যদিফজলে রাব্বিহয় তাকে আমরা সংক্ষেপেরাব্বিবলেই ডাকি, যার মানে হলআমার খোদা????” তাই শুধুরাব্বিনয়, পুরো নাম অর্থাৎফজলে রাব্বিবলেই ডাকা উচিত।

 নামপরিবর্তনঃ

নামের অর্থ ইসলামী চেতনার বিরোধী না হলে মুসলিমদের নিজের মূল নাম বদলানোর দরকার নেই। বিখ্যাত সাহাবী সালমান আল ফার্সী হলেন ইরানী, তার নামও ছিল ফার্সি ভাষায় রাসুল (সাঃ) তাঁর নাম বদলাননি। এমন আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে।

 বর্তমান বিশ্বের অনেক বিখ্যাত সুপরিচিত ইসলামিক ব্যক্তিত্ব ধর্মান্তরিত হবার পর তাদের মূল ভাষার নাম বদলে দেননি। এদের মধ্যে দুজন হলেন আমেরিকার Hamza Yusuf Hanson এবং Peace TV উপস্থাপক দোহার মসজিদের ইমাম Bilal Philips. বিলাল ফিলিপ্সের পুরো নাম হল – Abu Ameenah Bilal Phillips অর্থাৎ আমিনার পিতা বিলাল, Philips হচ্ছে তাঁর পিতার নামের শেষাংশ। এখানে লক্ষ্যণীয়, বিলাল ফিলিপ্সের পিতা মুসলিম না হলেও তাঁর নাম ব্যবহার করা হয়েছে। হাদিসের সূত্র থেকে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে সাহাবাদের মূল নাম বদলে দিলেও, বাবার নাম যতই অনৈসলামিক হোক, রাসুল (সাঃ) তা বদলাননি। আবু জাহলের (আসল নামআমর ইবনে হিশাম) পুত্রইকরিমা ইবনে আবু জাহল”, মক্কা বিজয়ের বছর ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামের চরম শত্রু হবার পরও বাবা হবার কারণে ইকরিমার নাম থেকে আবু জাহলের নাম বাদ দেয়া হয়নি।

 একাধিকএবংডাকনামঃ

আমাদের দেশে অনেক মাওলানারা ডাক নাম রাখার ব্যাপারে উৎসাহ দেখান না। কিন্তু দেখা যায়, রাসুল (সাঃ) সাহাবারা একাধিক নামে পরিচিত ছিলেন। জেষ্ঠ্য পুত্রসন্তানের নামে ডাকা হল আরব সমাজের একটি জনপ্রিয় রীতি। আরবী ভাষায় ডাকনামকে বলা হয়কুনাইয়া রাসুলের কুনাইয়া ছিল আবুল কাশেম (কাশেমের পিতা) এছাড়া অনেক ইসলামিক ব্যক্তিত্ব তাঁদের ডাকনামেই বহুল পরিচিত ছিলেন, আসল নাম অনেকেরই জানা নেই। যেমন হযরত আবু বকর (রাঃ) (আসল নামআব্দুল্লাহ ইবনে উসমান) হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) (আসল নামআব্দুর রহমান ইবনে শাকর) আবু হানিফা (রহঃ) (নুমান ইবনে তাহাবিত) এছাড়া জন্মস্থান গোত্র নিয়েও ডাকনামের প্রচলন রয়েছে। হাদিস বিশেষজ্ঞ বুখারী (মুহাম্মদ ইবনে ঈসমাইল) – বুখারা শহরের অধিবাসী; আবু জার গিফারী (গিফার গোত্র) প্যালেষ্টাইনী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আরব বিশ্বে তার কুনাইয়াআবু মাজেননামে পরিচিত। আমাদের দেশেও কুনাইয়ার আদলে নাম শোনা যায়। তবে জন্মের পর কুনাইয়া আদলে রাখা আসল নাম, অর্থ বিবেচনা করলে সঠিক মনে হয়না। যেমন কারো নাম রাখা হল আবু ইউসুফ অর্থাৎ ইউসুফের পিতা, পুত্র সন্তানের বাবা হবার পরই এই নামে কাউকে ডাকা যায়।

 যে ভাষাতেই হোকনা কেনো, ইসলামিক চেতনা সমৃদ্ধ সব নামই হল ইসলামিক। ইসলাম হল বিশ্বজনীন ধর্ম। তাই শুধু বাংলা কেনো, নামকরণের সময় বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সাথে ইসলামিক মূল্যবোধের সংঘর্ষ হবার কোনো কারণ দেখিনা।

আলমামুন

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s