রক্তনালীর ব্লক চিকিত্সায় অ্যানজিওপ্লাস্টি

সারা শরীরে জালের মতো ছড়িয়ে আছে রক্তনালী বা রক্ত চলাচলের মসৃণ রাস্তা। এর মধ্যে বিশুদ্ধ রক্ত যাতায়াতের নালীকে ধমনি আর দূষিত রক্ত যাতায়াতের নালীকে শিরা বলা হয়। বিভিন্ন কারণে রক্তনালীর গায়ে চর্বি জমে রক্তনালী ব্লক হয়ে সরু বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কোনোরূপ কাটাছেঁড়া না করে রক্তনালীর ব্লক দূর করার নামই অ্যানজিওপ্লাস্টি। স্টেন্ট বা রিং বসিয়ে অ্যানজিওপ্লাস্টি করা হয়।

কী কী কারণে রক্তনালী বন্ধ হতে পারে

ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, রক্তে অতিমাত্রায় চর্বি।

এর মধ্যে ধূমপান বর্জনযোগ্য। আর অন্যগুলো নিয়ন্ত্রণযোগ্য। ধূমপান ত্যাগ করার জন্য আপনার ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট।

রক্তনালীর ব্লকে কী কী সমস্যা হয়

— হাঁটলে পায়ে ব্যথা হয়, বিশ্রাম নিলে কিছুটা কমে যায়।

—রোগের তীব্রতা বাড়লে বিশ্রামরত অবস্থায়ও পায়ে ব্যথা হতে পারে

— পায়ে ঘা, পচন বা গ্যাংগ্রিন।

  চিকিত্সা না করালে শেষ পরিণত

পা পচে গেলে তা কেটে (অ্যাম্পুটেশন) ফেলে দেয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না। আমরা সচরাচর যেসব পঙ্গু লোক দেখতে পাই তাদের একটি বিরাট অংশ রক্তনালীর ব্লকজনিত পচন রোগে আক্রান্ত।

কীভাবে রক্তনালীর ব্লক নিরূপণ করা যায়

রোগীর উপসর্গ থেকে, হাত-পায়ের পাল্স বা নাড়ি পরীক্ষা করে, কম্পিউটারে পরীক্ষার (ডপলার পরীক্ষা) মাধ্যমে, অ্যানজিওগ্রামের মাধ্যমে।

রক্তনালীর ব্লক অপসারণের উপায়

—রোগীর উরু ও পেটের সংযোগস্থলে কুঁচকিতে স্থানীয়ভাবে অবশ করে ব্যথামুক্ত অবস্থায় একটা সুঁই ঢোকানো হয় (অনেকটা স্যালাইন দেয়ার মতো)। পরে এক ধরনের ইনজেকশন পুশ করে ছবি তোলা হয়। ছবিতে ব্লক ধরা পড়ে- এটাই হলো অ্যানজিওগ্রাম।

— অ্যানজিওগ্রামের মাধ্যমে ব্লকের সঠিক স্থান (পেটের মধ্যে, উরুতে, পায়ে, বুকের মধ্যে বা হাতে) এবং মাত্রা বা বিস্তৃতি নির্ণয় করা হয়। হার্টের রক্তনালীর ব্লকও এভাবে নির্ণয় করা যায়।

—রক্তনালীর ব্লক অপসারণের পদ্ধতিকে বলা হয় অ্যানজিওপ্লাস্টি। অ্যানজিওগ্রাম করার সময় সরু বা বন্ধ রক্তনালী প্রথমে বেলুন দিয়ে মোটা করা হয়। তারপর ওই স্থানে একটা রিং বা আংটি বা স্টেন্ট বসিয়ে দেয়া হয়। ফলে রিঙের মধ্য দিয়ে রক্ত চলাচল করতে পারে।

—এছাড়া কাটাছেঁড়া করে রক্তনালীর ব্লকের স্থানে জমে থাকা চর্বি পরিষ্কার করে অথবা বাইপাস অপারেশনের মাধ্যমে রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।

  রিং বা স্টেন্ট কী?

এটা ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি এক ধরনের পাইপ। বিভিন্ন সাইজের রক্তনালী অনুযায়ী এটা বিভিন্ন সাইজের তৈরি করা যায়। এটা এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে রক্তনালীতে বসিয়ে দেয়ার পর সুন্দরভাবে রক্তনালীর গায়ে লেগে থাকে। কুঁচকি স্থানীয়ভাবে অবশ করার ফলে রোগীর ব্যথা পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কমে যায়।

রিং বসানোর সুবিধা কী কী?

— কাটাছেঁড়ার দরকার হয় না।

—পূর্ণ অবশ (জেনারেল/রিজিওনাল অ্যানেসথেসিয়া) করার দরকার হয় না।

— হাসপাতালে কম সময় থাকতে হয়।

— রিং বসানোর পুরো প্রক্রিয়া রোগী নিজে বা তার আত্মীয়স্বজনরা মনিটরের মাধ্যমে অবলোকন করতে পারে।

—কাটাছেঁড়ার চেয়ে অনেক কম সময়ে রিং বসানো যায়।

— ইনফেকশনের সম্ভাবনা কম।

রিং বা স্টেন্ট ব্লক হতে পারে কি না?

আল্লাহর দেয়া রাস্তা বন্ধ হলে বান্দা সৃষ্ট রাস্তাও বন্ধ হতে পারে। ফের ব্লক হলেও ভয় নেই। কারণ সেটাও বেলুন দিয়ে মোটা করা যায়। এমনকি রিং বসানো বা স্টেন্টিং করাও সম্ভব হয়।

রক্তনালীর বন্ধ হওয়াজনিত সমস্যায় অ্যানজিওপ্লাস্টি চিকিত্সা সম্পর্কে আমাদের ধারণা কম থাকায় অনেক সময় আমরা অপচিকিত্সার শিকার হই অথবা সঠিক সময়ে সঠিক চিকিত্সা নিতে ব্যর্থ হই। ফলে অকালে অঙ্গহানির শিকার হতে হয়। আশা করি, আজকের লেখা এ ব্যাপারে আমাদের জ্ঞানকে আরও বেশি শাণিত করবে।

ডা. জিএম মকবুল হোসেন

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s