হঠাত্ মূর্ছা যাওয়া

মূর্ছা যাওয়ার প্রধান কারণটি রক্তবাহী নালি ও ভেগ্যাস নার্ভ-সম্বন্ধীয়। যখন শরীর সামান্য উসকানিতে অত্যধিক সাড়া দেয় আবেগময় ক্লেশকর কোনো অবস্থায়, তখন কেউ মূর্ছা যেতে পারে। মূর্ছা গেলে সাময়িকভাবে চেতনা লোপ পায়, কারণ হৃিপণ্ডের গতি ও রক্তচাপ হ্রাস পাওয়ায় মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কমে যায়।
মূর্ছা যাওয়া সাধারণত ক্ষতিকর নয় এবং কোনো চিকিত্সার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু রোগী মূর্ছা যাওয়ার সময় আঘাত পেতে পারে। মূর্ছা যাওয়ার পেছনে কোনো মারাত্মক কারণ আছে কিনা, যেমন, হার্টের গোলযোগ ইত্যাদি খুঁজে বের করার জন্য ডাক্তার রোগীকে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুপারিশ করতে পারেন।
উপসর্গ
মূর্ছা যাওয়ার আগে রোগীর বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা হতে পারে, যেমন : চামড়া ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া; চিন্তাশূন্যতা; সুড়ঙ্গ দৃষ্টি—রোগীর দৃষ্টিক্ষেত্র সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়া, ফলে রোগী শুধু তার সামনে যা থাকে তাই দেখতে পায়; বমনেচ্ছা; উষ্ণতা অনুভব করা; ঠাণ্ডা আঠালো ঘাম ইত্যাদি।
কখন ডাক্তার ডাকতে হবে
যেহেতু মূর্ছা যাওয়া কোনো গুরুতর অবস্থার উপসর্গ হতে পারে, যেমন—হার্ট কিংবা মস্তিষ্কের গোলযোগ, সেজন্য রোগীকে একবার মূর্ছা যাওয়ার পর ডাক্তার দেখাতে হবে যদি না আগে কোনো সময় মূর্ছা গিয়ে থাকে।

প্রধান কারণ 
কোনো লোক মূর্ছা যায় যখন স্নায়ুতন্ত্র বা নাড়ির গতি ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকায় তা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। কোনো মানসিক অবসাদের কারণে রোগীর নাড়ির গতি কমে যায় এবং তার পায়ের রক্তনালিগুলো প্রশস্ত হয়ে যায়। এর ফলে রক্ত পায়ে জমা হয়, যে কারণে রক্তচাপ কমে যায়। রক্তচাপ ও নাড়ির গতি কমে যাওয়ার কারণে দ্রুত মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কমে যায় এবং রোগী মূর্ছা যায়। যদিও মূর্ছা যাওয়া যে কোনো বয়সে হতে পারে, তবুও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা বয়স্কদের বেলায় হয়ে থাকে।
সাধারণ কারণ
ষ দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা।
ষ গরমে নিজেকে অনাবৃত করা।
ষ রক্ত দর্শন।
ষ রক্ত টানা।
ষ শারীরিক আঘাতের ভয়।
ষ চাপ দেয়া বিশেষ করে মলত্যাগের সময়।
ডাক্তার রোগীকে পরীক্ষা করার সময় স্টেথোস্কোপ দিয়ে হার্ট পরীক্ষা করতে
পারেন ও রক্তচাপ মেপে দেখতে পারেন। এমনকি গলায় যে প্রধান ধমনিগুলো আছে সেগুলো মর্দন করে দেখতে পারেন রোগীর মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হয় কিনা।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগ নির্ণয়
এই রোগ নির্ণয়ের আগে এর কারণগুলোর কথা চিন্তা করতে হবে, বিশেষ করে হার্টের কোনো সমস্যা আছে কিনা তা নির্ণয় করতে হবে। নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করে।
ইসিজি : হার্ট যে ইলেকট্রিক্যাল সঙ্কেত দেয়, এই পরীক্ষার মাধ্যমে তা রেকর্ড করা যায়। এটি অনিয়মিত হার্টের গতিকে ও হার্টের অন্যান্য সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পারে, যা মূর্ছা যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীকে এক দিনের জন্য বা এক মাসের জন্য বহনযোগ্য মনিটর শরীরে পরিধান করতে হতে পারে।
ইকোকার্ডিওগ্রাম : এই পরীক্ষার মাধ্যমে হার্টের আলট্রাসনোগ্রাম করা হয় এবং কোনো সমস্যা আছে কিনা (যেমন—ভাল্ক্ভের সমস্যা) সেগুলো দেখা হয়, যা মূর্ছা যাওয়ার কারণ হতে পারে।
ইটিটি : এই পরীক্ষার মাধ্যমে ব্যায়াম করার সময় রোগীর হার্টের গতি দেখা হয়। এটি সাধারণত ট্রেডমিলের ওপর হেঁটে বা জগিং করে করা হয়।
রক্ত পরীক্ষা : রক্তশূন্যতা দেখার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা যেতে পারে, যা মূর্ছা যাওয়ার কারণ হতে পারে।
টেবিল কাত করে পরীক্ষা : যদি মূর্ছা যাওয়ার পেছনে হার্টের কোনো সমস্যা থেকে না থাকে তবে ডাক্তার তাকে টেবিল কাত করে যে পরীক্ষা করতে হয় সেই পরীক্ষার জন্য উপদেশ দিতে পারেন। পরীক্ষার টেবিলের ওপর চিত করে রোগীকে শোয়াতে হবে।
টেবিলের অবস্থার পরিবর্তন করে রোগীকে বিভিন্ন কোণে ওপরের দিকে কাত করাতে হবে।
অবস্থার পরিবর্তনের কারণে রোগীর নাড়ির গতি ও রক্তচাপের কোনো পরিবর্তন আসছে কিনা এটা একজন প্রয়োগবিদ পর্যবেক্ষণ করে দেখবেন।
চিকিত্সা এবং ওষুধপত্র
বেশিরভাগ মূর্ছা রোগের ক্ষেত্রে চিকিত্সার কোনো দরকার হয় না। কী কারণে রোগী মূর্ছা যায়, সেটি বের করার জন্য রোগীকে ডাক্তার সাহায্য করবেন এবং কীভাবে তা পরীক্ষা করা যায়, সে ব্যাপারে রোগীর সঙ্গে পরামর্শ করবেন। কিন্তু রোগীর ঘন ঘন মূর্ছা যাওয়ার ক্ষেত্রে উপশমকারী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেসব ওষুধ মূর্ছা যাওয়াকে প্রতিরোধ করতে পারে সেগুলো নিম্নরূপ।
রক্তচাপের ওষুধ : উচ্চ রক্তচাপ থাকলে বিটাব্লকার ওষুধ দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। এই ধরনের ওষুধ দিয়ে মূর্ছা যাওয়াকে প্রতিরোধ করা যায়, কারণ এই ওষুধগুলো মূর্ছা যাওয়ার কিছু কিছু সঙ্কেতকে বাধা প্রধান করে।
অবসাদ রোগ চিকিত্সার ওষুধ : এই জাতীয় ওষুধ মূর্ছা যাওয়াকে সফলভাবে প্রতিরোধ করতে পারে।
রক্তনালি সঙ্কোচক : যেসব ওষুধ নিম্ন রক্তচাপে বা হাঁপানিতে ব্যবহার করা হয়, সেসব ওষুধ মূর্ছা যাওয়া প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে।
চিকিত্সা
পায়ে যাতে রক্ত কম জমা হয় সে ব্যাপারে ডাক্তার রোগীকে সুনির্দিষ্ট কৌশল সম্বন্ধে পরামর্শ দিতে পারেন। এগুলোর মধ্যে পদতলের ব্যায়াম, নমনীয় স্থিতিস্থাপক মোজা পরিধান করা বা দাঁড়ানো অবস্থায় পায়ের মাংসপেশি টানটানভাবে প্রসারিত করা এবং যদি রোগীর উচ্চরক্তচাপ না থাকে, তবে খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ খেতে পারে। অতিরিক্ত গরমে বা ভিড়ের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা পরিহার করতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে।
শল্য চিকিত্সা
হৃিপণ্ডে ঈপ্সিত গতি বজায় রাখার জন্য ব্যবহার করা বৈদ্যুতিক যন্ত্র সন্নিবেশ করে কোনো কোনো রোগী, যাদের মূর্ছা যাওয়ার রোগ আছে, তাদের হৃিপণ্ডের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
প্রতিরোধ
যদি রোগীর অনুভূত হয় সে মূর্ছা যেতে পারে, তবে তাকে শুয়ে পড়তে হবে এবং পাগুলো ওপরের দিকে তুলে রাখতে হবে। এতে মাধ্যাকর্ষণের ফলে রক্ত মস্তিষ্কে প্রবাহিত হবে। যদি রোগী শুতে না পারে তবে বসে পড়তে হবে এবং মাথা দুই হাঁটুর মাঝখানে গুঁজে রাখতে হবে, যতক্ষণ না ভালো লাগে।

ডা. একেএম আমিনুল হক

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s