হেপাটাইটিস বি : কিছু তথ্য

যকৃত্ বা লিভারের যেসব সংক্রমণ হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় হেপাটাইটিস বি। হেপাটাইটিস বি হলো এক ধরনের ভাইরাস, যেগুলো যকৃতের কোষকে আক্রমণ করে। এ ভাইরাস রক্তের মাধ্যমে বা দেহের অন্যান্য তরল পদার্থ যা এই ভাইরাসে দূষিত হয়েছে, তার মধ্য দিয়ে সংক্রমিত হয়। এ সংক্রমণের ফলে যকৃত্ অকেজো হয়ে পড়তে পারে বা তার সিরোসিস কিংবা ক্যান্সার হতে পারে।
হেপাটাইটিস বি যদিও অতি সহজে সংক্রমিত হয় এবং এ সংক্রমণের পরিণতি অনেক ক্ষেত্রেই ভয়াবহ, কিন্তু সাধারণত বড়রা অনেকেই এ ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। মোটামুটিভাবে বড়দের ক্ষেত্রে মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ লোক এই ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারে না। শিশুদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা হলো ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ। যারা এই ভাইরাস থেকে মুক্ত হতে পারে না, তাদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি’র একটা ক্রনিক সংক্রমণ থেকে যায়। ক্রনিক হেপাটাইটিস থেকে ধীরে ধীরে যকৃতের বিভিন্ন সমস্যা শুরু হয়। হেপাটাইটিস বি-তে যারা ভুগছে তারা অন্যদেরও এই রোগ সংক্রমিত করতে পারে। প্রতিরোধ-শক্তির জন্য হেপাটাইটিস বি’র সংক্রমণ হলেও ক্রনিক হেপাটাইটিস বি যাদের হয় না, সংক্রমণ থেকে মুক্তি পেতে তাদেরও মাসছয়েক লেগে যেতে পারে। শরীরে যতদিন হেপাটাইটিস বি ভাইরাস থাকে, ততদিন ভাইরাস-দূষিত লোকের শরীর থেকে অন্যের মধ্যে সেটা সংক্রমিত হতে পারে। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস এইডস ভাইরাসের থেকেও বেশি ছোঁয়াচে—প্রায় ১০০ গুণ। তবে ভাগ্যক্রমে হেপাটাইটিস বি’র একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষেধক বা টিকা আছে, যা নিলে এ রোগ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না।
এই টিকা শুধু তাদের ক্ষেত্রেই কার্যকর, যাদের হেপাটাইটিস বি হয়নি। যারা ক্রনিক হেপাটাইটিস বি অসুখে ভুগছে (যাদের সংখ্যা পৃথিবীতে প্রায় ৪০ কোটি) তাদের এই টিকা নিয়ে কোনো লাভ হবে না। হেপাটাইটিস বি’র কোনো চিকিত্সা আগে ছিল না। ইদানীং কিছু কিছু চিকিত্সা উদ্ভাবিত হচ্ছে যেগুলো আশাব্যঞ্জক।
হেপাটাইটিস বি’র সংক্রমণ কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়। বর্তমানে প্রতি বছরে এক থেকে তিন কোটি লোক হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে সংক্রমিত হয়, আর প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ লোক এই সংক্রমণের ফলে মারা যায়।
কীভাবে হেপাটাইটিস বি সংক্রমিত হয়?
হেপাটাইটিস বি প্রধানত সংক্রমিত হয় রক্ত এবং ভাইরাস-দূষিত দেহরস থেকে। এটা ঘটতে পারে :
ষ হেপাটাইটিস বি রোগীর রক্তের সঙ্গে অন্য কারও রক্ত সংস্পর্শে এলে;
ষ রোগীর সঙ্গে অরক্ষিত যৌন মিলনে;
ষ ভাইরাস-দূষিত সুচ ব্যবহার করে ইন্ট্রাভেনাস ইনজেকশন নিলে;
ষ প্রসবকালে মায়ের কাছ থেকে সন্তানে সংক্রমণ ইত্যাদি।
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস অতি সহজেই সংক্রমিত হতে পারে। শরীরের অল্প কাটা বা ছিঁড়ে যাওয়া জায়গা কোনো দূষিত রক্ত বা দেহজ তরলের সংস্পর্শে এলেই এ ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এই অতি দ্রুত সংক্রমণের দরুন রোগীর ব্লেড বা ক্ষুর দিয়ে দাড়ি কামালে, রোগীর কানের দুল পরলে, রোগীর মৃদু দংশন থেকেও এ ভাইরাস আক্রান্ত হওয়া সম্ভব। তবে সাধারণভাবে গালে বা ঠোঁটে চুমু খেলে, হাঁচি-কাশি ইত্যাদির মাধ্যমে বা হেপাটাইটিস রোগীর রান্না করা খাবার খেলে এ রোগ সংক্রমিত হয় না।
ওপরের পরিস্থিতিগুলো বিচার করলে বোঝা যায়, কাদের এই রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। যাদের বাড়িতে একজন হেপাটাইটিস বি’র রোগী আছে, তাদের বাড়ির অন্যদের মধ্যে এ রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। সাধারণভাবে যারা ডাক্তার, নার্স বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, তাদের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি, কারণ তাদের পক্ষে রোগীদের রক্ত বা দেহজ তরলের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা বেশি থাকে। যারা ইনজেকশন নিয়ে নেশা করে এবং একে অন্যের সিরিঞ্জ ব্যবহার করে, তাদের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যারা একাধিক সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে যৌনমিলনে অভ্যস্ত, তাদেরও এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। সমকামী পুরুষের মধ্যেও এ রোগ বেশি হতে দেখা যায়। তাই এটা জানার জন্য রক্ত পরীক্ষা করতে হবে।
হেপাটাইটিস বি থেকে রক্ষার উপায়
হেপাটাইটিস বি রোগের প্রতিরোধের জন্য এখন ভালো প্রতিষেধক বা টিকা আছে। আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এবং আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস শিশু থেকে শুরু করে ১৮ বছর বয়স্ক ছেলেমেয়েদের এ টিকা নিতে উপদেশ দেয়। এ টিকা তিনটি ডোজে সম্পূর্ণ হয়। প্রথম ডোজটির এক মাস বাদে আরেকটি এবং দ্বিতীয় ডোজের ছয় মাস পর তৃতীয় ডোজ নিতে হয়।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s