ওষুধের অপব্যবহার ও সতর্কতা

রোগীদের যা মেনে চলা উচিত

—শুধু ডাক্তার পরামর্শ দিলেই ওষুধ সেবন করা উচিত।

—বিশেষ অবস্থায় (যেমন গর্ভাবস্থা, লিভারের রোগ ইত্যাদি) সাধারণ ওষুধ যা প্রেসক্রিপশন ছাড়া পাওয়া যায়, তাও ডাক্তারের পরামর্শেই ব্যবহার করতে হবে।

—শুধু ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে ওষুধ কেনা উচিত। কেনার সময় তার মেয়াদকাল দেখে নিতে হবে। মনে রাখবেন, মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ আপনার রোগ সারানোর পরিবর্তে ক্ষতি করতে পারে।

—ডাক্তার ওষুধ খাবার যে নিয়ম বলে দেবেন (কতটুকু ওষুধ, কতক্ষণ পরপর, কতদিন, খাওয়ার আগে না পরে ইত্যাদি), সে অনুযায়ী তা সেবন করতে হবে। প্রয়োজনে তা লিখে রাখুন বা মনে রাখতে অন্যের সাহায্য নিন। নিজে থেকে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

—চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া নিজে ওষুধ কিনে সেবন করবেন না। এতে আপনি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন। অনেকে নিজে নিজেই দুর্বলতার জন্য ভিটামিন জাতীয় ওষুধ খেতে থাকেন। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, ভিটামিন শরীরের দুর্বলতা দূর করে না। যে কারণে শরীর দুর্বল হয়, সে কারণ দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ খেতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত ভিটামিন খেলে তারও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।

—অনেকে একবার চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে বারবার সেই ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনেন। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, প্রথম ব্যবস্থাপত্রে যে ওষুধ যতদিন খেতে বলা হয়েছে ততদিনই খাওয়া যাবে। পুনরায় একই অসুখ হলেও সেই একই ওষুধ কাজ নাও করতে পারে।

—অনেকে সামান্য কারণেই ব্যথার ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করেন। অনেকে এমনকি স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধও খান। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই এভাবে ওষুধ খেলে উপকার তো হবেই না; বরং স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

—নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করা যাবে না। সুস্থবোধ করলেও কোর্স সম্পূর্ণ করতে হবে। কোনো সমস্যা হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

—একইসঙ্গে অ্যালোপ্যাথিক ও অন্যান্য পদ্ধতির চিকিত্সা চালালে তা ডাক্তারকে জানানো উচিত।

—ওষুধ সবসময় আলো থেকে দূরে, ঠাণ্ডা, শুষ্ক স্থানে এবং অবশ্যই শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।

—কিছু কিছু ওষুধ ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হয়। নির্ধারিত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করলে এর কার্যকারিতা নষ্ট হয়, এ বিষয়ে সতর্ক থাকুন।

—ব্যবহারের সময় ওষুধ ভালো আছে কিনা দেখে নিন। নাম ও মাত্রাটা আবার খেয়াল করুন।

—অনেক সময় দোকানদাররা প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ না দিয়ে শুধু বিক্রির জন্য অন্য কোম্পানির অন্য ওষুধ দিয়ে থাকেন, বলেন ‘একই ওষুধ’। এক্ষেত্রে রোগীদের সতর্ক থাকা উচিত এবং চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্রে উল্লিখিত নামের ওষুধই কেনা উচিত। ওষুধ কেনার সময় আবার ভালো করে যাচাই করে নেবেন এবং ওষুধ বিক্রেতা লিখিত ওষুধের পরিবর্তে অন্য ওষুধ দিচ্ছে কিনা দেখে নিন।

—শিশু ও বয়স্কদের ওষুধের মাত্রা, চোখের ড্রপ বা মলম এবং ইঞ্জেকশনের প্রয়োগবিধির (যেমন মাংসে বা শিরায়) ব্যাপারে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

চিকিত্সকেরও এ ব্যাপারে দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে

—রোগীকে রোগ এবং ওষুধ সম্পর্কে ভালোভাবে জানান।

—ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানান।

—নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করলে কী ক্ষতি হতে পারে তা রোগীকে জানান। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে ওষুধ আপাতত বন্ধ করে দ্রুত ডাক্তারকে জানানোর পরামর্শ দিন।

—কখন ও কীভাবে ওষুধ বন্ধ করা যাবে জানান।

—নিয়মিত ও নিয়মমত ওষুধ খেতে উত্সাহিত করুন।

—রোগীর আর্থিক সামর্থ্য ও খরচের দিকটি মাথায় রাখুন। অযথা অতিরিক্ত দামি ওষুধ নেহাত প্রয়োজন না হলে বা জীবন রক্ষাকারী না হলে না সেবন করাই ভালো। এতে রোগীর অর্থ সাশ্রয় হবে।

—প্রেসক্রিপশনে অসুখের পূর্ণ নাম, ওষুধের নাম, মাত্রা, খাওয়ার নিয়ম, কতদিন খেতে হবে ইত্যাদি স্পষ্ট অক্ষরে সুন্দরভাবে উল্লেখ করা উচিত।

—ডাক্তারদের মনে রাখা উচিত, অযথা অতিরিক্ত ওষুধ না সেবন করাই ভালো। তাতে রোগী অনেক সময় ঠিকমত ওষুধ খেতে পারে না, এমনকি যে ওষুধটা বেশি প্রয়োজন তা বাদ দিয়ে হয়তো অপ্রয়োজনীয় ওষুধটিই সেবন করা হচ্ছে। যেমন যক্ষ্মার রোগীর বেলায় অনেকে যক্ষ্মার ওষুধের সঙ্গে স্বাস্থ্য ভালো করার জন্য ক্যালসিয়াম, ভিটামিন, আয়রন ইত্যাদি লিখে থাকেন। দেখা যায়, রোগী যক্ষ্মার ওষুধ বাদ দিয়ে এগুলোই বেশি খাচ্ছে। ফলে রোগের অবস্থা আরও ভয়াবহ হচ্ছে।

ওষুধ বিক্রেতার কর্তব্য

ওষুধ বিক্রেতাকে অবশ্যই কিছু দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করতে হবে।

—প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি করা উচিত। দেখা যায়, ওষুধ লেখা একটা কিন্তু বিক্রেতা অন্য কোম্পানির ওষুধ একই বলে বিক্রি করছেন। এটা কখনোই করবেন না।

—শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া সব ওষুধ বিক্রি করা উচিত নয়। তবে ‘ওভার দ্যা কাউন্টার’ বিক্রির জন্য, যা আইনগতভাবে বৈধ শুধু সেগুলোই বিক্রি করা যাবে।

—সুন্দরভাবে প্যাকেটের ওপর প্রয়োজনীয় মাত্রা, কতবার, কীভাবে সেবন করতে হবে, খাওয়ার আগে বা পরে, তা ভালোভাবে লিখে দেয়া উচিত। তা না হলে রোগীকে বা রোগীর লোকজনকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিন।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব

ওষুধ যেহেতু একটি অতিপ্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী পণ্য, তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও অনেক বেশি।

—দোকানে ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হচ্ছে কি-না, তা পর্যবেক্ষণ করা ও সার্বিক তত্ত্বাবধান করা।

—শিক্ষিত বা ট্রেনিংপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট ছাড়া অন্য কেউ যেন ওষুধ বিক্রি না করে, তার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

—অননুমোদিত ওষুধপত্র বিক্রি বন্ধ করা উচিত। মাঝে মধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিদর্শন টিম থাকা ভালো, যাদের কাজ হবে মাঝে মাঝে বিভিন্ন ওষুধের দোকানে নিয়মিত চেকআপ এবং ওষুধের ব্যবহার নিশ্চিত করা।

—সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের সময়মত সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।

—দেশে বিভিন্ন ধরনের অপচিকিত্সা, কুচিকিত্সা, তাবিজ-কবজ বা ঝাড়-ফুঁক ইত্যাদি অবৈজ্ঞানিক পন্থায় যেসব চিকিত্সা চলে, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

মোটকথা, আমাদের ভালোভাবে বেঁচে থাকতে এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্ম যেন সুস্থভাবে সুস্বাস্থ্য নিয়ে গড়ে ওঠে, তার জন্য ওষুধের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ওষুধের অপব্যবহার, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের রেজিস্ট্যান্স থেকে নিজেদের এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে বাঁচাতে এখনই পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s