মহাবিস্ফোরণের নতুন তত্ত্ব

মহাবিশ্ব নিয়ে মানুষের মনে চিন্তাভাবনার উন্মেষ ঘটেছিল মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই। আদিম মানুষ মহাবিশ্বের সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে এর উত্পত্তি ও জন্ম সম্পর্কে নানা অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বের আশ্রয় নিয়েছিল। ফলে সৃষ্টি হয়েছিল অনেক পৌরাণিক কাহিনী ও ধর্মীয় বিশ্বাস। সত্ত্বেও মহান আল্লাহর একমাত্র গ্রন্থ আল কোরআনের কথা চিরন্তন সত্য বাণী হিসেবে আজও তা প্রতিষ্ঠিত এবং বহাল আছে। আল্লাহ বলেন—আকাশমরছি। সুরা জারিয়াত আয়াত-৪৭। তবে আল কোরআনের ওই ঘোষণা ১৫০০ বছর আগের—যখন কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ছিল না।
বর্তমানের বিজ্ঞানীরা বলেছেন, আমাদের এ মহাবিশ্ব সদা সম্প্রসারণশীল। ১৯২২ সালে সর্বপ্রথম রুশ গণিতবিদ আলেকজান্ডার ফ্রাইডম্যান ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, মহাবিশ্ব স্থির নয়, তা সম্প্রসারণশীল। ছুটন্ত সব গ্যালাক্সি সুদূর অতীতে নিশ্চয়ই একত্রীভূত ছিল। একটি গাণিতিক বিন্দু—যাকে বলা হয় সিংগুলারিটি—ওই বিন্দুতেই ঘটে মহাবিস্ফোরণ বা Big Bang। পরে বিজ্ঞানীমহলে এ নামটিই প্রচলিত হয়ে যায়—বর্তমান বিশ্বে যা খুবই জনপ্রিয় তত্ত্ব। অবশ্য আগে মহাবিশ্বের উত্পত্তি নিয়ে আরও বেশ কয়েকটি তত্ত্বের বা Theory-র উন্মেষ হয়েছিল। তা হলো, স্থিরাবস্থা তত্ত্ব, দোলায়মান মহাবিশ্বতত্ত্ব ইত্যাদি।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন,

মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে এ বিশ্বজগতের সময় Time ও মাত্রা Begin শুরু হয়েছে। বিজ্ঞানীরা আরও বলেন, মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে এ বিশ্বজগত্ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় সংগঠিত হয়েছিল বিস্ফোরণের প্রথম ১ সেকেন্ডেরও কম সময়ে। মহাবিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে সময়ের সৃষ্টি। এর আগে সময়ের অস্তিত্বই ছিল না। তাহলে কি আমরা বলতে পারি মহাবিস্ফোরণ যখন হয়েছিল, তখন ঘণ্টা : মিনিট : সেকেন্ড (০০ : ০০ : ০০) সবই শূন্য ছিল। অর্থাত্ তখন ছিল মানবচেতনা অবোধগম্য ও জ্ঞানবহির্ভূত এক অস্তিত্বহীন অবস্থা।
সে যা-ই হোক, এ তো গেল বর্তমানের বিশ্বখ্যাত সবচেয়ে গ্রহণীয় জনপ্রিয় মহাবিস্ফোরণের কথা। মহাবিশ্ব সৃষ্টির এই বিগব্যাং তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বর্তমানে নতুন একটি তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই তত্ত্বের নাম কোয়াসি স্টেডি স্টেট কসমোলজি। এই তত্ত্বে এমন কিছু মহাজাগতিক সমস্যার সমাধান দেয়া হয়েছে—যেসব জটিল সমস্যার সমাধান মহাবিস্ফোরণের তত্ত্ব দিতে পারেনি। এ তত্ত্বে বলা হয়েছে—সৃষ্টির আদিতে একটি নিদ্দিষ্ট বিন্দু থেকে সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু না হয়ে মহাবিশ্বের সর্বত্র একই সময়ে মহাবিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল। আইনস্টাইনের তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে বর্তমানের প্রচলিত ধারণায় বিজ্ঞানীরা বলেন, আজ থেকে ১৪০০ কোটি বছর আগে বিগব্যাং নামে পরিচিত প্রচ এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে এ মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। আর তখন থেকেই সময়ের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার করা নতুন এক তত্ত্বে বলা হয়েছে—বিগব্যাং থেকেই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়নি; এর আগে ও অনেক মহাবিস্ফোরণ হয়েছে। ব্রিটেনের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ নেইল টুরক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পল স্টেইন হার্ড মহাবিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে বলেছেন, চক্রের মতো অনেক বছর বছর পর পর মহাবিস্ফোরণ হয়। তাদের মতে ১৪০০,০০০০০০০ বছর আগে নয়; সময় সৃষ্টি হয়েছিল অন্তত ১০০০০০০,০০০০০০০ (১ লাখ কোটি) বছর আগে। মহাশূন্য সময়ের ক্ষেত্রে সিংগুলারিটি হচ্ছে এমন একটি আবস্থা—যখন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে বস্তুর ঘনত্ব ও আয়তন অসীম হয়ে যায়। সিংগুলারিটি নামের অসীম ঘনত্বের বিন্দু অবস্থা থেকে মহাবিশ্ব ছড়িয়ে পড়ে। পরে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে গ্যালাক্সি সৃষ্টি করে। গ্যালাক্সিগুলো অভ্যন্তরে চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান নীহারিকা ঘনীভূত হয়ে তৈরি হয় স্টার নক্ষত্র। সূর্যের মতো কিছু নক্ষত্রের চারপাশে গঠিত হয় পৃথিবীর মতো গ্রহ।
১৯৬০ সাল থেকে মহাবিশ্বে প্রাথমিক সময় সিংগুলারিটির ব্যাখা করে আসছেন। বিশ্বে সব বস্তু ১৪০০ কোটি বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিল বলে এর ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। সময় কীভাবে শুরু হয়েছিল, সত্যিকার অর্থে কেউ কোনো তত্ত্বই দিতে পারেনি। কিন্তু আমরা বলছি, মাধ্যাকর্ষণের এ উন্নত তত্ত্ব অনুযায়ী ১৪০০ কোটি বছর আগে সিংগুলারিটি থেকে সময়ের সৃষ্টি হয়নি। বর্তমানের বেশিরভাগ জ্যোতির্বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন, সব নক্ষত্র জ্বলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হতেই থাকবে। কিন্তু এই তত্ত্বের মধ্যে একটা সমস্যা রয়েছে। আইনস্টাইনের আবিষ্কার করা মহাজাগতিক ধ্রুবক হচ্ছে ডার্ক এনার্জি নামে পরিচিত মাধ্যার্কষণের বিপরীতে কর্মরত একটা রহস্যজনক শক্তি—যা ছায়াপথকে পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু প্রচলিত মহাবিস্ফোরণের তত্ত্ব অনুযায়ী এই ধ্রুবকের মান খুবই ছোট। প্রফেসর নেইল টুরক বলেন, আমাদের এ তত্ত্ব এসব সমস্যার সমাধান দেবে। তিনি আরও বলেন, মহাবিস্ফোরণের এই ভিন্ন ধারণা মেনে নিলে আপনারা বুঝতে পারবেন, কেন আজকের কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট বা ধ্রুবক এত ক্ষুদ্র। এটার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা প্রচলিত তত্ত্বে দিতে পারে না। ওই বিজ্ঞানী আরও বলেন, মূল মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের চাইতে নতুন এই তত্ত্ব গ্রহণ ও বোঝা সহজ। প্রফেসর নেইল টুরক আরও বলেন, এখানে আসলে মৌলিক ব্যাপার হচ্ছে এই বিশ্বাস যে, শূন্য থেকে কোনোভাবে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মধ্যে মহাবিশ্বের সৃষ্টির রহস্য নিয়ে আজও যথেষ্ট মতভেদ আছে। তারা এখনও আবিষ্কার করতে পারেননি, সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তার যথার্থ ব্যাখ্যা। যা-ই হোক, পদার্থবিদ্যার অন্য সব শাখায় কোন তত্ত্বের মধ্যে অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে, তত্ত্বের মধ্যে সমস্যা দেখা গেলে, বিজ্ঞানীরা পদার্থবিদ্যার নিয়ম ও সমীকরণ অনুসারে উন্নত সংস্কারের চেষ্টা করেন—যাতে ওই তত্ত্ব আরও সঠিক ও নির্ভুল হয়—মহাবিস্ফোরণের আগের তত্ত্ব যা বুঝতে পারেনি। আমরা এখন সেটা বুঝতে পেরেছি। মার্কিন এক বিজ্ঞানী বলেছেন, নতুন এ তত্ত্ব মহাবিশ্ব সম্পর্কে সুনিদ্দিষ্ট ভবিষদ্বাণী করার পরিবর্তে কিছু ধ্রুবকের মান দেয়া হয়েছে—যা পদার্থবিদদের জন্য পরীক্ষা করা কঠিন।

এবিএম সাইফুল ইসলাম গাজী

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s