তরুণাস্থি ইনজুরি এবং চিকিৎসা

তরুণাস্থি বা কার্টিলেজ হলো নরম হাড় যা শরীরের বিভিন্ন শক্ত হাড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং জোড়ার মধ্যখানে অবস্থান করে। হাঁটুর জোড়ায় দুই হাড়ের মাঝখানে দুটি তরুণাস্থি বা কার্টিলেজ থাকে। এদের মেনিসকাস বলে। একটি মেনিসকাস হাঁটুর জোড়ার বাইর পার্শ্বে থাকে এবং অপরটি হাঁটুর জোড়ার ভেতর পার্শ্বে থাকে। আকৃতিতে মেনিসকাস বা তরণাস্থি ইংরেজি অক্ষর সি বা ক্রিসেন্টের মতো। এই আকৃতির জন্য হাঁটুর জোড়ায় সহজেই নড়াচড়া হয় এবং দৃঢ় অবস্থা বজায় থাকে। মেনিসকাসের বাইরের অংশে রক্তের প্রবাহ থাকে, তাই ইনজুরি হলে জোড়া লাগে কিন্তু ভেতরের অংশে রক্তের প্রবাহ নেই বলে ইনজুরি হলে জোড়া লাগে না। মেনিসকাস শরীরের ওজন সমভাবে উরুর হাড় থেকে পায়ের হাড়ে সরবরাহ করে এবং হাড়ের প্রয়োজনীয় নড়াচড়ায় সহায়তা করে। যানবাহন (বাস, রিকশা) থেকে নামতে গিয়ে যদি পা মাটিতে থাকে কিন্তু হাঁটু ঘুরে (রোটেশন) যায়, সে ক্ষেত্রে মেনিসকাস ইনজুরি হয়। বাস, কার ও মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট এবং মই, সিঁড়ি বা ওপর থেকে পড়ে গিয়ে মেনিসকাস বা তরুণাস্থি ইনজুরি হয়। ফুটবল, বাস্কেটবল, ক্রিকেট, বেডমিন্টন ও টেনিস খেলোয়াড়দের মেনিসকাস ইনজুরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
আঘাতের ফলে হাড় ভাঙলে ও জোড়া স্থানচ্যুতি হলে অন্যান্য লিগামেন্টের সঙ্গে মেনিসকাসও ইনজুরি হয়। আর্থ্রাইটিস এবং বয়স্কদের ব্যবহারজনিত ক্ষয়ের কারণে মেনিসকাস ইনজুরি হয়।

মেনিসকাস ইনজুরির লক্ষণগুলো
হাঁটুতে ব্যথা হয়। ব্যথা প্রথমে অল্প থাকে এবং পরে বাড়তে থাকে। আঘাতের পরও খেলোয়াড় খেলতে থাকে এবং আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি হাঁটতে থাকে, কিন্তু কিছু সময়ের পর আর পারে না। আঘাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাঁটু ফুলে। কখনও দেখা যায়, প্রথম আঘাতের পর হাঁটুর জোড়া ফুলে না, কিন্তু হালকা ব্যথা হয়। মাস বা বছর পর ফের আঘাত পেলে জোড়ায় তীব্র ব্যথা হয় এবং বেশ ফুলে। কোনো কোনো হাঁটু কিছুদিন পরপর ফুলে আবার কমে কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায় না এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত করে। হাঁটু পুরোপুরি ভাঁজ বা সোজা করা যায় না। মাঝেমাঝে হাঁটু ভাঁজ করার পর আর সোজা করা যায় না (লকিং হয়) এবং সঙ্গে ব্যথা হয়, তখন হাঁটুকে বিভিন্ন দিকে মুভমেন্ট করিয়ে সোজা করতে হয়। বেশিদিন এভাবে চলতে থাকলে হাঁটুর পেশি শুকিয়ে যায় এবং পেশি দুর্বল হয়। ফলে বসলে উঠতে কষ্ট হয়। হাঁটুর জোড়ায় মুভমেন্ট কমে বা জোড়া জমে যায়।
ওসটিওআর্থ্রাইটিস হয়ে জয়েন্ট নষ্ট হতে থাকে।

চিকিৎসা
মেনিসকাস ইনজুরির চিকিত্সা নির্ভর করে ইনজুরির ধরন, টিয়ারের আকৃতি—ছোট/বড়, রোগীর অসুবিধার তীব্রতা এবং রোগীর বয়সের ওপর। তবে প্রাথমিক চিকিত্সা সর্বক্ষেত্রে একই রকম। চিকিত্সা প্রদানের আগে রোগীকে ভালোভাবে পরীক্ষা, প্রয়োজনে হাঁটুর এক্স-রে এবং বিশেষ ক্ষেত্রে এমআরআই করা একান্ত দরকার। ছোট আকৃতির টিয়ার যা রক্ত প্রবাহিত অংশে (বাইরের) হয় তা কনজারভেটিভ বা মেডিকেল চিকিত্সায় ভালো হয়। আঘাতপ্রাপ্ত হাঁটুকে বিশ্রাম দিতে হবে। বরফের টুকরা প্লাসটিকের থলিতে নিয়ে এবং থলিকে কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে হাঁটুতে লাগাতে হবে প্রতি ঘণ্টায় ১০ মিনিট বা দুই ঘণ্টায় ২০ মিনিট। ইলাসটিক কমপ্রেসন বা নি-ক্যাপ ব্যবহারে ব্যথা ও ফুলা কমে আসে। ব্রেস ব্যবহার করে হাঁটু উপরে উঠিয়ে রাখলে ব্যথা ও ফুলা কমে যাবে। তিন সপ্তাহ ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটার পর হাঁটুর পরিপূর্ণ নড়াচড়া ও পেশি শক্তিশালী হওয়ার ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে। কনজারভেটিভ চিকিত্সায় ভালো না হলে বা মারাত্মক ইনজুরি হলে সর্বাধুনিক সার্জিক্যাল চিকিত্সা পদ্ধতিতে ছোট দুটি ছিদ্রের মাধ্যমে আর্থ্রোস্কোপ হাঁটুতে প্রবেশ করিয়ে মেনিসকাস ট্রিমিং বা সেভিং (মেনিসেকটোমি) এবং প্রয়োজনে সেলাই করা। আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারির পর উপযুক্ত ও পরিমিত পরিচর্যার (রিহেবিলিটেশন) মাধ্যমে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে ।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s