কেন জন্মায় জোড়া যমজ?

জন্ম থেকেই যেসব শিশুর শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অথবা গায়ের চামড়া পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাদের বলা হয় যুক্ত যমজ (কনজয়েন্ড টুইন)। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের এক গবেষণায় জানা গেছে, প্রতি দুই লাখ শিশুর মধ্যে জোড়া যমজ হিসেবে জন্ম নেয় কেবল এক জোড়া শিশু। প্রতিবছর এ ধরনের মোট ৪০ হাজার যমজ শিশুর জন্ম হয়। তবে এদের মধ্যে বেঁচে থাকে কেবল ১ শতাংশ শিশু। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক অপূর্ণাঙ্গতা এবং রোগাক্রান্ত শরীরের কারণে এসব শিশুর বেঁচে থাকার হার খুবই কম। ১০০টি জোড়া যমজের মধ্যে বেঁচে থাকে মাত্র ৫ থেকে ২৫টি শিশু। প্রতি ১০০-এর মধ্যে ৩৫টি জোড়া যমজ এক দিনের বেশি বাঁচে না। চিকিৎসকদের মতে, এ ধরনের শিশুদের মধ্যে ছেলের চেয়ে মেয়েশিশুর বেঁচে থাকার হার বেশি। জন্মের পর শতকরা ৭০টি মেয়েশিশু বেঁচে থাকে। তবে জোড়া যমজ হিসেবে বেশি জন্মায় ছেলেশিশু। বেঁচে থাকা এসব শিশুর মধ্যে কারো হয়তো একটি হাত থাকে, না হয় একটি পা। বেশির ভাগ জোড়া যমজকেই সারা জীবন হুইলচেয়ারে কাটাতে হয়।
যমজ শিশু জন্ম নেয় দুটি কারণে_যদি মায়ের গর্ভে দুটি ডিম্বাণু আসে এবং শুক্রাণুর সংস্পর্শে দুটি ডিম্বাণুই উর্বরতা লাভ করে এবং যদি কোনো ডিম্বাণু শুক্রাণুর সংস্পর্শে উর্বরতা পাওয়ার পর দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। দুটি ডিম্বাণু থেকে জন্ম নেওয়া যমজ শিশুরা আলাদা লিঙ্গের (ছেলে বা মেয়ে) হতে পারে। অন্যদিকে একটি ডিম্বাণু আলাদা ভাগে ভাগ হয়ে গেলে একই লিঙ্গের যমজ শিশুর জন্ম হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একটি ডিম্বাণু দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে বেড়ে ওঠে যমজ শিশুর ভ্রূণ, জন্মানোর সময় যারা বাঁধা থাকে একটি নাড়িতেই। দুটি ভ্রূণ নিয়ে বেড়ে ওঠা একটি ডিম্বাণু দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার জন্য কয়েক সপ্তাহ সময় প্রয়োজন হয়। কোনো কারণে সে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে মায়ের গর্ভে বেড়ে ওঠে জোড়া যমজ শিশু। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, নানা ধরনের জোড়া যমজের জন্ম হয়। তবে বেশি জন্মায় থোরাকপাগাস, অমফালোপাগাস ও ক্রানিওফাগাস টাইপের শিশু। থোরাকপাগাস শিশুরা সাধারণত শরীরের ওপরের অংশে সংযুক্ত থাকে। এদের হৃৎপিণ্ড ও বুকের চামড়া একটিই থাকে। শতকরা ৪০টি জোড়া যমজ শিশু এভাবে জন্ম লাভ করে। অমফালোপাগাস যমজদের বুক থেকে কোমর পর্যন্ত সংযুক্ত থাকে। এভাবে জন্ম নেয় শতকরা ৩৩টি শিশু। ক্রানিওফাগাস টাইপের শিশুর জন্ম নেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। শতকরা মাত্র দুটি এভাবে জন্ম নেয়। এ ধরনের শিশুদের মস্তিষ্ক সংযুক্ত থাকে।

এক দেহ দুই প্রাণ

মানুষের কাছে তাঁরা এক বিস্ময়। পথেঘাটে চলতে গেলেও তাঁদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে পথচারীরা_এঁরা কি আসলেই দুজন? নাকি একজনেরই দুটি মাথা! তবে এমন ছানাবড়া চোখ দেখতে অভ্যাস হয়ে গেছে। যা খুশি ভাবুক লোকে। নিজেদের নিয়েই ডুবে থাকেন অ্যাবিগেইল আর ব্রিটনি হ্যানসেন। কারণ জন্মের পর থেকেই কৌতূহলী চোখ দেখতে তাঁরা অভ্যস্ত। জীবনের ২২টি বছর পার করে দিয়েছেন এমনকি বাঘা বাঘা চিকিৎসককেও বিস্মিত করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, শারীরিক ত্রুটির ফলে এ ধরনের জোড়া যমজ এক বছরও বেঁচে থাকতে পারে না।
ওঁরা ভূমিষ্ঠ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই ওঁদের মাকে ডেকে ডাক্তাররা বলেছিলেন, বড়জোর আজ রাতটা কোনোভাবে টিকে থাকতে পারে। দিনটি ছিল ১৯৯০ সালের ৭ মার্চ। যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার একটি হাসপাতালে জন্মেছিলেন এই জোড়া যমজ। ওঁদের মা কেটি হ্যানসেন পেশায় নার্স। তিনি নিজেও খুব ভালো করে জানতেন, এ ধরনের শিশুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আসলেই খুব কম। এর পরও সন্তান মরে যাবে তাঁর চোখের সামনে_কথাটা মেনে নিতে পারল না মায়ের অবুঝ মন। ডাক্তারদের সঙ্গে কথা শেষ করেই তিনি ছুটে গেলেন আইসিইউতে। গিয়ে দেখেন, মুগ্ধ চোখে সন্তানদের দিকে তাকিয়ে আছেন ওঁদের বাবা মাইক। সম্ভবত মা-বাবার আশীর্বাদেই সবাইকে অবাক করে বহাল তবিয়তে কয়েকটি দিন পার করে ফেললেন ওঁরা, যাঁদের শরীর একটাই। তবে মাথা দুটি। হাত-পা, হৃৎপিণ্ড, পাকস্থলী দুটি। গল ব্লাডারও দুটি। কিডনি তিনটি। ফুসফুস দুই জোড়া। এসব নিয়েই আস্তে আস্তে বেড়ে উঠতে থাকলেন এক শরীরের দুই মানুষ।
জীবনটাকে খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছেন আবিগেইল-ব্রিটনি। শরীরের বাঁ দিক ব্রিটনি আর ডান দিক অ্যাবিগেইল। প্রতিদিন একত্রেই সারেন দাঁত ব্রাশ থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সব কাজ। একটি শরীরের এ দুই মানুষ অনেক গুণের অধিকারী। নিজ নিজ হাত ব্যবহার করে দুই বোনই চমৎকার পিয়ানো বাজাতে পারেন। অ্যাবিগেইল পিয়ানোর ডান দিক আর ব্রিটনি বাজান বাঁ দিক। তাঁরা খুব ভালো সাইকেল চালাতে পারেন। ভলিবল খেলায় দক্ষ, সাঁতারে ওস্তাদ। ভালো মোটরসাইকেল চালান। গাড়ি চালাতে পারেন যেকোনো সাধারণ মানুষের মতো দক্ষতায়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে গাড়ি চালানোর পরীক্ষায় পাস করে পেয়েছেন ড্রাইভিং লাইসেন্স।
ব্যক্তিগত জীবনে দুজন একেবারেই আলাদা দুটি সত্তা। দুজনের ব্যক্তিত্ব, রুচিবোধ আলাদা। কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সময় দুজনই গলায় আলাদা নেকলেস পরেন, নিজ নিজ পায়ে ভিন্ন রঙের জুতা পরেন। খাওয়ার সময় আলাদা দুটি প্লেট নিয়ে খেতে বসেন। ওঁদের মাও চেয়েছেন আলাদা সত্তা হিসেবেই বেড়ে উঠুক তাঁর এক শরীরের দুুটি সন্তান_’আমি চেয়েছি দুজনই আলাদা পরিচয়ে বেড়ে উঠুক। এ জন্য সিনেমা দেখতে যাওয়ার সময় ওদের দুটি টিকিট কেটে দিয়েছি; যদিও ওরা এক সিটে বসেই সিনেমা দেখত। প্রতিটি জন্মদিনে আলাদা কেকের ব্যবস্থা করেছি।’ ফলে ছোটবেলা থেকেই অ্যাবিগেইল আর ব্রিটনি পরস্পরকে আলাদা ভাবেন। একবার সুইমিংপুলে সাঁতার কাটার সময় একটি শিশু ওঁদের জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আচ্ছা, তোমার কি দুটি মাথা?’ ব্রিটনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘না, আমাদের দুই বোনেরই একটি করে মাথা।’
একসঙ্গে বেড়ে উঠলেও দুই বোনের স্বভাব একেবারেই আলাদা। অ্যাবিগেইল জেদি, চুপচাপ। আর সারা দিন হাসিঠাট্টায় মেতে থাকেন ব্রিটনি, হৈচৈ করে বেড়ান। আত্মীয়স্বজনের মতে, হ্যানসেন পরিবারের সবচেয়ে মজার মানুষটি হলেন ব্রিটনি। তবে একটা শরীর নিয়ে সব সামলানো মুশকিল। তাই একে অন্যের পরামর্শ নিয়ে তাঁরা সব কাজ সামলানোর চেষ্টা করেন। মাঝেমধ্যে তাঁদের ঝগড়াও বেধে যায়। বিশেষ করে শপিংয়ের সময়। অ্যাবিগেইল হয়তো লাল জুতা পছন্দ করলেন। কিন্তু ব্রিটনির পছন্দ কালো জুতা। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ঝগড়া। অবশ্য একসময় সমঝোতায় আসতে হয়। দুই রঙের জুতাই এক পাটি করে কিনতে হয়। ভিন্ন ভিন্ন রঙের জুতা নিজ নিজ পায়ে পরে ঘুরতে বের হন দুই বোন। কখনো আবার খেতে বসে শুরু হয় দুই বোনের মন-কষাকষি। একজন কাঁটাচামচ দিয়ে খেতে চাইলে অন্যজন খেতে চান ছুরি দিয়ে। একজন খেতে শুরু করলে অন্যজনকে তখন অপেক্ষা করতে হয়, কখন খাওয়া পেটের মধ্যে পৌঁছবে। এ ধরনের কাণ্ড দেখে তাঁদের বন্ধুরা খুবই মজা পান। মাঝেমধ্যে তাঁদের উসকেও দেন। আবার কখনো ঝগড়া মিটিয়ে দিতে হয়। আজব এই জোড়া মানবীকে খুব ভালোবাসেন বন্ধুরা। কথা প্রসঙ্গে একজন কাছের বন্ধু বললেন_’আমরা তাদের সম্মান করি। তারা সত্যিই খুব ভালো মানুষ। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, অ্যাবিগেইল আর ব্রিটনি একজন আরেকজনের মনের কথা বুঝতে পারে। একজনের মুখের কথা কেড়ে অন্যজন সেটা বলে দিতে পারে। তখন খুবই অবাক লাগে।’
শারীরিক দিক থেকেও দুই বোন আলাদা। ব্রিটনির শরীর খুব সংবেদনশীল। অল্প ঠাণ্ডায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন। একবার তাঁর নিউমোনিয়া হয়েছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তখন অ্যাবিগেইলকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছে। বিরক্ত অ্যাবিগেইল তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন_এভাবে আর না। পরস্পরের কাছ থেকে আমাদের আলাদা হওয়া উচিত। এ কথা শুনে অনেক কেঁদেছিলেন ব্রিটনি। বোনকে বুঝিয়েছিলেন, ‘অপারেশনের টেবিলে গেলে আমরা মরে যেতে পারি। এভাবেই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।’ একসময় বোনের কথা মেনে নেন অ্যাবিগেইল, প্রতিশ্রুতি দেন_আর কোনো দিনই এ ধরনের কথা বলব না। নিজের সেই প্রতিজ্ঞায় এখনো অটল অ্যাবিগেইল_যেকোনো সিদ্ধান্ত আমরা দুজন মিলেই নিই। আমাদের মধ্যে একজন খুশি থাকলেই অন্যজনের মনটাও ভালো থাকে।’
১২ বছর বয়সে একবার অপারেশন হয়েছিল এই জোড়া যমজের। বুকের কাছে বেড়ে ওঠা অপরিণত তৃতীয় হাতটি অপারেশন করে ফেলে দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে যেন শ্বাসকষ্ট না হয় সে জন্য ফুসফুসে ছোট্ট অপারেশনও করা হয়। এর বাইরে তাঁদের আর কোনো বড় রকমের শারীরিক সমস্যা হয়নি।
১৯৯৬ সালে এই যমজকে নিয়ে ব্রিটেনের ডেইলি মেইল পত্রিকায় একটি ফিচার ছাপানো হয়েছিল। পরে তাঁরা অংশ নেন ‘অপরাহ উইনফ্রে শো’তে। অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান তাঁরা। তাঁদের দেখা গেছে লাইফ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেও। এর আগ পর্যন্ত নীরবে, সাধারণ জীবন যাপন করতেন এই জোড়া যমজ। চেষ্টা করতেন মিডিয়া থেকে দূরে থাকতে। তবে ছোটবেলা থেকেই কৌতূহলী সাংবাদিকরা তাঁদের পেছনে লেগে আছেন। ফলে ১৬ বছর বয়সে সম্মতি দিতে হয় নিজেদের জীবন নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরির।
হ্যানসেন বোনরা নিজেদের খুব ভাগ্যবতী হিসেবে ভাবতেই ভালোবাসেন। অল্প কটি জোড়া শিশুর মধ্যে তাঁরাও রয়েছেন, যাঁরা পেরোতে পেরেছেন শৈশবের সোনালি সময়; যাঁরা লেখাপড়া করতে পেরেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে, ঘুরেছেন পুরো ইউরোপ। স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছেন মিনেসোটার বেথেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
অ্যাবিগেইল আর ব্রিটনি হ্যানসেন এখন মনের মতো একটি স্কুল খুঁজে বেড়াচ্ছেন, যেখানে শিক্ষকতা করা যাবে। কেউ তাঁদের দেখে চোখ কুঁচকে তাকাবেন না। মনকে জিজ্ঞেস করবেন না_এদের যেন কোথায় দেখেছি?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s