তৃতীয় প্রজন্মে আমাদের মোবাইল

উন্নত বিশ্ব যেখানে ২০০১ সালে থ্রিজি প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে এখন তার পরবর্তী প্রজন্মের (ফোরজি ও এলটিই) পথে এক পা বাড়িয়ে, সেখানে আমরা এত দিনে থ্রিজি চালু করছি। তাও পূর্ণাঙ্গভাবে নয়। অবকাঠামো নির্মাণ শেষ না হওয়ায় এর সব সুবিধা এখনই পাওয়া যাবে না। ‘অসমপূর্ণ’ থ্রিজি কবে ‘সম্পূর্ণ’ হবে তাও নিশ্চিত নয়। ফলে একরকম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই তুলনামূলক ‘আধুনিক’ একটি প্রযুক্তিতে প্রবেশ করলাম আমরা। খবরটি খুশির হলেও উল্লসিত হওয়ার মতো নয়।

যেভাবে থ্রিজি

মোবাইল নেটওয়ার্ক সাধারণত প্রতি ১০ বছর পর পরবর্তী প্রজন্মে উন্নীত হয়। এর সূচনা হয়েছিল ১৯৮১ সালে, ওয়ানজি বা প্রথম প্রজন্মের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এটি বিশ্বের প্রথম তারবিহীন যোগাযোগ ব্যবস্থা হলেও যোগাযোগের জন্য তখনো ব্যবহার করা হতো অ্যানালগ পদ্ধতি। ১৯৯১ সালে এ পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন এনে চালু হয় টুজি বা দ্বিতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক। যোগাযোগের কাজে এতে ডিজিটাল সিগন্যাল ব্যবহার করা হয়। প্রথমবারের মতো যুক্ত হয় মোবাইল এসএমএস, মোবাইল ইন্টারনেট, সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা এবং সপষ্ট কথা বলা ও শোনার সুবিধা। মোবাইল ফোন দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়া ও আজকের অবস্থানে পৌঁছার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্কই আসল কৃতিত্বের দাবিদার।
২০০১ সালে এসে আলোড়ন তোলে তৃতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক_থ্রিজি। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন ১৫ বছর গবেষণার পর ‘আইএমটি-২০০০’ কোড নামে এ প্রযুক্তি চালু করে। এর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪০০ মেগাহার্জ থেকে ৩ গিগাহার্জ পর্যন্ত বেতার তরঙ্গ। ১৯৯৮ সালে জাপানে পরীক্ষামূলক চালুর পর ২০০১ সালে সবার জন্য প্রযুক্তিটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
থ্রিজি সেবার মধ্যে ভয়েস টেলিফোনি, ভিডিও কল, ভিডিও কনফারেন্স এবং জিপিএস সেবাগুলো বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এর তথ্য আদান-প্রদানের গতি সর্বনিম্ন ২০০ কিলোবাইট থেকে সর্বোচ্চ ২ মেগাবাইট পর্যন্ত। এর আগে দ্বিতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্কে ‘গ্লোবাল পকেট রেডিও সার্ভিস (জিপিআরএস)’ বা ‘এইজ’ দিয়ে সর্বোচ্চ ১৮৩ কিলোবাইট/সেকেন্ডে তথ্য আদান-প্রদান করা যেত। এ ছাড়া থ্রিজিতে মোবাইল টিভি, ফিঙ্ড ওয়্যারলেস ইন্টারনেট এঙ্সে, স্পষ্ট কথা বলার সুবিধা থাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠতে সময় লাগে না।

কাদের জন্য থ্রিজি

আপনার ফোনে ‘স্কাইপি’ আছে, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ভিডিও কল করতে পারছেন না। আপনার স্মার্টফোনের ‘লাইভ টিভি’তে বারবার প্রেস করেও লাভ হয়নি! ‘গুগল ম্যাপ’ দেখে কোনো যাওয়ার পথ নির্দেশনা চেয়েছেন, কিন্তু ম্যাপটি আপনাকে পথ দেখাচ্ছে না! এগুলো যদি ঘটে থাকে, তাহলে থ্রিজি আপনার জন্য ‘আশীর্বাদ’ হয়ে এসেছে। এখন থেকে এসব সেবাই আপনি পাবেন এক ক্লিকে, থ্রিজির গুণে। সাধারণ ব্যবহারকারী, যিনি মোবাইল প্রযুক্তির নূ্যনতম সুবিধাটুকু চান, তাঁর জন্যও থ্রিজি কাজে আসবে। ভিডিও কল, মোবাইল টিভি, নিরবচ্ছিন্ন ফোনালাপ কে না চায়!

লাগবে থ্রিজি হ্যান্ডসেট

যেকোনো হ্যান্ডসেটেই থ্রিজি সুবিধা পাওয়া যায় না। এর জন্য হ্যান্ডসেটে থ্রিজি সুবিধা থাকতে হবে। সব স্মার্টফোনেই থ্রিজি সুবিধা রয়েছে। সাধারণত ২০০৩ সালের পর থেকে এ ধরনের হ্যান্ডসেট তৈরি করছেন নামকরা হ্যান্ডসেট নির্মাতারা। অন্তত ২ মেগাপিঙ্লে ক্যামেরা আছে এমন হ্যান্ডসেটে থ্রিজি সুবিধা থাকার সম্ভাবনা। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সেট কেনার সময় ম্যানুয়াল এবং এর ইন্টারনেট সুবিধা যাচাই করে নিন। মোবাইল সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহকসেবা কেন্দ্রেও ফোন করে জেনে নিতে পারেন।

বিশ্বব্যাপী থ্রিজি

থ্রিজি নেটওয়ার্কে টুজির তুলনায় একেবারে ভিন্ন বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করা হয়। এ সুবিধা পেতে হলে সমপূর্ণ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হয় ও নতুন তরঙ্গের জন্য লাইসেন্স নিতে হয়। প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট জটিল ও ব্যয়বহুল। তার পরও বিশ্বের ১৫৫টি দেশে থ্রিজি প্রযুক্তি রয়েছে।
শুরুতেই জাপান ও তাইওয়ান তাদের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা তৃতীয় প্রজন্মে উন্নীত করে। ২০০৮ সালে উত্তর কোরিয়া, ফিলিপাইন ও ভারত এবং ২০০৯ সালের শুরুতে চীন পুরোপুরি থ্রিজি ব্যবহার শুরু করে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম থ্রিজি সেবা নিয়ে আসে অপারেটর ‘ডায়ালগ অ্যাক্সিয়াটা’। এরপর বিএসএনএল, ম্যাক্সিস, ভোডাফোন, টাটা ডকোমো, এয়ারটেল, রিলায়েন্স এ সেবা চালু করে। উপমহাদেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কার সবগুলো নেটওয়ার্ক সর্বপ্রথম থ্রিজিতে উন্নীত হয়। এরপর নেপালের ‘নেপাল টেলিকম করপোরেশন’ এবং পাকিস্তানের ‘পিটিসিএল’ থ্রিজি চালু করে। আরেক নেপালি অপারেটর ‘এনসেল’ মাউন্ট এভারেস্টকেও উচ্চগতির থ্রিজির আওতায় আনে। চলতি বছরের মার্চ মাসে অপারেটর ‘ইটিসালাত’-এর সহায়তায় আফগানিস্তানও থ্রিজি নেটওয়ার্কে উন্নীত হয়।
ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও উত্তর আমেরিকার বেশির ভাগ দেশ ২০০৫ সালের মধ্যেই থ্রিজির ব্যবহার শুরু করে। ২০০৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় থ্রিজি চালুর মাধ্যমে আফ্রিকা মহাদেশে থ্রিজি চালু করে ‘ভোডাকম’। এরপর মরক্কো, কেনিয়া, তানজানিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, সোমালিল্যান্ডও থ্রিজির আওতায় চলে আসে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম থ্রিজি চালু হয় ইরাকে। ২০০৭ সালে ‘মোবিটেল ইরাক’ এটি চালু করে। এরপর জর্দান, লেবানন, ইরানে থ্রিজি চালু করা হয়।

দৃষ্টি চতুর্থ প্রজন্মে

২০০৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে এবং ২০১১ সালে পুরোদমে চালু হওয়া চতুর্থ প্রজন্মের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন দেশের অনেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিযোগাযোগ প্রকৌশল বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র কাজী হামিদ রায়হান জানান, ‘এটা ঠিক যে দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় প্রজন্মে আসতে আমাদের অনেক সময় লেগেছে। কিন্তু চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাপারে তা হবে না বলে আমি আশা করি। কারণ এতে নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন নেই। আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তি সচেতন হয়েছি। নিজেদের প্রয়োজনেই এখন আমাদের ফোরজি পরিবারে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন, নইলে বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হবে।’
ফোরজি বা এলটিই (লং টার্ম এভুলুশন) নেটওয়ার্ক চালু হলে ইন্টারনেটের গতি বেড়ে যাবে বহুগুণ। এর তথ্য আদান-প্রদানের গতি হবে সর্বনিম্ন ২ মেগাবাইট/সেকেন্ড থেকে ৪০ মেগাবাইট/সেকেন্ড। পাশাপাশি ভিওআইপি, মাল্টিপ্লেয়ার গেইমিং, ত্রিমাত্রিক টেলিভিশন, দ্রুতগতির ভিডিও কনফারেন্সিং সুবিধা পাওয়া যাবে।
২০১১ সালে কয়েকটি দেশে এলটিই চালু হয়েছে। ফোরজির সব সুবিধাই এতে রয়েছে। এর সুবিধা পেতে আপনার একটি ফোরজি সমর্থিত উচ্চক্ষমতার স্মার্টফোন এবং এলটিই সিম প্রয়োজন হবে। বর্তমানে এলটিইকেই ফোরজি নেটওয়ার্ক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

গন্তব্য এখন

প্রযুক্তিতে শেষ বলে কিছু নেই। ইতিমধ্যে ১০ গিগাবাইট/সেকেন্ডে তথ্য আদান-প্রদান করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছে পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক ফাইভজি তৈরির কাজ। ২০২০ সাল নাগাদ এটি উন্মুক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর নেটওয়ার্ক সিস্টেমে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা চলছে। এটি নিজ থেকেই সেবার ত্রুটিগুলো সংশোধন করতে পারবে।

টুজি ও থ্রিজি নেটওয়ার্কের পার্থক্য

তথ্য প্রবাহ : টুজি প্রযুক্তিতে ১৮৩ কিলোবাইট/সেকেন্ডে এবং এর উন্নত সংস্করণ ২.৫জিতে ২৩৬ কিলোবাইট/সেকেন্ডে তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। থ্রিজিতে তথ্য প্রবাহের গতি সেকেন্ডে ৪০ মেগাবাইট পর্যন্ত হতে পারে।
ফোনকল : টুজি নেটওয়ার্কে শুধু ভয়েস কল করা যায়, কিন্তু থ্রিজি নেটওয়ার্কে উন্নত ভয়েস কলের পাশাপাশি ভিডিও কল ও ভিডিও কনফারেন্স করা যায়। আধুনিক স্মার্টফোনে থ্রিজি দিয়ে ইন্টারনেট কলও করা যায়।
বিশেষ সুবিধা : মোবাইল টিভি, পথনির্দেশনামূলক জিপিএস শুধু থ্রিজিতেই চালানো সম্ভব। এ ছাড়া স্মার্টফোনের অনেক অ্যাপ্লিকেশন থ্রিজি ছাড়া চলবে না।
নিরাপত্তা : টুজির তুলনায় থ্রিজির তথ্য আদান-প্রদানের নিরাপত্তাব্যবস্থা বেশি শক্তিশালী।
ফ্রিকোয়েন্সি : থ্রিজির প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, এটি টুজির মতো বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যান্ড ব্যবহার করে না। ফলে দুর্গম স্থানে এ সেবা দেওয়া তুলনামূলক কঠিন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s