হৃদরোগের বিকল্প চিকিত্সা

এমন একটি ধারণা প্রায় মিথ হিসেবেই প্রচলিত রয়েছে যে, কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ (সিভিডি) বা হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের শিকার সাধারণত বয়স্কজন এবং মূলত পুরুষেরা। এটি যে সত্য নয়, তা বলাই বাহুল্য। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শিশু এবং নারীরাও হৃদরোগের ঝুঁকির ভেতরে অবস্থান করছে। আর সে কারণেই এবারের বিশ্ব হার্ট দিবসে শিশু ও নারীর ওপর বিশেষ দৃষ্টিদানের কথা বলা হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, চলতি বছর শিশু এবং নারীর হার্ট সুস্থ রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আমরা কথায় কথায় বলে থাকি, শিশুরা জাতির ভবিষ্যত্। সেই ভবিষ্যত্ সচল রাখার জন্য শিশুর সুস্থ হার্টের দিকে আমাদের বিশেষ দৃষ্টিদানের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। একইভাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, তাই হার্ট সুরক্ষার আন্দোলন ও তত্পরতার বাইরে নারীকে রাখা হলে সেটা হবে আত্মঘাতী। সুতরাং এ বছরের বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল ফোকাস বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
গত মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে অসংক্রামক রোগগুলোর ভেতর হৃদরোগকে অন্যতম ভয়াবহ রোগ হিসেবে শনাক্ত করে ২০২৫ সালের ভেতর এসব রোগে মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ১৯৪টি দেশে কর্মসূচি প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। বিশ্বের ১০০টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও সম্প্রতি পালিত হতে চলেছে বিশ্ব হার্ট দিবস। আমরা মনে করি, হার্ট দিবস পালন তখনই সার্থক হবে, যখন দেশের অপেক্ষাকৃত কম বিত্তবান মানুষ হৃদরোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের আওতায় আসতে পারবে। এজন্যে হৃদরোগের বিকল্প চিকিত্সার কথাটিও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে।
সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়শীল দেশে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এ অকাল মৃত্যু ৮০ ভাগ কমানো যায় তামাক সেবন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন ও কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে।
অসংক্রামক রোগ আজ মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিকার ও প্রতিরোধযোগ্য। অসংক্রামক রোগের মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে কার্ডিওলজিভাস্কুলার ডিজিজ (সিভিডি), ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এবং ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী সংকোচনজনিত রোগ। বর্তমানে দেশে অসংক্রামক রোগের শতকরা ১৭.৯ ভাগ উচ্চরক্তচাপ, ৩.৭ ভাগ ক্যান্সার, ৩ ভাগ অ্যাজমা, ৩.৯ ভাগ ডায়াবেটিস ও ২.৪ ভাগ ভুগছে স্ট্রোকে। সংক্রামক রোগকে অধিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে নীরব ঘাতক অসংক্রামক রোগ উপেক্ষিত রয়ে গেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব আজ গোটা জাতির সামনে দৃশ্যমান। অধিকতর কারিগরি নির্ভরশীলতায় আমাদের কম কায়িক পরিশ্রম এবং অধিক ক্যালরিযুক্ত খাবারের দিকে ধাবিত করছে, যার প্রেক্ষিতে বর্তমানে দেশের ৬১ ভাগ রোগই হচ্ছে অসংক্রামক রোগ।
মানসিক উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা, আবেগের আগ্রাসন, কাজের বাড়তি চাপ, জীবনযাপনের চাপ প্রভৃতি অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ক্রমাগত মানবজীবনে আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যাওয়া, কাজেকর্মে তাড়াহুড়া, আধুনিক জীবনযাত্রায় নিত্যদিনের দুর্ভাবনা সরাসরি মানবদেহের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় প্রতিক্রিয়া ঘটায় বা প্রভাব ফেলে। জীবনের দৌড়ে যদি গতি বাড়ানোর কাজ করে মন, তবে স্বাভাবিকভাবেই চাপ বাড়ে মনে। আজকের মানুষ সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে। স্বাভাবিকভাবেই এজন্য তাকে চড়া দামও গুনতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন অসংক্রামক রোগে।
করোনারি আর্টারি ব্লকেজের চিকিত্সা পদ্ধতি এনজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস সার্জারি, কিন্তু বাইপাস সার্জারি অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। কাটাছেঁড়া ছাড়া হৃদরোগের বিকল্প চিকিত্সা ঝুঁকিহীন এবং তাতে সাফল্যের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। কোনো তথ্যই গোপন রাখা সম্ভব নয়। রোগীরা সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে বিবেচনামত চিকিত্সকের শরণাপন্ন হবেন, এটাই স্বাভাবিক।
বিশ্ব হার্ট দিবসে আমরা অবশ্যই হৃদয়ের কথা শুনব। ফিরে তাকাব আমাদের হার্টের সুস্থতার দিকে। হার্ট সুস্থ রাখার জন্য যা যা করা দরকার তা করতে সচেষ্ট হব। কিন্তু এরই মধ্যে যারা হৃদরোগের শিকার হয়েছেন, তাদের সামনে প্রচলিত চিকিত্সার পাশাপাশি বিকল্প চিকিত্সার দিকটিও আমাদের তুলে ধরতে হবে। বিকল্প চিকিত্সার মধ্যে রয়েছে—লাইফ স্টাইলের পরিবর্তন, খাদ্যাভাসের পরিবর্তন, যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম, মেডিটেশন, নিউরোবিক জিম, চিলেশন থেরাপি ও ইসিপি। প্রযুক্তির যুগে তথ্যভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দিতে হবে মানুষের সামনে। হৃদরোগ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সচেতনভাবেই চিকিত্সা গ্রহণ করতে হবে। মধ্যবিত্ত, অসচ্ছল এবং দরিদ্র হৃদরোগীরা যাতে যথার্থ চিকিত্সা পায় সেটাই আজকের প্রধান বিবেচ্য।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s