মাদকাসক্তির কারণ ও প্রতিকার

মাদকাসক্তির কারণ

মাদকাসক্তির বড় কারণ মাদকের সহজলভ্যতা, মাদকের প্রতি তরুণ প্রজন্মের কৌতূহল ও নিছক মজা করার প্রবণতা, মাদকের কুফল সম্পর্কে প্রকৃত ধারণার অভাব, মাদক বিষয়ে ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি—‘আমি ইচ্ছা করলেই মাদক ছাড়তে পারি’, পরিবারের ধরন, বাবা-মায়ের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি, বন্ধুদের চাপ প্রভৃতি। আবার পারিপার্শ্বিক কারণের মধ্যে—মাদক নিয়ে স্মার্ট হওয়ার প্রবণতাও অনেককে ঠেলে দেয় মাদকের জগতে। বন্ধু-বান্ধবের চাপে পড়ে, তাদের সঙ্গ দিতে গিয়ে এবং তাদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকে মাদক গ্রহণে বাধ্য হয় এবং এক পর্যায়ে আসক্ত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ নিজেকে ‘স্মার্ট’ দেখানোর জন্য মাদক নেয়, কেউ নিছক মজা করে একবার-দু’বার নিতে নিতে আসক্ত হয়ে পড়ে। বেকারত্ব, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, ব্যবসায় ক্ষতি, পরীক্ষায় ফেল ইত্যাদি নানা কারণে মাদকের কাছে আশ্রয় নেয় তরুণ-তরুণীরা। সিগারেট দিয়েই শুরু হয় নেশার জগতে প্রথম প্রবেশ, তাই সিগারেটকে আপাত নিরীহ মনে হলেও এটা মাদকের জগতে প্রবেশের মূল দ্বার খুলে দেয়। তাই ধূমপানও হতে পারে মাদকাসক্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। একটা পর্যায়ে শরীর ও মন এমনভাবে মাদকনির্ভর হয়ে পড়ে যে চিকিত্সা ছাগা আর কোনোভাবেই মাদকমুক্ত হওয়া সম্ভব হয় না।

মাদকাসক্তির পরিণতি

দীর্ঘ সময় লেখাপড়া, স্লিম থাকা ও বেশি সময় যৌনক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ছাত্র-ছাত্রী, মডেলকন্যা ও অভিনেত্রী কিংবা সুন্দরী গৃহবধূরা ব্যাপক হারে ইয়াবা আসক্ত হয়ে তাদেরও জীবন বিপন্ন করে তুলছে। এদের গড় আয়ু কমে যায়। ইয়াবা-আসক্ত অধিকাংশ সাধারণত শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, ধনাঢ্য ও বিত্তশালীদের সন্তান কিংবা সদস্য। এই ট্যাবলেট খেলে খাবারের রুচি ও ঘুম কমে যায়, তারা রোগাটে হয়ে যায়। এটা ব্যবহারে প্রাথমিক অবস্থায় যৌন উত্তেজনা কিছুটা বাড়ে। এরপর কমতে থাকে। বছরখানেক ব্যবহারের পর যৌন ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে। চিকিত্সা দিয়েও কোনো লাভ হয় না। কুকুর মারার বিষ সংমিশ্রণে তৈরি হয় এই ইয়াবা। এই ট্যাবলেট খেলে দ্রুত কিডনি, লিভারসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট হয়ে মৃত্যুও হতে পারে ।
মাদকাসক্তির কারণে স্নায়ুতন্ত্র, হৃদযন্ত্র, যকৃত, ফুসফুস, প্রজননতন্ত্র, কিডনি, পাকস্থলীসহ শরীরের প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সঠিক সময়ে চিকিত্সা না করালে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। শিরায় মাদক গ্রহণের কারণে হেপাটাইটিস বি, সি, যৌনবাহিত রোগ ও এইচআইভি সংক্রমণ হতে পারে। দীর্ঘ সময় মাদক গ্রহণ করলে মানসিক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সামাজিক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে নেশা গ্রহণকারী। মাদকের টাকা জোগাতে চুরি, ছিনতাই, দেহব্যবসা ইত্যাদি অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় তারা। চিকিত্সাবিহীন অবস্থায় মাদক গ্রহণ করতে না পারলে ‘উইথড্রয়াল’ সিনড্রোম দেখা যায়, এসময় নানা রকম শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

মাদকাসক্তির লক্ষণ

মাদক গ্রহণকারীর চিন্তা ও আচরণের পরিবর্তন দেখা যায়। তার চিন্তা-ভাবনা হয়ে উঠে বিক্ষিপ্ত, কোনো কিছুতে বেশিক্ষণ মনোসংযোগ করতে পারে না। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, শান্ত সুবোধ ছেলেটি হঠাত্ অবাধ্য হয়ে ওঠে। ঘুমের সমস্যা দেখা যায়, সারারাত জেগে থাকে আর পরদিন দুপুর ২টা-৩টা পর্যন্ত ঘুমায়। খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়ম দেখা যায়। খিদে কমে যায়, বমিভাব দেখা দেয়। বাসায় ঠিকমত খায় না, গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে থাকে, কোনো কোনো দিন বাসায়ই ফিরে না। কারণে-অকারণে মিথ্যা কথা বলে। প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে নানা উছিলায় বাবা-মার কাছে টাকা চায়, টাকা না পেলে রাগারাগি করে। নতুন নতুন বন্ধু-বান্ধবী তৈরি হয়, পুরনোদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হতে থাকে। ঘন ঘন মোবাইলের সিম বদলায়। ঘরের ভেতর মাদক গ্রহণের বিভিন্ন উপকরণ পাওয়া যায়। বাসার জিনিসপত্র/ টাকা-পয়সা/মোবাইল ফোন চুরি হতে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেকে গুটিয়ে রাখে, সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো বর্জন করে। শখের পরিবর্তন ঘটে। যেমন দেখা যায় আগে গান শুনতে বা বই পড়তে ভালোবাসত, কিন্তু এখন আর সেগুলো ভালো লাগে না। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অন্যকে অহেতুক সন্দেহ করা শুরু করে।

মাদকাসক্তির চিকিত্সা

মাদকাসক্তির চিকিত্সার বেশক’টি ধাপ রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে চিকিত্সার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়, মাদকাসক্তির ধরন নির্ণয় করা হয়। শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা করা হয়। এরপর তার ‘উইথড্রয়াল’ সিনড্রোম এবং মাদক প্রত্যাহারজনিত শারীরিক সমস্যার চিকিত্সা করা হয়। শরীর থেকে মাদকের ক্ষতিকর রাসায়নিক অংশগুলো বের করে দেয়া হয়, এ ধাপটিকে বলা হয় ‘ডিটক্সিফিকেশন’। এসময় তার পুষ্টি নিশ্চিত করতে হয় ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদান করা হয়। মাদকমুক্ত করার জন্য বিভিন্ন স্বীকৃত ওষুধ নির্দিষ্ট নিয়মে মনোচিকিত্সকের পরামর্শে সেবন করা লাগতে পারে। পরবর্তী ধাপে তাকে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মাদকমুক্ত থাকার প্রেরণা দেয়া হয়। আবার যাতে মাদক গ্রহণ না করে সে বিষয়ে উপযুক্ত পরামর্শ দেয়া হয়, ফের আসক্ত হওয়ার জন্য যেসব ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ রয়েছে সেগুলো থেকে দূরে থাকার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করা হয়, নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডেও উত্সাহিত করা হয় চিকিত্সাধীন আসক্তজনকে। আসক্ত হওয়ার আগের যোগ্যতা ও গুণাবলী ফিরিয়ে দেয়ার জন্য পুনর্বাসনমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়। মাদকাসক্তি চিকিত্সার ধাপগুলো বেশ দীর্ঘমেয়াদি। তাই ধৈর্য ধরে চিকিত্সা করাতে হয়। অপরিপূর্ণ চিকিত্সার কারণে আবার আসক্তি (রিল্যান্স) হতে পারে। ফ্যামিলি কাউন্সেলিংও চিকিত্সার একটি জরুরি ধাপ।

পরিবারের করণীয়

পারিবারিক পরিবেশ হতে হবে ধূমপানমুক্ত। সন্তানদের কার্যকলাপ এবং সঙ্গীদের ব্যাপারে খবর রাখতে হবে। সন্তানরা যেসব জায়গায় সবসময় যাওয়া-আসা করে সে জায়গাগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে করে তারাই নিজে থেকে তাদের বন্ধু-বান্ধব ও কার্যাবলী সম্পর্কে আলোচনা করে। পরিবারের সব সদস্যই ড্রাগের ক্ষতিকারক বিষয়গুলো সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করবেন। ধৈর্য ধরে সন্তানদের সব কথা শোনার জন্য অভিভাবকরা নিজেদের প্রস্তুত করবেন। সন্তানদের মঙ্গলের জন্য পরিবারের সদস্যরা যথেষ্ট সময় দেবেন। সন্তানদের সামাজিক, মানসিক, লেখাপড়া সংক্রান্ত অর্থনৈতিক চাহিদাগুলো যথাসম্ভব মেটাতে হবে, তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত দিয়ে তাদের প্রত্যাশা বাড়তে দেয়া যাবে না। পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন, প্রায়ই তারা সবাই মিলে আনন্দদায়ক কিছু কার্যকলাপের পরিকল্পনা করবেন এবং পরিবারের সবাই মিলে সুন্দর সময় কাটাবেন। ‘গুড প্যারেন্টিং’ বিষয়ে জ্ঞান নিতে হবে বাবা-মাকে।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা

জনমত সৃষ্টির মাধ্যমে এই ভয়াবহ সমস্যাটি মোকাবিলা করতে হবে। প্রশাসনকে মাদকের উত্পাদন এবং এর অবৈধ ব্যবসা নির্মূল করতে হবে। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে আসক্তির ক্ষতিকারক দিকগুলো সম্পর্কে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মাদকবিরোধী প্রচারণার মাধ্যমে সবাইকে এর কুফল সম্পর্কে জানাতে হবে। মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ও কর্মসূচির ধারাবাহিকতার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। মাদকাসক্তির নির্বিষকরণ প্রক্রিয়ায় শরীরের সঙ্গে মাদকের জৈব-রাসায়নিক নির্ভরশীলতা দূর হয়ে শরীর তার নিজস্ব গতি-প্রকৃতিতে ফিরে এলেও মাদক গ্রহণের মূল প্রভাবক (ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা, আবেগ, অনুভূতি, চিন্তাধারা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসঙ্গতি) দূর করার জন্য নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্সা, কাউন্সেলিং ও থেরাপি প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিশেষে মনে রাখতে হবে, নিকোটিন ও অ্যালকোহলও মাদক হিসেবে স্বীকৃত। এই মাদকও ক্ষতি করে দেহ-মন, ধ্বংস করে পারিবারিক সম্প্রীতি, সন্তানদের ঠেলে দেয় মাদক গ্রহণের ঝুঁকিতে। সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ধূমপান ছাড়তে হবে, ছাড়তে হবে মদ্যপানও।

ডা. মোহিত কামাল

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s