উইন্ডোজ -8 এর নতুন ১০ সুবিধা

স্পর্শসচেতন ইন্টারফেস

উইন্ডোজ ৮-এর সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে এর ইউজার ইন্টারফেসে। আগের ‘মেট্রো ইন্টারফেস’-এ পরিবর্তন এনে নতুন স্পর্শসচেতন (টাচ) ইন্টারফেসে রূপান্তর করা হয়েছে। উইন্ডোজ ৭-এর ‘এয়ারো থিম’-এর বদলে ব্যবহার করা হয়েছে রংবেরঙের টাইলস। এতে এয়ারো থিমের তুলনায় অনেক কম জায়গা (মেমোরি) খরচ হবে। ফলে গতি বেড়ে যাবে। সম্প্রতি টাচস্ক্রিনের জনপ্রিয়তা মাথায় রেখেই এটা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মাইক্রোসফট। তবে চিরাচরিত মাউস ও কিবোর্ড ব্যবহারকারীদের এ নতুন ব্যবস্থায় মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে বলেও মন্তব্য করেছে আইওএসের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। হয়েছেও তাই। এই পরিবর্তনে টাচ ব্যবহারকারীরা যতটা উচ্ছ্বসিত, ততটা হয়নি ডেস্কটপ ব্যবহারকারীরা।

উধাও স্টার্ট বাটন

১৭ বছর আগে উইন্ডোজ ৯৫-এ ‘স্টার্ট মি আপ’ স্লোগান দিয়ে যুগান্তকারী সুবিধা ‘স্টার্ট বাটন’ যুক্ত করেছিল মাইক্রোসফট। জনপ্রিয় এই বৈশিষ্ট্য বাদ দেওয়া হয়েছে উইন্ডোজ ৮-এ। স্টার্ট মেন্যু এখন পরিণত হয়েছে স্টার্ট স্ক্রিনে।

এই একটি স্ক্রিনের মাধ্যমেই পুরো কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। স্ক্রিনের টাইলগুলো কিন্তু মোটেই নিষ্প্রাণ নয়; ওয়েদার, ফেইসবুক, মেইল, পিপলের মতো অ্যাপ্লিকেশনের টাইল দেখাবে এর হালনাগাদ তথ্য। যেকোনো টাইল যুক্ত করা (অ্যাড) বা বাদ দেওয়ার (রিমুভ) পাশাপাশি স্টার্ট স্ক্রিন থেকে পুরো অ্যাপ্লিকেশনটিও সরিয়ে দেওয়া যাবে। রয়েছে সুবিধামতো স্ক্রিনটি পরিবর্তন (কাস্টোমাইজ) করার সুযোগও।সমালোচকদের মতে, একেবারে বাদ না দিয়ে অপশন হিসেবে রাখা যেতে পারত পুরনো ‘স্টার্ট’ মেন্যু। মাইক্রোসফট প্রধান নির্বাহী স্টিভ বলমার জবাবে বলেছেন, ‘পুরাতনকে আমরা আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই না। স্টার্ট স্ক্রিনই আধুনিক স্টার্ট বাটন, এটা গ্রাহকদের বুঝতে হবে।’

উইন্ডোজেও অ্যাপ্লিকেশন

ট্যাবলেট, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ- সব কিছুতেই অ্যাপ্লিকেশনের জয়জয়কার। এ অ্যাপ্লিকেশন বাজার এত দিন ছিল অ্যানড্রয়েড ও আইওএসের দখলে। এবার উইন্ডোজ ৮ দিয়ে মাইক্রোসফটও ঢুকে পড়ল অ্যাপ্লিকেশনের বাজারে। এতে অ্যাপ্লিকেশন নির্মাতাদের জন্যও অনেক নতুন সুযোগ যোগ করা হয়েছে। ফলে অ্যানড্রয়েড আর আইওএস ফেলে উইন্ডোজ অ্যাপ্লিকেশনের দিকে নির্মাতারা ঝুঁকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। টাইলস ইন্টারফেসের সঙ্গে যেভাবে অ্যাপ্লিকেশনগুলোকে কাস্টোমাইজ করা হয়েছে, তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও করেছেন সমালোচকরা। এক্সবক্স, মেসেজিং, পিপল, স্কাইড্রাইভ, ক্যামেরার মতো স্বয়ংক্রিয় (বিল্ট-ইন) অ্যাপ্লিকেশন ডেস্কটপকে স্মার্টফোনের মতোই সহজ ও ব্যবহার উপযোগী করেছে। আর মাইক্রোসফট অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করে হাজার হাজার অ্যাপ ডাউনলোড করার সুযোগ তো আছেই।

সহজ ফাইল সিস্টেম

ফাইল কপি ও টাস্ক ম্যানেজার উইন্ডোজের বহুল ব্যবহৃত দুটি সেবা। প্রথম দর্শনে টাস্ক ম্যানেজারটিকে একেবারে সাধারণ মনে হতে পারে; কিন্তু নিচের ‘মোর ডিটেইলস’ ট্যাবে ক্লিক করলেই আপনি চলে যাবেন সম্পূর্ণ নতুন ও বিস্তৃত কিন্তু সহজ এক টাস্ক ম্যানেজারে। প্রতিটি অ্যাপ্লিকেশন প্রসেসর, র‌্যাম, হার্ডডিস্ক ও ইন্টারনেটের কতটুকু কিভাবে খরচ করছে তার সরল হিসাব দেখতে পাবেন এখানে। ‘প্রসেস’ ট্যাবে গেলে একটি সরল ছকের মাধ্যমে কম্পিউটারের সামগ্রিক চিত্র দেখা যাবে। ব্রাউজার হিসেবে নতুনভাবে ডিজাইন করা উইন্ডোজ এঙ্প্লোরারের ব্যবহারবিধিও আগের চেয়ে সহজ করা হয়েছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন অপশনকে গুছিয়ে ‘রিবন-স্টাইল’ পদ্ধতিতে একত্র করা হয়েছে। নতুন এঙ্প্লোরারের অন্যতম শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য এর নতুন ফাইল কপি-পেস্ট ব্যবস্থা। একাধিক ফাইল কপি করার সময় এবার আর পৃথক উইন্ডো ওপেন হবে না; একটি উইন্ডোতেই সারিবদ্ধভাবে তাদের তালিকা দেখতে পাবেন। দ্রুতগতির কপির পাশাপাশি প্রয়োজনে কপি ‘পজ’ করেও রাখতে পারবেন।

মাল্টিটাস্কিংয়ে নতুন স্বাদ

মাল্টিটাস্কিং ব্যবহারের দিক দিয়ে এগিয়ে থাকবেন টাচ ব্যবহারকারীরাই। সুইপ, পিঞ্চ, স্ন্যাপের মতো আধুনিক টাচ সুবিধা ব্যবহার করে নতুন ধারণার মাল্টিটাস্কিংয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে মাইক্রোসফট। মাল্টিটাস্কিং যে আগে ছিল না তা নয়, কিন্তু একে এতটা সহজ ও ব্যবহারবান্ধব করতে পারেনি আর কোনো অপারেটিং সিস্টেম। স্ক্রিনের বাঁ পাশে ক্লিক করে মুহূর্তে অ্যাপ্লিকেশনগুলো বদলে নিতে পারবেন। কয়েকটি অ্যাপ্লিকেশনকে একই সঙ্গে ব্যবহার করতে চান? তাহলে খুব সহজেই একটি ‘লক’ করে রেখে অন্যটি ব্যবহার করতে পারবেন। বিষয়টি অনেকটা উইন্ডোজ ৭-এর ‘এয়ারো স্ন্যাপ’ ফিচারের মতো মনে হলেও ব্যবহার করলেই বোঝা যাবে এর পার্থক্য। মাউস-কিবোর্ড দিয়েও কাজটি কঠিন হবে না। স্ক্রিনের যেকোনো প্রান্তে কার্সর রেখে মাউস বাটন চেপে পাশের অ্যাপ্লিকেশনে যেতে পারবেন। কিবোর্ড দিয়ে চিরাচরিত পদ্ধতি অল্ট+ট্যাব বাটনও ব্যবহার করতে পারবেন স্বচ্ছন্দে।

দ্রুত বুট

উইন্ডোজ ৮-এর সেটআপ পদ্ধতির সঙ্গে উইন্ডোজ ৭-এর মিল থাকলেও পার্থক্যটা রয়েছে গতিতে। অন্য উইন্ডোজের চেয়ে দ্রুতগতিতে সেটআপ এবং লোড হবে উইন্ডোজ ৮। এ ছাড়া উইন্ডোজ ৭-এর চেয়েও ৫০ শতাংশ দ্রুতগতিতে চালু হবে এই উইন্ডোজ। এটি এযাবৎকালের দ্রুততম বুট টাইম। উইন্ডোজের লগ-অন স্ক্রিন এবার পরিণত হয়েছে লক স্ক্রিনে। অনেকটা অ্যানড্রয়েড ধাঁচের লক-স্ক্রিনে রয়েছে মোবাইলের মতো নোটিফিকেশন। ফলে লক-স্ক্রিনে একনজর তাকালেই আপনি দেখতে পাবেন ল্যাপটপে কতটুকু চার্জ আছে, আবহাওয়া কেমন, নতুন কয়টি মেইল এসেছে। পাসওয়ার্ড পদ্ধতিতেও অ্যানড্রয়েডের প্যাটার্ন লককে কাজে লাগিয়েছে মাইক্রোসফট। যেকোনো ছবির নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় প্রেস করার মাধ্যমে নতুন এই পাসওয়ার্ড সেট করতে পারবেন। আর পুরনো পিন পাসওয়ার্ড পদ্ধতি তো আছেই।

নতুন চমক ‘চার্ম’

উইন্ডোজ ৮-এর আরেক নতুন চমক ‘চার্ম’ বার। আপনি ডেস্কটপে থাকুন কিংবা যেকোনো অ্যাপ্লিকেশনে থাকুন, স্ক্রিনের ডান পাশে কিংবা ওপরে জায়গামতো কার্সর রেখে এই বার চালু করতে পারেন। অতি প্রয়োজনীয় স্টার্ট স্ক্রিন বাটনের পাশাপাশি এতে রয়েছে সার্চ, শেয়ার, ডিভাইসেস ও সেটিংস আইকনও। সার্চ ফিচারটির কথা আলাদাভাবে না বললেই নয়। ইন্টারনেট থেকে শুরু করে কম্পিউটারের ভেতরের কোনো ফাইল বা অ্যাপ কিংবা উইন্ডোজ স্টোরের কোনো অ্যাপ- সব কিছুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পরিচ্ছন্ন একটি সার্চ সিস্টেমে। এত কিছু যুক্ত হওয়ার পরও এর গতি না কমে বরং বেড়েছে! স্টার্ট স্ক্রিন বা ডেস্কটপ থেকেও যেকোনো সময় চালু করা যাবে সার্চ অ্যাপ্লিকেশনটি।

আছে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও

কম্পিউটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগে অনেক রকম সফটওয়্যার ব্যবহার করা হতো। উইন্ডোজে ৮-এ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যুক্ত রয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা। আপনার অজান্তে যাতে কোনো ছোটখাটো ম্যালওয়্যার উইন্ডোজের ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য যুক্ত করা হয়েছে ইউইএফআই সিকিউর বুট। আগের মাইক্রোসফট সিকিউরিটি এসেনশিয়ালসকে বর্ধিত করে তৈরি করা হয়েছে উইন্ডোজ ডিফেন্ডার। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে ইন্টারনেট এঙ্প্লোরার ১০-এ। রয়েছে বিশেষ সুবিধা ‘ফ্যামিলি সেফটি’। ফলে ইন্টারনেট কিংবা যেকোনো অ্যাপ্লিকেশন প্রয়োজনমতো বন্ধ রাখা যাবে। আপনার শিশু কম্পিউটারে কী করছে তাও অনুসরণ করা যাবে। উইন্ডোজের ৮-এর এন্টারপ্রাইজ সংস্করণে আরো কিছু নিরাপত্তা সুবিধা যোগ করা হয়েছে। ‘উইন্ডোজ টু গো’ নামের এ সুবিধার মাধ্যমে ইউএসবি ডিভাইস থেকেও সরাসরি উইন্ডোজ চালানো যাবে।

যুক্ত থাকবে সর্বক্ষণ

সব মাধ্যমে নিজেদের ব্যবহারকারী বাড়ানোর চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখেনি মাইক্রোসফট। তাই ইতিহাসে প্রথমবারের কোনো অপারেটিং সিস্টেম একই সঙ্গে মুক্তি পেল ট্যাবলেট ও ডেস্কটপের জন্য, ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণে। এআরএম প্রসেসরের জন্য রয়েছে উইন্ডোজ আরটি সংস্করণ, যা ট্যাবলেটে ডেস্কটপের সর্বোচ্চ ফিচার ব্যবহার করার সুবিধা দেবে। ডেস্কটপ কম্পিউটারের জন্য রয়েছে বেসিক, প্রো ও এন্টারপ্রাইজ সংস্করণ। আরো রয়েছে উইন্ডোজ ফোন ৮, যাকে অনেকটা স্মার্টফোনের জন্য উইন্ডোজ ৮-এর ক্ষুদ্র সংস্করণ বলা যায়। এখানেই শেষ নয়; আপনার ডিভাইসে উইন্ডোজ ৮-এর যে সংস্করণই ব্যবহার করুন না কেন, অনবরত সিনক্রোনাইজিংয়ের মাধ্যমে সব সময় অন্যান্য উইন্ডোজ ডিভাইসের সঙ্গেও যুক্ত থাকতে পারবেন। ফাইল শেয়ারিং, তথ্য আদান-প্রদানও হবে দ্রুততর। উইন্ডোজ ৮-এর পুরো নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাই গড়ে তোলা হয়েছে ক্লাউড কম্পিউটিং বা ইন্টারনেটভিত্তিক কম্পিউটিংয়ের কথা মাথায় রেখে। স্কাই ড্রাইভের মাধ্যমে মুহূর্তে প্রয়োজনীয় ফাইল ক্লাউড সার্ভারে সেভ করে রাখতে পারবেন। তাই অ্যাপ্লিকেশন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আপডেট হবে। তাই তো মাইক্রোসফটের সাফ জবাব, ‘ইন্টারনেট যাঁরা ব্যবহার করেন না, তাঁদের জন্য এই উইন্ডোজ নয়।’

অন্যান্য

আরো কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা যুক্ত হয়েছে উইন্ডোজ ৮-এ। আছে টু-টাচ কিবোর্ড, ডিফল্ট ইউএসবি ৩.০ সাপোর্ট, মাল্টিপল মনিটর সুবিধা ইত্যাদি। পুরনো কন্ট্রোল প্যানেল ফিচারটিকে আরো প্রশস্ত করে তৈরি করা হয়েছে পিসি সেটিংস। বিনা মূল্যে যুক্ত করা হয়েছে মাইক্রোসফট অফিস ২০১৩। সুখবর হচ্ছে, এত সব দারুণ সুবিধার উইন্ডোজটি ব্যবহার করার জন্য আপনার কম্পিউটারকে কিন্তু দামি হার্ডওয়্যার কিনে আপগ্রেড করতে হবে না। উইন্ডোজ ৭ চলে এমন যেকোনো কম্পিউটারেই চলবে উইন্ডোজ ৮। আর চলবে আগের চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s