খনার বচন

বচন, প্রবাদ, ছড়া, জারী ইত্যাদি বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য। এরমধ্যে প্রায় সহস্র বছর ধরে খনার বচন গ্রামবাংলার মানুষের কথায় কথায় চলে এসেছে আজ পর্যমত্ম। তবে খনার বচনের প্রচলন কমে আসছে আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকায়নের ভিড়ে। খনার বচন রচয়িত হয় চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে। বিখ্যাত জ্যোতিষী খনা হাজারো বচন রচনা করে গেছেন বাঙালিদের জীবন সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে। খনা মিহিরের স্ত্রী। খনার শ্বশুর বরাহ নামকরা জ্যোতিষী ছিলেন। খনার জন্ম হয় বাংলাদেশে এবং জীবনকাল অতিবাহিত করেন বাংলা ভূখন্ডে। মিহিরের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হওয়ায় তিনি পশ্চিমবঙ্গের চবিবশ পরগনা জেলায় বসবাস করেন। খনার রচিত বচনে বাঙালির জীবন-যাপন রীতি, কৃষি, বৃক্ষরোপণ, পশুপালনসহ যেসব কাজে ব্যসত্ম থাকত সেসব কাজের উপদেশমূলক বাক্য রয়েছে। এসব বাক্য মেনে চললে উপকার পাওয়া যায়।

প্রতিটি বচনেই রয়েছে অর্থবহ গভীর তাৎপর্য। কিছু উলেস্নখযোগ্য খনার বচন এখানে উলেস্নখ করা হলো।

দ যদি বর্ষে মাঘের শেষ/ধন্য রাজার পূণ্য দেশ।

দ আষাঢ় মাসে বান্ধে আইল, তবে খায় বহু শাইল।

দ শোন শোন চাষী ভাই, সার না দিলে ফলন নাই।

দ সবলা গরম্ন সুজন পুত, রাখতে পারে খেতের জুত।

দ খনা বলে শুনে যাও, নারিকেল মুলে চিটা দাও।

দ বারো মাসে বারো ফল, না খেলে যায় রসাতল।

দ জ্যৈষ্ঠে খরা, আষাঢ়ে ভরা, শস্যে ভার সহে না ধরা।

দ গাছ-গাছালি ঘন রোবে না, গাছ হবে তাতে ফল হবে না।

দ আষাঢ়ে পনের শ্রাবণে পুরো, ধান লাগাও যত পারো।

দ আগে বাঁধবে আইল, তবে রম্নবে শাইল।

দ গরু-জরু ক্ষেত-পুতা, চাষীর বেটার মূল সুতা।

দ সবল গরম্ন গভীর চাষ, তাতে পুরে চাষার আশ।

দ খরা ভুয়ে ঢালবি জল, সারাবছর পাবি ফল।

দ ষোল চাষে মূলা, তার অর্ধেক তুলা, তার অর্ধেক ধান, তার অর্ধেক পান। রোদে ধান, ছায়ায় পান।

দ ফল খেয়ে জল খায়, যম বলে আয় আয়।

দ হালে নড়বড় দুধে পানি, লক্ষ্মী বলে ছাড়লাম আমি।

দ চাষী আর চষা মাটি, এদুই মিলে দেশ খাঁটি।

দ ডাঙ্গা নিড়ান বান্ধন আলি, তাতে দিও নানা শালি।

দ কাঁচা রোপা শুকায়, ভুঁইয়ে ধান ভুঁইয়ে লুটায়।

দ বারো পুত, তের নাতি, তবে কর কুশার ক্ষেতি।

দ তাল বাড়ে ঝোপে, খেজুর বাড়ে কোপে।

দ কলা রুয়ে না কাটপাত, তাতে হবে কাপড় ভাত।

দ তিন শাওনে পান, এক আশ্বিনে ধান।

দ পটল বুনলে ফাগুনে ফলন বাড়ে দ্বিগুণে।

দ গাজর, গন্ধি, সুরী তিন বোধে দূরী।

দ দাতার নারিকেল, বখিলের বাঁশ, কমে না বাড়ে বারো মাস।

দ হলে ফুল কাট শনা, পাট পাকিলে লাভ দ্বিগুণা।

দ খনা বলে শোনভাই, তুলায় তুলা অধিক পাই।

দ ঘন সরিষা পাতলা রাই, নেংগে নেংগে কার্পাস পাই। ফাগুনে আগুন, চৈতে মাটি, বাঁশ বলে শীঘ্র উঠি।

দ লাঙ্গলে না খুঁড়লে মাটি, মই না দিলে পরিপাটি, ফসল হয় না কান্নাকাটি।

দ ভাদ্রের চারি, আশ্বিনের চারি কলাই করে যত পারি।

দ আখ, আদা, পুঁই, এ তিন চৈতে রুই।

দ গাই দিয়ে বয় হাল, দুঃখ তার চিরকাল।

দ গাছে গাছে আগুন জ্বলে-বৃষ্টি হবে খনায় বলে।

এসব খনার বচন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এসব উপদেশমূলক গভীর জ্ঞানগর্ভ বাক্য আমাদের ঐতিহ্য। এগুলো ধরে রাখতে হবে আগামী প্রজন্মের জন্য।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s