নূরজাহান জাহাঙ্গীরের প্রেম

নূরজাহানের তখনকার নাম ছিল মেহেরুন নিসা। ১৬১১ সালের ২৬ মে ছিল বিয়ের দ্বিতীয় দিন। সম্রাট জাহাঙ্গীর বলতে গেলে সারা রাত ঘুমাননি। নূরজাহানের জীবনকর্ম তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছিল। ফলে কোনো ক্লান্তিই তাকে স্পর্শ করেনি। বাসরশয্যা থেকে বের হয়ে আসেন সূর্য ওঠার আগেই। এটিই ছিল হেরেমের রীতি। নিজের খাস কামরায় ঢুকতে ঢুকতে তিনি ভাবলেন_ এত বড় কামনাহীন সংযমী পুরুষ তিনি হলেন কী করে! এই প্রথম এক রমণী সারা রাত তার সামনে বসে ছিল। কিন্তু তার চেতনা কেবল অনুসরণ করছিল রমণীর বক্তব্যকে। তার শরীর বা মন একবারও যৌনাতুর হয়ে রমণীর পানে ধাবিত হয়নি। নারীর যে সব অঙ্গের প্রতি পুরুষের দুর্বার আকর্ষণ থাকে সেগুলোর দিকে একবারের জন্যও ভ্রূক্ষেপ ছিল না সম্রাটের_ এমন কেন হলো? ভাবতে ভাবতে সম্রাট খাস কামরার সঙ্গে লাগোয়া হাম্মামখানায় ঢুকলেন। মোগল রীতি অনুযায়ী হাম্মামে শুধু গোসল করার বিধান ছিল। অন্যান্য প্রাকৃতিক কর্মের জন্য ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা ছিল।

বাসর-পরবর্তী হাম্মামে গোসলের জন্য সম্রাট একাই উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্য দিনে সম্রাটের গোসল পর্বটিও একটি আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সম্রাট প্রথমে হাম্মামের নির্ধারিত পানির চৌবাচ্চাটিতে নামেন, যা আগে থেকেই তার জন্য নানারকম সুগন্ধি দিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়। হাম্মামের পানির তাপমাত্রাও নিয়ন্ত্র্রণ করা হতো তার রুচিমাফিক। সম্রাট জাহাঙ্গীর সাধারণত হালকা উষ্ণ পানিতে গোসল সারতেন। সম্রাটের প্রিয় কয়েকজন উজির-সেনাপতি উপস্থিত থাকতেন গোসলের সময়। সম্রাট ইচ্ছা পোষণ করলে তাদের মধ্যে দুই-একজন অনুমতি পেত সম্রাটের সঙ্গে চৌবাচ্চাটিতে নেমে একসঙ্গে গোসল সম্পন্ন করার জন্য। আমন্ত্রিত রাজপুরুষের জন্য এ ছিল এক বিরল সম্মান। সম্রাটের ইচ্ছায় সেদিন কেউ উপস্থিত ছিল না। একান্ত খোঁজা প্রহরী, কয়েকজন বিশ্বস্ত গোলাম ও বাদীকে নিয়ে খুব তাড়াহুড়া করে গোসল সারলেন।

প্রথা অনুযায়ী সকালের নাস্তা পর্বটিও সম্রাট তার রাজ দরবারের পাত্র-মিত্রদের সঙ্গে করতেন। এখানে বসেই দিনের কর্মপরিধি নির্ধারিত হতো। কখনো কখনো রাষ্ট্রদূতরা সম্রাটের সঙ্গে প্রাতরাশ সভায় উপস্থিত থাকতেন। প্রায় ১০০ বছরের মোগল ঐতিহ্য ভেঙে হঠাৎ করেই সম্রাট ইচ্ছা পোষণ করলেন সম্রাজ্ঞী মেহেরুন নিসাকে প্রাতরাশ সভায় উপস্থিত করানোর জন্য। তিনি এলেন। অপরূপ রূপের ঝলকানিতে সমগ্র হলঘরটি আলোকিত করার জন্য। সম্রাট জীবনে দিনের আলোতে তার প্রিয়তমা পত্নীকে দেখেননি কখনো, সেই কবে একবার দেখা হয়েছিল মিনাবাজারে যখন আলীকুলি খাঁর সঙ্গে তার বিয়ে পর্যন্ত হয়নি। এরপর গত চার বছরে বাসরঘরের স্মৃতিছাড়া কেবল একবার দেখেছিলেন তাও আবার দূর থেকে। তিনি জানতেন তার নবপরিণীতা স্ত্রী অসাধারণ মেধাবী, দুর্দান্ত সাহসী, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তাবৎ দুনিয়ার রাজনীতির খবর যেমনি জানেন, তেমনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের স্থাপত্যকলা, পোশাকের ডিজাইন, বাগান স্থাপন এবং সর্বোপরি যুদ্ধবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ। সেদিনের প্রাতরাশে সম্রাজ্ঞীর আমন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু রাজনৈতিক।

সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলা প্রদেশ প্রবলভাবে অশান্ত হয়ে ওঠে। বিশেষত বর্তমান বাংলাদেশে তখন বারভঁূইয়া বা বারোজন প্রভাবশালী জমিদারের প্রচণ্ড দাপট। বাংলা বিখ্যাত বারভূঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁর মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য ছেলে মুসা খানের নেতৃত্বে জমিদাররা মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ওই আন্দোলনের অগি্নঝরা দিনগুলোতে মেহেরুন নিসা ছিলেন বর্ধমানে, সেখানকার শাসক আলীকুলি খাঁর স্ত্রী হিসেবে। সুবে বাংলার রাজধানী তখন রাজমহলে। সম্রাট তার অতি প্রিয়ভাজন কুতুবউদ্দিন খান কোকাকে ১৬০৬ সালে সুবে বাংলার গভর্নর করে পাঠান। কোকা ছিলেন সম্রাটের আবাল্য প্রিয় বন্ধু, বিশ্বস্ত সহচর এবং যুদ্ধের ময়দানে পরীক্ষিত সেনাপতি। সম্রাট যখন তার পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন তার জীবনের স্বপ্নের নায়িকা আনারকলির মৃত্যুর পর তখন হাতেগোনা অল্প কয়েকজন সেনাপতি তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। কোকা ছিলেন তাদের অন্যতম। এ ছাড়া কোকার মা ছিলেন সম্রাটের দুধ মা এবং পরম শ্রদ্ধার পাত্র। এ সম্পর্কে সম্রাট তার আত্দজীবনী তুযুকে জাহাঙ্গীরীতে লেখেন_ কোকার মা ছিলেন আমার দুধ মা। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারতাম যে আমার দুধ মা আমাকে আমার নিজের মায়ের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। তার মৃত্যুতে আমি যেন বজ্রাহতের মতো আঘাতপ্রাপ্ত হই। তার লাশ অন্যদের সঙ্গে কাঁধে বহন করে কবরস্থানে নিয়ে যাই। পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণে দুধ মায়ের পা দুটি আমার কাঁধে নিয়ে শবযাত্রা শুরু করি। তার লাশ কবর দেওয়ার পর মনে হলো আমি বোধহয় বেঁচে নেই, কিংবা আমার আর বেঁচে থাকার দরকার নেই। প্রচণ্ড বেদনায় আমি কয়েক দিন খাইনি। এ সময় আমি আমার দৈনন্দিন পোশাকও পরিবর্তন করিনি।

বাংলার পরিবেশ অশান্ত হয়ে উঠলে সম্রাট তার বাল্যবন্ধু ও বিশ্বস্ত সহচর কুতুবউদ্দিন কোকাকে গভর্নর নিয়োগ করেন। কোকা সবকিছু গুছিয়ে ওঠার আগেই মেহেরুন নিসার স্বামী বর্ধর্মানের শাসক আলীকুলি খাঁ ওরফে শের আফগান বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। সম্রাটের নির্দেশে কোকা সেই বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে নিজেই শের আফগানের হাতে নির্মমভাবে খুন হন। আগ্রার রাজপ্রাসাদে যখন কোকার মৃত্যু সংবাদ পেঁৗছল, তখন প্রায় মধ্যরাত। কোকার সঙ্গে সম্রাটের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে প্রহরীরা অনেকক্ষণ ধরে সিদ্ধান্ত নিতে পারল না, এত রাতে দুঃসংবাদ বহনকারী দূতকে প্রাসাদে ঢুকতে দেবে কিনা এবং তারা দিলও না। কিন্তু দূত করে বসল এক দুঃসাহসী কর্ম। সম্রাট জাহাঙ্গীর ক্ষমতায় আরোহণ করার পর তার খাসকামরা, দরবার এমনকি জেনানা মহলের নাচঘরটিতে বসিয়েছিলেন একটি করে ঘণ্টা। উদ্দেশ্য জনসেবা। সম্রাট মনে করলেন, তার দরবারের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা রাজপ্রহরীদের কড়াকড়ির কারণে কোনো নির্যাতিত মজলুম ব্যক্তি সর্বমহলের কাছ থেকে হতাশ হয়ে সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইতে পারেন। ন্যায়বিচারের স্বার্থে যিনি সম্রাটের কাছে আসতে চাচ্ছেন কিন্তু পারছেন না। এ ধরনের লোকদের জন্য তিনি তার অবস্থানের স্থানগুলোতে কয়েকটি ঘণ্টা স্থাপন করলেন। এসব ঘণ্টার সঙ্গে রশি বেঁধে রশিটির অপর প্রান্ত দুর্গের বাইরে স্থাপন করলেন। এর পর নকীবের মাধ্যমে রাজ্যময় ঘোষণা করে দিলেন যে কোনো ব্যক্তি রাত-দিনের যে কোনো সময় রশিটি টান দিয়ে সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন। ঘণ্টাগুলো স্থাপিত হওয়ার পর কয়েকবার এতে টান পড়েছে। কিন্তু সবই দিনের বেলায়। কার্যকালীন সময়ে। এই প্রথম মধ্যরাতে কোকার মৃত্যু সংবাদ বহনকারী দূত রাজপ্রহরীদের বাধায় হতাশ হয়ে দুর্গের বাইরে চলে এলেন এবং রশিটিতে টান দিলেন।

মধ্যরাতে সম্রাটের ঘণ্টায় টান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র ফতেপুর সিক্রি নগরী জেগে উঠল। মূল রাজপ্রাসাদ এবং এর আশপাশের এলাকা পাহারা দিত প্রায় এক লাখ সৈন্য। তিনটি সিফটে ৩০ হাজার করে সেনা অস্ত্রসহ টহল দিত। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ছিল অশ্বারোহী, এক হাজার গোলন্দাজ, পাঁচ হাজার তীরন্দাজ এবং বাকি সব পদাতিক। প্রায় সবাই প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি বন্দুক বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করত। সম্রাটের ঘণ্টায় টান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল ঘণ্টাটি বিকট শব্দে বেজে উঠল। গোলন্দাজ বাহিনী দুর্গের মূল ঘণ্টার শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরপর সাতবার কামান দাগল। অর্থ আমরাও সতর্কভাবে জেগে আছি। ৫০০ সৈন্যের একটি চৌকস অশ্বারোহীর দল বের হয়ে এলো দুর্গের বাইরে। কোকার মৃত্যুর সংবাদ বহনকারী দূতকে নিয়ে যাওয়া হলো সম্রাটের সামনে।

সম্রাট বিস্তারিতভাবে সব ঘটনা শুনলেন ও যারপরনাই মর্মাহত হলেন। তিনি দূতকে ধন্যবাদ দিলেন এবং এত রাতে সাহস করে ঘণ্টা বাজানোর জন্য প্রশংসা করলেন। আর ঘুমালেন না সে রাতে। কামরা থেকে বের হয়ে দেওয়ানে আমের বেদিতে উঠলেন। অনুসরণকারী দেহরক্ষীদের ইঙ্গিতে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বললেন। আকাশে তখন একাদশীর চাঁদ। বেশ ঝিরঝির করে বাতাস বইছে। কতই না মধুর পরিবেশ কিন্তু সম্রাটের অন্তরে তখন বইছে আগুনের ঝড়। দিলি্লর খুবই কাছে রাজপুতনার বীর সংগ্রাম সিংহের অবিরত বাড়াবাড়ি। দাক্ষিণাত্যে ক্রমাগত যুদ্ধ, কান্দাহারের যুদ্ধে পারস্য বাহিনীর কাছে পরাজয়, সুবে বাংলায় অরাজকতা_ সবকিছু মিলিয়ে তিনি এখন দিশাহারা। যেসব বিশ্বস্ত সেনাপতির প্রতি তিনি নির্ভর করেন কোকা তাদের অন্যতম। খাজা মঈনউদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর দৌহিত্র প্রখ্যাত বুজুর্গ আলেম হজরত সেলিম চিশতি (রহ.)-এর নাম কে না জানে! সম্রাটের বাবা মহামতি আকবর পায়ে হেঁটে আগ্রার ফতেপুর সিক্রি গিয়েছিলেন হজরত সেলিম চিশতি (রহ.)-এর কাছে। উদ্দেশ্য মহান আল্লাহপাকের কাছে সন্তান কামনা। খান্দানে মোগলের সবাই বিশ্বাস করেন যে হজরত সেলিম চিশতি (রহ.)-এর দোয়ার বরকতেই সম্রাট জাহাঙ্গীর পৃথিবীতে এসেছিলেন। তার মহান বাবা এ জন্য তার নাম রেখেছিলেন সেলিম। দরাজ গলায় তিনি সম্রাটকে সব সময় সেলিম বলেই ডাকতেন। এ ঘটনার পর আকবর হজরত সেলিম চিশতি (রহ.)কে অনুরোধ করেন রাজধানীর ফতেপুর সিক্রিতে এসে বসবাস করার জন্য। আকবরের সেই অনুরোধ রাখেন মহান এ সাধক। আকবরও সাধকের সম্মানে নির্মাণ করেন সুবিশাল প্রাসাদ, বুলন্দ দরজা নামের ইতিহাস বিখ্যাত তোরণ এবং একটি সুন্দর পরিপাটি মসজিদ।

কথিত আছে, মহামতি আকবর হজরত সেলিম চিশতি (রহ.)-কে এতই শ্রদ্ধা করতেন যে, তিনি চাইতেন সর্বাবস্থায় তার স্থান যেন আকবরের মাথার ওপর হয়। এ জন্য তিনি তার নিজ প্রাসাদের কাছাকাছি প্রায় দেড়শ ফুট উঁচু বিরাট এক পাহাড়ের মতো স্থান নির্মাণ করেছিলেন। সেই পাহাড়ের ওপর নির্মিত হয়েছিল হজরত সেলিম চিশতির মাজার, বুলন্দ দরজা এবং মসজিদ। আকবর ছোট্ট সেলিমকে নিয়ে রোজ মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে আসতেন। কোকা ছিলেন হজরত সেলিম চিশতির দৌহিত্র।

আগেই বলেছি, কোকার মা ছিলেন সম্রাটের দুধ মা। ফলে নিবিড়ভাবে একই মায়ের পরিচর্যায় বেড়ে উঠেছেন। শারীরিকভাবে কোকা ছিলেন যথেষ্ট বলশালী, মেধাবী এবং প্রচণ্ড চঞ্চল প্রকৃতির মানুষ। শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোতে তিনি ছিলেন আরও দুরন্ত এবং বেপরোয়া। জীবনের অনেক লুকানো অভিজ্ঞতা সম্রাট কোকার মাধ্যমেই পেয়েছিলেন। দেওয়ানে আমের বেদিতে বসে মধ্যরাতের ঝিরঝিরে বাতাসের স্পর্শে সম্রাটের কেবলই মনে হচ্ছিল সে সব দিনের কথা। সম্রাটের মনে পড়ছে অনেক ঘটনা। কোকাই প্রথম তাকে দেখিয়েছিল মোরগ ও মুরগির মিলন দৃশ্য। এর পর ঘোড়া, গাধাসহ অন্য প্রাণীদের। তাকে বুঝিয়েছিল যে, নারী-পুরুষরাও এমন করে। সম্রাট কেবল শুনেছিলেন, কিন্তু বুঝেননি। তার মাথায় ঢুকছিল না মানুষ কেন মোরগ ও মুরগির মতো ওমন করবে। এ কাজ করে লাভই বা কী হবে! কোকা উত্তর দিয়েছিল, এতে অনেক মজা আছে!

পৌরুষের উদ্দামতার প্রথম স্বাদ আস্বাদন করেছিলেন এই কোকার মাধ্যমে। এক রাতে সম্রাট শুয়েছিলেন কোকার সঙ্গে। মজার মজার কথা বলছিলেন উভয়ে। বয়স তখন সবে ১২ কি ১৩ হবে। জীবন ও যৌবন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। কিন্তু অদম্য আগ্রহ এগুলো জানার জন্য।

পরিণত বয়সে কোকা ছিলেন সম্রাটের সর্বক্ষণের সঙ্গী। রাজপুতদের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে সম্রাটকে লক্ষ্য করে ছোড়া এক লক্ষ্যভেদী তীরকে নিজ পিঠ পেতে রুখে দিয়েছিলেন কোকা। সে যাত্রা এক মাস শয্যাশায়ী ছিলেন তীরের আঘাতের কারণে। সেই কোকার মৃত্যু সম্রাট জাহাঙ্গীর কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। সুবে বাংলার ওপর তার জিদ চেপে বসল। যে কোনো মূল্যে তিনি বাংলার সংহতি ফিরিয়ে আনার জন্য প্রতিজ্ঞা করলেন। এভাবেই রাত গড়িয়ে ভোর হলো। বিশ্বস্ত ও যোগ্য অন্য কোনো সেনাপতিকে সেখানে সুবেদার হিসেবে নিয়োগের কথা ভাবলেন। তার প্রথমেই মনে এলো আলাউদ্দিন চিশতির কথা। সেও ছিল সম্রাটের আরেক বিশ্বস্ত বাল্যবন্ধু। আলাউদ্দিন চিশতিও সম্পর্কে হজরত সেলিম চিশতি (রহ.)-এর দৌহিত্র ছিলেন। সম্রাট যখন তার কথা ভাবছিলেন তখন তিনি বিহারে মোগল সুবেদার হিসেবে কাজ করছিলেন।

১৬০৮ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর আলাউদ্দিন চিশতিকে ইসলাম খান উপাধি দান করে সুবে বাংলার সুবেদার করে পাঠান। ইসলাম খাঁ বিহার হয়ে রাজধানী এবং সেখান থেকে রাজমহল পেঁৗছেন ১৬০৯ সালে। পুরো দুই বছর তিনি পথে-প্রান্তরে থেকে অবিরতভাবে বাংলার বারভূঁইয়াদের সঙ্গে একের পর এক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। নতুবা যুদ্ধকৌশল এবং সামরিক ব্যয়ের বিষয়ে আলোচনার জন্য ইসলাম খানের বিশেষ দূত ইয়ার কুলি খান আগ্রার ফতেপুর সিক্রিতে উপস্থিত আছেন গত তিন-চার দিন ধরে। নূরজাহানের সঙ্গে সম্রাটের বিয়ের আয়োজনের ব্যস্ততার জন্য এতদিন দেখা হয়নি। আজ প্রাতরাশ সভায় সম্রাট ইয়ার কুলি খানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সুবে বাংলার বিষয়গুলো আলোচনার জন্য। এটি ছিল বাসর রাতের ঠিক পরের সকাল এবং এই প্রাতরাশ সভাতেই সম্রাট অতীতের সব প্রথাকে ভেঙে নববিবাহিত, সম্রাজ্ঞী মেহেরুন নিসাকে প্রকাশ্যে অন্য রাজ আমাত্যদের সঙ্গে অংশগ্রহণের জন্য ডেকে এনেছেন।

সম্রাজ্ঞী মেহেরুন নিসা আনত নয়নে সভাস্থলে প্রবেশ করে সম্রাটকে কুর্নিশ করলেন। সভাসদরা বুঝতে পারলেন না ওই মুহূর্তে তাদের করণীয় সম্পর্কে। সম্রাট উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, আহলান ওয়া সাহলান ইয়া নুরে মহল! সঙ্গে সঙ্গে সভাসদরা দাঁড়িয়ে গেলেন এবং সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীকে কুর্নিশ করলেন। সমস্বরে বলে উঠলেন আহলান ওয়া সাহলান (স্বাগত)। সবাই যে যার আসনে বসলেন। সম্রাটের ঠিক পাশের দস্তরখানে সম্রাজ্ঞীকে বসতে দেওয়া হলো। নকীব ঘোষণা করলেন, মহামান্য বাদশাহ নূরউদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর তার নববিবাহিত বেগমকে নূর মহল বা প্রাসাদের আলোকবর্তিকা উপাধিতে ভূষিত করেছেন। এখন থেকে উনার নাম হবে নূর মহল। উপস্থিত সভাসদরা সমস্বরে বলে উঠলেন_ মারহাবা! ইয়া মারহাবা।

প্রাথমিক আলোচনা শুরু হলো। বাংলা থেকে আগত ইসলাম খানের বিশেষ দূত ইয়ার কুলি খান আনুষ্ঠানিকভাবে সুবে বাংলার গভর্নরের সরকারি চিঠি হস্তান্তর করলেন, নকীব তা পড়ে শোনালেন। সম্রাট টুকটাক প্রশ্ন করে সেখানকার সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করলেন। দূতের জবানবন্দি, সুবেদার, চিঠি এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্য প্রায় একই। বারভূঁইয়াদের নতুন করে সংগঠিত হওয়ার খবর এবং বিশেষ করে তাদের নেতা মুসা খানের শক্তি বৃদ্ধির খবরে সম্রাটকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। দরবার হল নিশ্চুপ। দূত বসে আছেন সম্রাটের নির্দেশের অপেক্ষায়। আর সম্রাট মাথা নিচু করে ভাবছিলেন করণীয় সম্পর্কে। এমন সময় সম্রাজ্ঞী অনুমতি চাইলেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছু বলার জন্য। উপস্থিত সভাসদ আশ্চর্য হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকলেন। এমন ঘটনা কোনোদিন তারা দেখা তো দূরের কথা, শুনেনওনি। যুদ্ধক্ষেত্রের বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে আর সেখানে কিনা মতামত দেবেন জেনানা মহলের একজন নারী। দু-একজন মুচকি হেসে চোখের ইশারায় বোঝাতে চাইলেন, আচ্ছা শোনা যাক না কী বলেন আমাদের সম্রাজ্ঞী।

সম্রাজ্ঞী বলেন, সাহেবে আলম! বাংলা সম্পর্কে আমার বেশ পড়াশোনা রয়েছে। এর ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া, লোকজনের মানসিকতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজস্ব আদায়ের ধরন সম্পর্কে আমার কিছুটা হলেও অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখন যেভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করা হচ্ছে তাতে বিজয়ের সম্ভাবনা যেমন ক্ষীণ, তেমনি বিজয় লাভ করলেও তা ধরে রাখা যাবে না। মহান সম্রাট আকবরের আমল থেকেই বাংলা নিয়ে আমরা যুদ্ধ করে আসছি। ইতিহাস বলে ওই অঞ্চলের মানুষ খুবই অস্থির আর আবেগপ্রবণ। বছরের প্রায় তিন মাস বেশির ভাগ অঞ্চল পানির নিচে থাকে। বাকি চার মাস সময় লাগে পানি নেমে যেতে। কাজেই প্রাকৃতিক কারণে কোনো আক্রমণকারী বাহিনীর এ সাতটি মাস সেখানে করার কিছুই থাকে না। আমরা যুদ্ধ করতে পারি কেবল বছরের মধ্যে মাত্র পাঁচ মাস। এই পাঁচ মাসে যতটুকু অর্জন হয় পরবর্তী সাত মাসে তার চেয়ে বড় বেশি ক্ষতি হয়ে যায়। দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সমুদ্র, পাহাড় এবং গহিন অরণ্যবেষ্টিত। দক্ষিণের বিরাট অংশ হাজার হাজার ছোট-বড় নদ-নদী দ্বারা বেষ্টিত। পশ্চিম দিকের অবস্থাও অনুকূলে নয়। কেবল মধ্যাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলে রয়েছে সমতল উঁচু ভূমি।

এ অবস্থায় সুবে বাংলার রাজধানী যদি রাজমহলে থাকে তাহলে কোনো অবস্থায় পূর্বাঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বরং যদি রাজমহল থেকে দেশের মধ্যাঞ্চলে রাজধানী স্থানান্তর করা হয় সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ এমনিতেই দমে যাবে। আমার মনে হয় যুদ্ধ করতে হবে না। কারণ বাঙালিদের দেখেছি প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ। তারা যখন এককভাবে দলবদ্ধ অবস্থায় থাকে তখন প্রচণ্ড অহংকার করে। সম্মিলিত বাঙালি একসঙ্গে থেকে অহংকার ছাড়া অন্য ভালো কিছু করেছে, বিশেষত যুদ্ধক্ষেত্রে তার নজির আমার জানা নেই। অন্যদিকে তাদের প্রতিপক্ষকে তারা সব সময়ই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। কিন্তু প্রতিপক্ষ হঠাৎ সামনে এসে গেলে দিশাহারা হয়ে দিগ্বিদিগ পালাতে শুরু করে। গত ৫০০ বছরের ইতিহাসে দিলি্ল বাহিনী যতবারই বাংলা আক্রমণ করেছে আমরা প্রায় একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখেছি।

সার্বিক অবস্থায় আমার মতামত হলো পূর্ববঙ্গেই সুবে বাংলার রাজধানী হোক। সেই রাজধানীর নামকরণ সম্রাটের নামে করা হোক। এতে করে প্রতিপক্ষ রাজধানী আক্রমণের বিষয়ে যথেষ্ট মানসিক চাপে থাকবে। কারণ যেহেতু এটি সম্রাটের নামে নামকরণ হয়েছে সেহেতু সম্রাট এটি রক্ষার জন্য সর্বতো চেষ্টা করবেন। অন্যদিকে স্থানীয় জনগণ এতে দারুণভাবে নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করবে। তাদের সহজেই বিশ্বাস করানো যাবে যে, একে তো নতুন রাজধানী তার ওপর আবার সম্রাটের নামে। ফলে এখানে প্রচুর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, উন্নয়ন হবে এবং স্থানীয়ভাবে করারোপের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে বেশি বরাদ্দ আসবে। এ অবস্থায় মোগলবাহিনী স্থানীয় জনগণের সর্বাত্দক সহযোগিতা লাভ করবে।

বিরোধী পক্ষের সঙ্গে প্রথমদিকে সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে দূরবর্তী কয়েকটি ছোট ছোট রাজ্য আক্রমণ করে জয়লাভের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে কামরূপ রাজ্য আক্রমণের জন্য সৈন্য প্রেরণ, অন্যদিকে রাজধানীতে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে হবে। সৈন্যরা সকাল-বিকাল নগরীর এপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত মার্চ করবে এবং ঘোড়া ছুটিয়ে জৌলুসপূর্ণভাবে চলাফেরা করে। বড় বড় দুর্গের নির্মাণকাজ আরম্ভ করতে হবে। নির্মিত হবে মসজিদ, রাস্তাঘাট ইত্যাদি। এভাবে যদি আট-নয় মাস প্রবল সৈন্য সহকারে চলা যায় তাহলে অস্থির বাঙালি ভয় পেয়ে স্বেচ্ছায় এসে সন্ধির প্রস্তাব দেবে। আমার বিশ্বাস কোনো যুদ্ধ করা লাগবে না।

সম্রাট এবং তার সভাসদরা মনোযোগ সহকারে সম্রাজ্ঞীর বক্তব্য শুনছিলেন। অবাক বিস্ময়ে তারা সম্রাজ্ঞীর পাণ্ডিত্য, বাচনভঙ্গি এবং সুবে বাংলা সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞানের পরিধি লক্ষ্য করছিলেন। উপস্থিত সভাসদ সম্রাজ্ঞীর মতের সঙ্গে সহমত পোষণ করলেন এবং অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয়ে তাদের বক্তব্য সংযোজন করলেন। সম্রাটও কিছু বিষয় যোগ করলেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে এই বোধহয় প্রথম সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে উপস্থিত সভাসদরা নির্ভয়ে এবং নিঃসঙ্কোচে আলোচনার সুযোগ পেল এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর সবাই মনে করল এটা তারই সিদ্ধান্ত।

সম্রাজ্ঞী নূরমহল যখন আলোচনা করছিলেন তখন সম্রাট আড়চোখে বার বার প্রিয়তমা স্ত্রীর দিকে তাকাচ্ছিলেন। তার স্ত্রী যে এত সুন্দর তা তিনি এর আগে কল্পনাও করতে পারেননি। ছিপছিপে হালকা গড়ন। পারস্যের গোলাপের আভা সোনা নূরমহলের সর্বাঙ্গ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে। মুখমণ্ডল থেকে পায়ের নখ অবধি কোথাও যেন এতটুকু মেদ নেই। শরীরের যতটুকু অনাবৃত ছিল ততটুকু দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে, সম্রাজ্ঞীর গায়ের রং সর্বত্র একই উজ্জ্বলতা নিয়ে ঝলমল আবেশ সৃষ্টি করছিল। তিনি সতর্কতার সঙ্গে পেট ও বুকের দিকে লক্ষ্য করলেন। মেয়েদের বিশেষত সন্তান প্রসবের পর পেট ও তলপেটের মধ্যে উচ্চতা ও আকৃতির পার্থক্য থাকে। প্রায়ই তলপেট ভারী হয়ে যায়। কোনো পোশাক এই বৈষম্য ঢেকে রাখতে পারে না। কিন্তু নূরমহলের পেটের আকৃতি ছিল ১৪-১৫ বছরের একজন অবিবাহিতা কিশোরীর মতো। তিনি পিঠ টান টান করে বসেছিলেন হাঁটু পেছনের দিকে ভাঁজ করে। ফলে বুক থেকে পেট এবং তলপেটের গড়ন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। সম্রাট এবার বুকের দিকে তাকালেন। কিন্তু ইতোমধ্যেই রাজকীয় মুন্সি শাহী ফরমান লিখে ফেলছেন এবং সম্রাটের কাছে পেশ করলেন মোহরাঙ্কিত করার জন্য। সম্রাটের ভাবনায় ছেদ পড়ল। আনমনে নিজের মোহরাঙ্কিত স্থানটিতে স্বাক্ষর করলেন। ইতোমধ্যে প্রাতরাশ পর্বও শেষ হলো। নকীব সভার সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। সবাই যার যার মতো উঠে গেলেন। সম্রাজ্ঞীও যাচ্ছিলেন। কিন্তু সম্রাট একাকী বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। সম্রাজ্ঞী যখন সভাস্থল ত্যাগ করছিলেন তখন কেবল সম্রাট ছাড়া সবাই উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করছিল। রাজকীয় সানাইয়ের সুরে তাকে বিদায় জানানো হচ্ছিল। এসব কোনো কিছু মোগল হেরেমের ঐতিহ্যের মধ্যে ছিল না। এমনকি সম্রাটও কাউকে কিছু ইঙ্গিত দেননি। তবে সম্রাজ্ঞী নূরমহলের প্রতি সভাসদরা এবং রাজ-অন্তপুরের প্রটোকলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এত সম্ভ্রম দেখাল কেন। হতে পারে নূরমহলের প্রবল রাজসিক ব্যক্তিত্ব। অথবা সম্রাটকে খুশি করার জন্য। যাই হোক, সম্রাট এবার ভাবতে শুরু করলেন আজ রাতের অনুষ্ঠেয় অভিসার পর্ব নিয়ে। তার একটু আফসোস হচ্ছিল গত রাতের ঘটনা নিয়ে। কেন তিনি নির্বোধের মতো সারারাত প্রেয়সীর কথা শুনলেন। একবারও কেন স্পর্শ করলেন না। আলতোভাবে স্পর্শ। তারপর আলিঙ্গন, এরপর অন্যান্য আবেগের বহিঃপ্র্রকাশ এসব করতে বড়জোর কত সময়ই লাগত। বাসরঘরে সক্ষম পুরুষের মতো আচরণ করার জন্য তিনি উচ্চমাত্রার উত্তেজক ওষুধ সেবন করেছিলেন। কিন্তু সম্রাজ্ঞীর মোহময় অভিব্যক্তি ও জীবনালেখ্য শুনে সেই ওষুধও কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছিল। এ কথা স্মরণ করতেই সম্রাট প্রবলভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। দুষ্ট চিন্তা এবং শরীরের দুষ্ট অঙ্গগুলো একসঙ্গে লাফালাফি শুরু করল। আজ রাতে আর ভুল হবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে সম্রাট মূল দরবার হলের দিকে রওনা হলেন।

রাজ দরবার সেদিন ছিল লোকে লোকারণ্য। বলতে গেলে রাজধানীর সব আলেম ওলামা সেদিন উপস্থিত হয়েছিলেন। দরবার হল প্রাসাদের মূল বেদি এবং দুর্গের মূল ফটক পর্যন্ত কয়েক হাজার ধর্মীয় আলেম উপস্থিত। প্রাসাদের বাইরেও প্রায় লাখখানেক মানুষ জড়ো হয়েছে। দরবারে প্রবেশ করামাত্র সম্রাট বুঝতে পারলেন পরিস্থিতির গুরুত্ব। কিন্তু তার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই বিশাল উপস্থিতি সম্পর্কে তাকে কিছুই জানায়নি। এরা কেন এসেছে, কীভাবে এসেছে বা এত লোক হঠাৎ করে দরবারের সব কার্যতালিকার ঊধের্্ব উঠে কেমন করে দরবার হলে প্রবেশ করল! এসব চিন্তা করার আগেই সমবেত আলেমরা নারায়ে তাকবির, আল্লাহ আকবর বলে স্লোগান দিল। অন্যান্য দিনে সম্রাটের আগমন বার্তা নকীব ঘোষণা করে। এর পর সম্রাটের সম্মানে সানাই-নহবত বোঁজ ওঠে। উজির-নাজির, সেনাপতি ও পাত্র-মিত্ররা যে যার পদমর্যাদা অনুযায়ী দাঁড়িয়ে থাকেন। রাজ অন্তঃপুরের পদবিধারী রাজ মহীয়সীরা পর্দার অন্তরালে যার যার আসনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরই মধ্যে সম্রাট ঢুকেন। উপস্থিত সবাই মাথা নুইয়ে কুর্নিশ করেন এবং সম্রাটের সম্মানে নির্ধারিত প্রশংসাসূচক শব্দমালা সমস্বরে উচ্চারণ করেন। শহরের প্রধান বিচারপতি, কাজী উল কুজ্জাত, প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং প্রধান সেনাপতি সম্রাটের কাছাকাছি আসনগুলোতে বসা থাকেন। দরবার পরিচালনাকারী আগের রাতেই দিনের কর্মসূচি নির্ধারণ করেন। ফলে সেভাবেই কর্মদিবস এগুতে থাকে। ভোর থেকে মধ্যাহ্ন অবধি। এর পর দুই ঘণ্টা বিরতি। আবার শুরু হয়ে কখনো কখনো গভীর রাত অবধি চলে। মাঝে নামাজের বিরতি থাকে। পুরোটাই নির্ভর করে কার্যতালিকার ওপর। যেদিন কাজ কম থাকে সেদিন মাঝেমধ্যে দরবারে গান-বাজনা, কবিতা, ধর্মতত্ত্ব্ব বিষয়ে আলোচনা এবং দেশি-বিদেশি নৃত্য পটিয়সীদের অংশগ্রহণে চলে নৃত্যানুষ্ঠান। কিন্তু আজকের সকাল এমন হলো কেন। সকাল থেকেই সম্রাটের মন ভীষণ ফুরফুরে ছিল। প্রকাশ্য দিবালোকে নূরমহলকে প্রাণভরে দেখার সুযোগ, সুবে বাংলা সমস্যার ব্যাপারে সর্বসম্মত একটি সিদ্ধান্ত দিতে পারার আনন্দ এবং সর্বোপরি আজকের রাতে প্রেয়সির সঙ্গে রঙ্গলীলার পূর্ব পরিকল্পনা করার সুখাবেশ মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। কিন্তু দরবারে ঢুকেই তিনি বুঝতে পারলেন অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটেছে। স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছিল পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণে নেই। প্রাসাদরক্ষীদেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। মনে হচ্ছে আগত আলেমরা দরবারের হর্তাকর্তা।

প্রজ্ঞাবান সম্রাট মুহূর্তের মধ্যেই কর্তব্য স্থির করে ফেললেন। অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে দরবারে ঢুকে সিংহাসনে আসীন হলেন। পাত্র-মিত্ররা মাথা নুইয়ে কুর্নিশ করল। আলেমরা মাথা নোয়ালেন না। বরং সমস্বরে সালাম দিয়ে বললেন_ আসসালামু ওয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহে ওয়া বারকাতুহু। এটাও ছিল মোগল রাজদরবারের চিরায়ত ঐতিহ্যের খেলাপ। বুদ্ধিমান সম্রাট সালামের উত্তর দিয়ে অভ্যাগত আলেমদের স্বাগত জানালেন। এর পর তাদের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকালেন। পরিচিত কেউ আছেন কিনা দেখার চেষ্টা করলেন। তাদের চোখ ও মুখের অভিব্যক্তি দেখে আগমনের হেতু বোঝার চেষ্টা করলেন। নাহ, কাউকেই তো পরিচিত লাগছে না। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আশপাশের কারও সঙ্গে আলাপ করবেন সেই সুযোগ পেলেন না। এত বৃহৎ সমাবেশের উদ্দেশ্য কিছু বলা বিপজ্জনক। আর এসব ক্ষেত্রে হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত দেওয়া আত্দহত্যার শামিল। সম্রাট সময় নিতে চাইলেন অন্তত ২০-৩০ মিনিট। কেবল পরিস্থিতি সম্পর্কে আন্দাজ লাভের সুযোগটুকু পাওয়া। তিনি কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। দরবার ত্যাগ করে কিছু সময়ের জন্য বাইরে যাবেন তাও সম্ভব ছিল না বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ভয়ে। সম্রাট অনেকটা অসহায়ের মতো চারদিকে তাকাচ্ছিলেন। তার পাত্রমিত্র সেনাপতি, দ্বাররক্ষী বা প্রাসাদরক্ষীরা সব আতঙ্কিত চোখে বার বার এদিক-ওদিক ফিরছিলেন। সম্রাট কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। এরই মাঝে নকীব ঘোষণা করলেন পর্দার আড়ালে বসা মহামান্য সম্রাজ্ঞী নূরজাহান সম্রাটের সঙ্গে জরুরি কথা বলতে চান। সম্রাট চাইলে তিনি প্রকাশ্য দরবারে আসতে প্রস্তুত অথবা সম্রাট অনুগ্রহ করে তার খাসকামরায় গমন করতে পারেন।

নকীবের ঘোষণা দরবারস্থলে বজ্রপাতের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করল। ভারতবর্ষে বিগত প্রায় ৪০০ বছরের মুসলিম শাসনে এরূপ ঘটনা কখনো ঘটেনি। একমাত্র সুলতান ইলতুৎমিসের শাসনামলে রাজকুমারী সুলতানা রাজিয়া মাঝেমধ্যে দরবারে আসতেন সৈনিকের পোশাকে। প্রথমদিকে কট্টর মুসলিম আমাত্যরা প্রবল বিরোধিতা করতেন। পরে সুলতান ইলতুৎমিসের দৃঢ়তার কারণে তারা নমনীয় হয়। ইলতুৎমিস তার সুযোগ্য কন্যাকে অনেক আগেই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন। যখন প্রকাশ্য দরবারে রাজ অন্তঃপুরের দূহিতা বা মহীয়সীরা আগমন করবেন এটি ছিল অভূতপূর্ব, অতি আশ্চর্য ঘটনা এবং প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থাপনার একেবারেই বিপরীত। নকীবের ঘোষণায় সম্রাট আরও হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন। উপস্থিত সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকলেন। সম্রাজ্ঞী নূরমহলকে দরবারে আগমনের অনুমতি দেওয়া হলো এবং সম্রাটের পাশে একটি কুরসির ব্যবস্থা করা হলো।

সম্রাটের জন্য নির্ধারিত সিংহ দরজা দিয়ে সম্রাজ্ঞী নূরমহল ঢুকলেন। সানাই বাজল, নহবত বাজল। সভার পরিষদরা উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করলেন। সম্রাট একদিকে ফিরে নববধূকে দেখার চেষ্টা করলেন। সবে গত রাতে তার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। কার্যতই লা কবুলিয়ত এবং হালকা কথাবার্তা ছাড়া দৈহিক ও মানসিক ভাব-বিনিময়ের গভীরতায় পেঁৗছানো যায়নি। অথচ তার অভিব্যক্তি, শান শওকত এবং গত রাত থেকে এ পর্যন্ত যা কিছু ঘটল তার হিসাব মেলাতে পারছেন না সম্রাট নূর উদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। সম্রাট লক্ষ্য করলেন নূরমহল তার প্রাতঃরাশকালীন পোশাক-পরিচ্ছদ পাল্টে ফেলেছেন। সঙ্গে অলঙ্কারাদিও। সম্পূর্ণ মুসলিম ঐতিহ্যের আরবীয় ও পারসিক ধাঁচের পোশাকে আবৃত সম্রাজ্ঞীর পোশাকে এমন এক রুচিশীলতা আভিজাত্য ও শালীনতাবোধ ফুটে উঠেছে যে দরবারের সবচেয়ে কট্টরপন্থি পুরুষ মানুষটিও অভিযোগ করতে পারবেন না।

সম্রাজ্ঞী তার জন্য নির্ধারিত কুরসিতে আসন গ্রহণ করার আগে সম্রাটকে কুর্নিশ করলেন। উপস্থিত মান্যবরদের সালাম প্রদান করলেন এবং অন্য অভ্যাগতদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানালেন। আসন নেওয়ার পর একটু ঝুঁকে সম্রাটের দিকে ফিরলেন এবং খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন_ আলমপনা! দরবারের এই গুরুতর সময়ে আমার মনে হলো আপনার পাশে দাঁড়ানো উচিত। আপনি প্রাতরাশ সভার পর যখন কিছুটা সময় সেখানে বসেছিলেন তখনই আপনার অজান্তে দ্রুতই অনেক কিছু ঘটে যায়। আপনি অনুমতি দিলে নকীবের মাধ্যমে আপনার পক্ষে কিছু ঘোষণা দিতে চাই। সার্বিক পরিস্থিতি অনুযায়ী আপনি সিদ্ধান্ত দিলে মনে হচ্ছে উদ্ভূত সমস্যা থেকে ভালোভাবে বের হওয়া যাবে। সম্রাটের পক্ষ থেকে ইতিবাচক ইশারা পাওয়ার পর সম্রাজ্ঞী নকীব অর্থাৎ দরবারের ঘোষককে কতিপয় নির্দেশনা দিলেন। সাধারণ অভ্যাগতদের আসন ও সিংহাসনের মধ্যে নিরাপত্তাজনিত কারণে বেশখানিকটা জায়গা ফাঁক রাখা হতো। নকীবের ঘোষণা ব্যতিরেকে সেই খালি জায়গাটুকু অতিক্রম করে কেউ সম্রাটের কাছাকাছি যেতে পারত না। এই নিরাপদ দূরত্বের কারণে সম্রাট, সম্রাজ্ঞী ও নকীবের মধ্যকার আলোচনা অন্য কেউ শুনতে পেল না।

নকীব ঘোষণা করল_ মহামান্য সম্রাট জানতে চাচ্ছেন তার রাজ্যের পরম শ্রদ্ধেয় আলেমরা কেন এসেছেন? আলেমদের মধ্যে যিনি স্বীকৃত নেতা এবং যার প্রতি আগত মেহমানরা ভরসা রাখেন তাকে সবার পক্ষ থেকে নিবেদন পেশ করার জন্য সম্রাট আদেশ দিচ্ছেন। বক্তব্য প্রদানকারী আলেম প্রথমে হাত উঠাবেন এবং অন্যান্য সবাই তাকে সার্বিক সমর্থন দিয়ে হাত উঠাবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অভ্যাগত মেহমানদের সারি থেকে দশ কদম সামনে এসে তার বক্তব্য প্রদান করবেন। ঘোষণা মতে কাজ হলো। আলেমদের নেতা তার বক্তব্য প্রদানের জন্য সামনে এগিয়ে এলেন এবং বলতে থাকলেন। দরবারের মহান বাদশাহ নূরউদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে সালাম। সালাম তার সম্মানীয়া রাজ মহীয়সী নূরমহলকে। আমরা আজ আমাদের জাতীয় জীবনের অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে সদাশয় সম্রাটের দরবারে ন্যায়বিচারের আশায় এসেছি। ভারতীয় উপমহাদেশের সমগ্র মুসলমান গত প্রায় ৯০ বছর ধরে সীমাহীন মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি। আমাদের পূর্ব পুরুষরা এই কষ্ট নিয়ে ইন্তেকাল করেছেন। আর আমরাও ধুঁকে ধুঁকে মরছি। বাদশাহ নামদার! আমরা দুনিয়ার কোনো সমস্যা নিয়ে আপনার কাছে আসিনি। আপনার রাজ্যের ক্ষতি হবে কিংবা আপনার রাজস্বের ক্ষতি হবে এমন কোনো বিষয় আমরা উত্থাপন করব না।

গোলাম মাওলা রনি

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s