রাক্ষুসে সাগর

ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন হলো ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, বজ্র ও প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাস-সংবলিত আবহাওয়ার একটি নিম্নচাপ প্রক্রিয়া। যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে। এ ধরনের ঝড়ো বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে

ঘুরতে ছুটে চলে বলে এর নাম হয়েছে ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড়ের ঘূর্ণন উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে। ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানলে যদিও দুর্যোগের সৃষ্টি হয়, কিন্তু এটি আবহাওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা পৃথিবীতে তাপের ভারসাম্য রক্ষা করে। গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৮০টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় পৃথিবীতে। এর অধিকাংশই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়, কিন্তু যে অল্প সংখ্যক ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানে তা অনেক সময় ভয়াবহ রূপ নেয়।

 

নামকরণের পেছনে

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ নিয়ে কৌতূহল সবার। শুরুতে কঠিন কঠিন নামকরণ হলেও বর্তমানে সহজ নামে ডাকা হয় ঘূর্ণিঝড়কে। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে নামগুলোর বেশির ভাগই মেয়েদের নামে। ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দ্রুত জানাজানি হওয়ার জন্যই এ সহজ নামের ব্যবহার। আগে নারীদের নামে হ্যারিকেনের নামকরণ করা হলেও ১৯৭৯ সাল থেকে প্রথম পুরুষের নাম অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বর্তমান তালিকায় সমানভাবে পর্যায়ক্রমে মহিলা ও পুরুষের নাম রয়েছে। যেমন এবারের ঘূর্ণিঝড়টির নামকরণ করা হয়েছে ‘মহাসেন’। যা একটি পুরুষের নামে। অতীতে ঝড়ের নামকরণ অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশের ওপর ভিত্তি করে করা হলেও বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জটিল তাত্তি্বক নামের চেয়ে সংক্ষিপ্ত, সুনির্দিষ্ট নামকরণ লিখিত বা মৌখিক যে কোনো যোগাযোগে অধিকতর সহজ এবং দ্রুততর। এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ, একটি ঝড়ের তথ্য হাজার হাজার স্টেশন, সমুদ্র উপকূল এবং জলযানের মধ্যে আদান-প্রদান হয়ে থাকে। শত শত বছর আগে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের ঝড়গুলোর নাম হতো সন্তানদের নামে। যেমন : সান্তা আনা, স্যান ফেলিপ (প্রথম), স্যান ফেলিপ (দ্বিতীয়)। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঝড়কে ছেলেদের নাম দেওয়া হতো। এখন অবশ্য সব ঝড়কে স্থানীয় সাধারণ নাম দ্বারা, যা সংস্কৃতিগত দিক থেকে স্পর্শকাতর নয়, সেসব নামে চিহ্নিত করা হয়। আগে বিচ্ছিন্নভাবে নির্দিষ্ট কোনো ঝড়ের নামকরণ করা হলেও সাম্প্রতিককালে প্রতিটি ঝড়কে চিহ্নিত করতে আলাদাভাবে নামকরণ করা হয়। ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তির যে বেসিনগুলো রয়েছে, সেখানে ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ রয়েছে। তারাই ঝড়ের এ নামকরণ করে থাকেন। ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার আঞ্চলিক কমিটি। উত্তর-ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় পূর্বাভাসের দায়িত্বে আছে ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ। বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা এবং ওমান বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার একটি প্যানেলের (wmo/escap) সদস্য। ২০০০ সালে এই প্যানেল প্রথম প্রস্তাব করে এ অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করার জন্য। এ জন্য প্রতিটি দেশ থেকে ১০টি করে নাম জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যেহেতু বিভিন্ন দেশ তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নাম দিয়েছে, তাই এখানকার ঝড়ের নামে কোনো বর্ণানুক্রম বা সামঞ্জস্য নেই। কোনো ঝড়ের নাম অগি্ন, আবার কোনোটার নাম নার্গিস। ২০০৪ সালে ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ এ অঞ্চলে প্রথম যে ঘূর্ণিঝড়টির নামকরণ করেছিল, তার নাম

ছিল অনিল। একটি নির্দিষ্ট সময়কালে সৃষ্ট সম্ভাব্য সব ঝড়ের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো আগেই নাম প্রস্তাব করে রাখে। একেকটি ঝড় বাস্তবে সৃষ্টি হলে, তালিকা থেকে পর্যায়ক্রমে নাম নির্বাচন করা হয়। ঝড় যেহেতু মৃত্যু ও ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত, তাই কোনো নাম পুনরাবৃত্তি করা হয় না। এশিয়া অঞ্চলে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঝড় ও তার নামকরণকারী দেশ হচ্ছে_ সিডর (ওমান), নার্গিস (পাকিস্তান), রেশমি (শ্রীলঙ্কা), খাই-মুক (থাইল্যান্ড), নিশা (বাংলাদেশ), বিজলি (ভারত), আইলা (মালদ্বীপ)। যেমন, ঘূর্ণিঝড় আইলার নামকরণ করেন মালদ্বীপের আবহাওয়াবিদরা। ‘আইলা’ শব্দের অর্থ ডলফিন বা শুশুক জাতীয় জলচর প্রাণী। নামটি এই ঘূর্ণিঝড়ের জন্য নির্ধারণ করেন জাতিসংঘের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের আবহাওয়াবিদদের সংস্থা ‘ইউএন এস্কেপ’
-এর (un escape) বিজ্ঞানীরা।

 

স্যান্ডি

 

উৎপত্তি : ২২ অক্টোবর, ২০১২

অপসারণ : ৩১ অক্টোবর, ২০১২

আক্রান্ত দেশ : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম ভয়ঙ্কর হ্যারিকেন স্যান্ডি। প্রলয়ঙ্করী এ স্যান্ডির ভয়াল থাবায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ৯টি অঙ্গরাজ্যে। মৃতের সংখ্যা ছাড়ায় শতাধিক। অতীতের সব হ্যারিকেনের ক্ষতির পরিমাণ বিশ্লেষণ করে আবহাওয়াবিদরা নিশ্চিত করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে স্যান্ডিই সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত হানে। স্যান্ডির ভয়াল থাবায় বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রের ৯ অঙ্গরাজ্য। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাড়ি-গাড়ির সামনে গভীর হতাশায় দাঁড়িয়ে থাকে ক্ষতিগ্রস্তরা। যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কল্পনাও করা যায় না। দেশটির অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ স্টক এঙ্চেঞ্জ (ওয়াল স্ট্রিট বিজনেস) হ্যারিকেনের কারণে দুই দিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় তা চালু হয়। ভয়াবহ এ ঘূর্ণিঝড়টি ১২৯ কিলোমিটার বেগে ২৯ অক্টোবর রাতে নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, আটলান্টিক সিটি, বাল্টিমোর, ফিলাডেলফিয়া, ওয়াশিংটনসহ ৯টি অঙ্গরাজ্যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পূর্ণিমার প্রভাবে ১৪ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে পানিতে তলিয়ে যায় আটলান্টিক সিটি, নিউজার্সি ও নিউইয়র্কের কয়েকটি উপকূলীয় এলাকা। লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় নিউজার্সির উপকূল। উপকূলে থাকা স্পিডবোট জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে ছিটকে পড়ে রেললাইনের ওপর। বাড়িঘর ও রাস্তায় থাকা গাড়ির ওপর উপড়ে পড়ে গাছ। কিছু দূর পরপর রাস্তায় উপড়ে পড়া এসব গাছ যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ছিঁড়ে পড়ে বৈদ্যুতিক সংযোগ।

রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে থাকায় আর গণপরিবহন বন্ধ থাকায় নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির অধিকাংশ এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপর্যয় ঘটে। দুই তিন দিন পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে বন্ধ হয়ে যায় নিউইয়র্কের সবচেয়ে ব্যস্ততম ও জনপ্রিয় গণপরিবহন ব্যবস্থা সাবওয়ে বা পাতাল মেট্রো রেল সার্ভিস ।

ঘূর্ণিঝড়কবলিত ১৩টি রাজ্যে ৮২ লাখ বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তখন অন্ধকারে ডুবে যায় এক কোটির বেশি মানুষ। যা দেশটির জন্য ছিল এক চরম আঘাত। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল পরিশোধনাগারে বন্যার পানি ঢোকার পাশাপাশি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।

সিডর

উৎপত্তি : ১১ নভেম্বর, ২০০৭

অপসারণ : ১৬ নভেম্বর ২০০৭

আক্রান্ত দেশ : বাংলাদেশ, ভারত

সিডর। বঙ্গোপসাগর এলাকায় সৃষ্ট একটি ঘূর্ণিঝড়। ২০০৭ সালে উত্তর-ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে এটি চতুর্থ নামকৃত ঘূর্ণিঝড়। এটির আরেকটি নাম ট্রপিক্যাল সাইক্লোন ০৬বি (Tropical Cyclone 06B)। শ্রীলঙ্কান শব্দ ‘সিডর’ বা ‘চোখ’-এর নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ২০০৭ সালের ৯ নভেম্বর একটি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়। ১১ নভেম্বর আবহাওয়ায় সামান্য দুর্যোগের আভাস পাওয়া যায় এবং এর পরের দিনই এটি ঘূর্ণিঝড় সিডরে পরিণত হয়। বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে এটি দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে এবং বাংলাদেশে একটি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সৃষ্টি করে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সকাল পর্যন্ত বাতাসের বেগ ছিল ঘণ্টায় ২৬০ কি.মি এবং ৩০৫ কি.মি। এ কারণে সাফির-সিম্পসন স্কেল অনুযায়ী একে ক্যাটাগরি-৫ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় আখ্যা দেওয়া হয়। সারা রাত উপকূলের জনপদগুলো তছনছ করে এটি উত্তর-পূর্বদিক দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। পরবর্তীতে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ উত্তর-পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে ১৫ নভেম্বর দিবাগত রাত ৩টায় উপকূল অতিক্রম করে। পরে এটি দেশের দক্ষিণ, মধ্যাঞ্চলে স্থল নিম্নচাপ হিসেবে অবস্থান করে এবং পর দিন সকাল ৯টায় দুর্বল হয়ে উত্তর, উত্তর-পূর্বদিক দিয়ে বাংলাদেশের স্থলসীমা অতিক্রম করে। প্রলয়ঙ্করী এ ঘূর্ণিঝড়ের আগমন-বার্তা বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর আগে থেকেই উপলব্ধি করতে পেরেছিল বলে দেশের মানুষকে ঘূর্ণিঝড়ের আগে থেকেই বেশকিছু বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়। এ ছাড়াও উপকূলবর্তী অঞ্চলের অনেক মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু এত সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় তার আক্রমণে ব্যর্থ হয়নি। প্রাণ হারাতে হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০-এরও অধিক মানুষকে। সেই সঙ্গে প্রাণহানি ঘটে কয়েক হাজার গবাদি পশুর। বিনষ্ট হয়েছে ব্যাপক ঘরবাড়ি, মসজিদ-মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ফসলের। এককথায় বলতে গেলে ১৫ নভেম্বর এক বিভীষিকাময় রাত কেটেছে উপকূলের অধিবাসীদের। আজও সেই ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ের কথা মনে করলে অনেকেই অাঁতকে উঠেন। কেঁদে উঠেন স্বজন হারানোর বেদনায়।

 

মহাসেন

উৎপত্তি : ১০ মে, ২০১৩

সম্ভাব্য অপসারণ : আজ দিবাগত রাত

দেশ : শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভারত

ঘূর্ণিঝড় সিডর, নার্গিস ও আইলার পর এবার ধেয়ে আসছে ‘মহাসেন’। ১৯৯১ সালে বৃহত্তর চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর ২০০৭ সালে সিডরের আঘাতে খুলনা উপকূলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। আর মহাসেন ঘূর্ণিঝড়কে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও শক্তিশালী বলছেন আবহাওয়াবিদরা। ঘূর্ণিঝড় উৎপত্তির আগে লঘুচাপ, নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টির পর তা ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হয়। অতীতে সৃষ্ট সব ঘূর্ণিঝড়েই তা হয়েছে। কিন্তু মহাসেন সাগরে লঘুচাপ ও নিম্নচাপ সৃষ্টির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্যানেল ‘ইএসসিএপি’ এ ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয় মহাসেন। এটি শ্রীলঙ্কান শব্দ। ভারত মহাসাগরের একটি বিরাট এলাকাজুড়ে আবহাওয়ার অস্থিতিশীলতার কারণে চলতি সপ্তাহে এ ঊষ্ণমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের উৎপত্তি হয়। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ৬২ কিলোমিটার যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ায় ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলের দিকে ধেয়ে আসা এ ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১৩৪ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠা-নামা করবে। তবে উপকূলের ৩০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি এসে এর গতিবেগ আরও তীব্র হতে পারে। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, আজ দিবাগত রাতে আঘাত হানতে পারে এটি। তবে গতিপথ পাল্টে গেলে আজ দুপুরের পরেই কঙ্বাজারে আঘাত হানতে পারে।

মহাসেনের প্রভাবে গতকাল সকাল থেকেই কঙ্বাজার-সংলগ্ন উপকূল এলাকায় বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। শধু কঙ্বাজার নয়, রাজধানীসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও ঝড়ছে বৃষ্টি। অন্যদিকে সাগর পুরোপুরি উত্তাল রয়েছে। আশার কথা হলো, বৃষ্টিপাতের কারণে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এই ঘূর্ণিঝড়টি_ এমনটাই দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আবহাওয়াবিদদের এই ভবিষ্যদ্বাণী যেন

বাস্তবে রূপ নেয় সেটাই সবার প্রত্যাশা।

 

ক্যাটরিনা

উৎপত্তি : ২৩ আগস্ট, ২০০৫

অপসারণ : ৩০ আগস্ট, ২০০৫

আক্রান্ত দেশ : যুক্তরাষ্ট্র ও হাইতি

প্রায় আট বছর আগে আমেরিকার লুজিয়ানা উপকূলে হ্যারিকেন ক্যাটরিনা আঘাত হানে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল এই ক্যাটরিনার আঘাতে। জীবন বিনাশকারী পাঁচটি ভয়াবহ হ্যারিকেনের মধ্যে এটি অন্যতম। আমেরিকাকে বড় ধাক্কা দিয়ে যায় শতাধিক বিলিয়ন ডলার ক্ষতি করা ওই প্রাকৃতিক দুর্যোগে। আটলান্টিক হ্যারিকেন মৌসুমের ভয়াবহতা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা হ্যারিকেন ক্যাটরিনায় মার্কিনবাসী টের পায়। আটলান্টিক মহাসাগরীয় এলাকায় ঘণ্টায় ৭৪ মাইলের বেশি ঝড় প্রবাহিত হলেই এটিকে হ্যারিকেন বলা হয়। কিন্তু মেয়ের নামে নামকরণ করা ক্যাটরিনা ঘণ্টায় কয়েকগুণ মানে প্রতি ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানে। ২০০৫ সালের ২৩ আগস্টে উৎপত্তি হয়ে দক্ষিণাংশের ফ্লোরিডা অতিক্রম করে ক্যাটাগরি-১। হ্যারিকেনটি আকারে ধীরে ধীরে তীব্র মাত্রায় প্রবাহিত হয়ে মেক্সিকো সাগরে আছড়ে পড়ে। সাগরের গরম
পানিতে হ্যারিকেনটি শক্তিশালী হয়ে ক্যাটাগরি-৫ আকারে প্রবাহিত হলেও দ্বিতীয়বার ২৯ আগস্ট সোমবার আমেরিকার লুজিয়ানা রাজ্যে ক্যাটাগরি-৩ হ্যারিকেন আকারে আঘাত হানে। এর ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে উপসাগরের কূল থেকে ফ্লোরিডা হয়ে টেক্সাসে ঝড় হয়ে আঘাত হানে। তবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাটি ছিল নিউ ওয়ালিয়ান্স, লুজিয়ানা। যেখানে বহু মানুষ হতাহত হওয়ার পাশাপাশি বন্যায় প্লাবিত শহরের বাড়িঘর, পথঘাটসহ ৮০ ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়। সপ্তাহজুড়ে বন্যার পানিতে পুরো শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এ ভয়াবহ হ্যারিকেন কেড়ে

নেয় এক হাজার ৮৩৩ জন মানুষের প্রাণ। এ ছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ৮১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা ১৯৯২

সালে সংঘটিত হ্যারিকেন অ্যান্ড্রুর ক্ষয়ক্ষতির হিসাবের কাছাকাছি। ক্যাটরিনা ২০০৫ সালে যখন আঘাত হেনেছিল তখন বহু মানুষ পূর্বাভাস পাওয়া সত্ত্বেও নিরাপদ

আশ্রয়ে যেতে পারেনি। দুর্যোগ-পরবর্তীতে গবেষণায় জানা যায়, ক্যাটরিনা মার্কিন সমাজের বিক্ষিপ্ততার কঠিন বাস্তব চিত্র এবং ওই সামাজের বন্ধনহীনতার নিদারুণ সত্য তুলে ধরেছে। ওই ঘটনার কষ্টের স্মৃতিগুলো আমাদের শিখিয়েছে, মানুষ পৃথিবীতে এসেছে একসঙ্গে বসবাস করতে সহযোগিতা এবং সহমর্মিতার ভিত্তিতে। ক্যাটরিনার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে বলেই পরবর্তীতে স্যান্ডির সময় শক্ত হাতে

দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন।

 

আইলা

উৎপত্তি : ২১ মে, ২০০৯

অপসারণ : ২৬ মে, ২০০৯

আক্রান্ত দেশ : বাংলাদেশ ও ভারত

ঘূর্ণিঝড় আইলা হলো ২০০৯ সালে উত্তর-ভারত মহাসাগরে জন্ম নেওয়া দ্বিতীয় ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড়টি জন্ম নেয় ২১ মে, ভারতের কলকাতা থেকে ৯৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে। আর এটি আঘাত হানে ২৫ মে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে। অপসারণ ঘটে ২৬ মে। এর ব্যাস ছিল প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, যা ঘূর্ণিঝড় সিডর থেকে ৫০ কিলোমিটার বেশি। সিডরের মতোই আইলা প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় নিয়ে উপকূল অতিক্রম করে, তবে পরে বাতাসের বেগ ৮০-১০০ কিলোমিটার হয়ে যাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি সিডরের তুলনায় তুলনামূলক কম হয়। ঘূর্ণিঝড় আইলায় পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালীর হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আইলার প্রভাবে নিঝুম দ্বীপ এলাকার সব পুকুরের পানিও লবণাক্ত হয়ে পড়ে। খুলনা ও সাতক্ষীরায় ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়। ফলে খুলনার দাকোপ ও কয়রা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন লোনা পানিতে তলিয়ে যায়। ৭৬ কিলোমিটার বাঁধ পুরোপুরি এবং ৩৬২ কিলোমিটার বাঁধ আংশিকভাবে ধসে পড়ে। প্রায় দুই লাখ একর কৃষিজমি লোনা পানিতে তলিয়ে যায়। জলোচ্ছ্বাস ও লোনা পানির প্রভাবে কয়েক হাজার গবাদি পশু মারা যায়। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাস্তুচ্যুত হয় কমপক্ষে তিন লাখ মানুষ। সিডরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আগে থেকেই সতর্ক ছিল প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তা সত্ত্বেও খুলনা ও সাতক্ষীরায় প্রাণ হারান ১৯৩ জন মানুষ।

 

নার্গিস

উৎপত্তি : ২৭ এপ্রিল, ২০০৮

অপসারণ : ০৩ মে, ২০০৮

আক্রান্ত দেশ : মিয়ানমার

২০০৮ সালের ২৩ মে ১২০ মাইল বেগে মিয়ানমারের ইরাবতী বদ্বীপ এলাকায় আঘাত হানে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় নার্গিস। এর তাণ্ডবে প্রাণহানি ঘটে কমপক্ষে ২২ হাজার মানুষের। এর মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটে উপকূলের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে। ক্ষতি হয় দেশটির উঠতি ফসল ও কয়েক লাখ গবাদি পশুর। ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয় স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ১৯৯১ সালের পর এশিয়ায় আঘাত হানা সবচেয়ে ধ্বংসাত্দক এ ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়-ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব দিতে গিয়ে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়ান উইন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ইয়াঙ্গুনের ৫০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমের বোগালে শহরেই মারা যান ১০ হাজার মানুষ। প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ১৫৫ মাইল বেগে বাংলাদেশে আঘাত হানা এক প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে এক লাখ ৪৩ হাজার লোক নিহত হয়েছিলেন। নার্গিসের ১২০ মাইল বেগের বাতাস এবং ১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে গৃহহীন হয়ে পড়েন কয়েক লাখ মানুষ। তীব্র পানির সংকটে পড়েন ইয়াঙ্গুনের ৫০ লাখ অধিবাসী। পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্য, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রীর দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়ায় সেই সঙ্গে দুর্ভোগ বাড়ে ঘূর্ণিঝড়ে দুর্গতদের। এককথায় বলতে গেলে অচল হয়ে পড়ে গোটা মিয়ানমার। জান্তা সরকারের আহ্বানে সাড়া দেয় বিশ্বের বিভিন্ন সংগঠন। এগিয়ে আসে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার ও ত্রাণতৎপরতা হাত বাড়ায় প্রতিবেশী দেশগুলো। ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী সামাজিক অস্থিরতা ও জনদুর্ভোগ কাটাতে কয়েক মাস সময় লাগে সামরিক জান্তা সরকারের।

 

সুনামি

উৎপত্তি : ২৫ ডিসেম্বর, ২০০৪

অপসারণ : ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৪

আক্রান্ত দেশ : ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া

‘সুনামি’ (Tsunami)জাপানি শব্দ। এর বঙ্গানুবাদ পোতাশ্রয়ী তরঙ্গ। সু-মানে পোতাশ্রয়, নামি হলো তরঙ্গ। টাইভাল ওয়েভস বা জোয়ারে তরঙ্গ বলেই মানুষ একে চেনে। ভূমিকম্প বা জোয়ারের প্রভাব ছাড়াও অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিধস বা মহাজাগতিক বস্তু পতনেও সুনামি হতে পারে। প্রকৃতির খামখেয়ালির ঝাপট-দাপট বিষাক্ত ছোবলের আরেক নাম সুনামি। সাইক্লোন, টাইফুন, হ্যারিকেনের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ সেকেন্ড অন্তর সমুদ্রে ১৫০ মি. পর্যন্ত তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ঢেউ সৃষ্টি হয়, আর সুনামি বৃত্তাকারে প্রতি সেকেন্ডে ২০০ মি. কিংবা ঘণ্টায় ৭০০ কি.মি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। উৎপত্তি স্থল থেকে ১০ হাজার কি.মি দূরেও এর দানবীয় তাণ্ডব অব্যাহত থাকে। ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সময় সকাল ৬টা ২৮ মিনিটে সুমাত্রা দ্বীপের ২৫০ কি.মি দক্ষিণ-পূর্বে সমুদ্রতলের ৪০ কি.মি গভীরে প্রবল ভূকম্পনজনিত আলোড়নে (রিখটার স্কেলে তীব্রতা ৮.৯) দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ভারতে যে ভয়াবহ জলকম্পন সৃষ্টি হয়, তাই সুনামি। প্রায় ২ লাখের বেশি মানুষ, অজস্ত্র পশুপাখি, জলজপ্রাণ, বহুমূল্যের বনজ-খনিজ সম্পদ ও ফসলসহ কোটি কোটি টাকার ধনসম্পদ এবং ঐতিহাসিক সভ্যতা সুনামির দাঁতাল আক্রমণে প্রাণনাশ, বিধ্বংসী ও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এ ছাড়া ভারত মহাসাগরের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয়। বিভীষিকাময় সেই ভয়াল দুঃসহ স্মৃতির কথা মনে করলে আজও কেঁপে উঠে সুনামির হাত থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষেরা।

 

শামছুল হক রাসেল

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s