নবী মুহাম্মদ (সঃ)

মূল রচনাঃ কে.এস. রামাকৃষ্ণ রাও

(প্রফেসর রামাকৃষ্ণ রাও মহীশুরের মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন ডিপার্টমেন্টের প্রধান। তাঁর Islam and Modern age  এই গ্রন্থ থেকে অনূদিত অংশটি গ্রহণ করা হয়েছে। ) 

মুসলিম  ঐতিহাসিকদের মতে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ৫৭০ খ্রীস্টাব্দের ২০ শে এপ্রিল তারিখে মরম্নময় আরবভূমিতে জন্মগ্রহণ করেন। ’মুহাম্মদ’, এই নামের অর্থ ’সর্বোচ্চ প্রশংসিত’। আসলেও তাই, আমার বিবেচনায় আরবের শ্রেষ্ঠতম ও সুউচ্চতম ও মহত্তম আত্মার অধিকারী এই সমত্মান। এবং এই কথার অর্থ, তাঁর আগে ও পরে  রক্তাভ বালুকাকীর্ণ অপরাজেয় আরব্য মরম্নভূতে যত কবি কি সম্রাট জন্মগ্রহণ করেছেন, কোন সন্দেহ নেই, তাঁদের  মধ্যে তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ, তাঁরই স্থান সর্বশীর্ষে ।

 নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর আবির্ভাবকালে আরবদেশ একটি মরম্নভূমি মাত্র-নিতামত্মই শূন্য বিশুষ্ক এক মরম্নভূমি । কিন্তু এই নিরঙ্কুশ শূন্যতার মধ্য থেকে মুহাম্মদ (সঃ)  এর সর্বজয়ী  পরম আধ্যাত্মিকতার কল্যাণস্পর্শে জেগে উঠলো এক নতুন পৃথিবী, জেগে উঠলো নতুন জীবন ও সংস্কৃতি, এক নবীনতম সভ্যতা, যে প্রভাব ছড়িয়ে পড়লো তিন মহাদেশ, এশিয়া আফ্রিকা ও ইউরোপের চিমত্মায় ও জীবনে ও মানসতায় ; এবং প্রতিষ্ঠিত হলো এমন এক নতুন সাম্রাজ্য যা মরক্কো থেকে ভারতবর্ষ পর্যমত্ম ব্যাপ্ত ও সম্প্রসারিত।

 নবী মুহাম্মদ (সঃ) সম্পর্কে কিছু লিখবো, এইকথা ভাবলেই আমি কিছুটা দ্বিধাগ্রসত্ম হয়ে পড়ি। দ্বিধাগ্রসত্ম, কারণ এ এমন এক ধর্ম সম্পর্কে লেখা যে-ধর্মে আমি নিজে দীক্ষিত নই। তাছাড়া এটা একটা সূক্ষ্ম ও নাজুক ও সংবেদনশীল বিষয়ও বটে, কারণ বহু মানুষ বহু ধর্মের যেমন দীক্ষিত তেমনি নানারূপ চিমত্মা-দর্শনেরও  অনুগামী, এবং একই ধর্মের  মধ্যে নানাবিধ বিভক্তিও বিরাজমান। যদিও কখনো কখনো এই দাবী প্রধান্য লাভ কওে যে, ধর্মের একটি মৌলিক প্রবণতা হলো-দৃশ্যমান কি অদৃশ্য-সমগ্র বিশ্বজগতকেই আপনার মধ্যে আত্মস্থ করা এবং যেভাবেই হোক, ধর্ম যেহেতু এক অমত্মর্গামী শক্তির অধিকারী, সে আমাদের হৃদয় মন ও আত্মার চেতন অচেতন ও অবচেতন সত্মরে  প্রবেশ করতে পারে  ও করে  । সমস্যা আরও সর্বপস্নাবী গুরম্নত্ব বহন করে, যখন এই প্রবল বিশ্বাস অত্যমত্ম প্রবল হয়ে ওঠে যে, আমাদের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত সবই কোমল ও সূক্ষ্ম এক মনোরম রেশমি রজ্জু দ্বারা আবদ্ধ। এবং আমরা যদি আর একটু অধিক স্পর্শকাতর হই, আমাদের  অমত্মর্মধ্যস্থ মাধ্যাকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু একটি অসম্ভব মানসিক চাপের  মধ্যে পড়ে। অতএব এই সকল দৃষ্টিকোণ থেকে অন্য ধর্ম সম্পর্কে যত কম বলা যায় তত ভালো । কারণ ওষ্ঠের উপর একটি শক্ত সীলমোহর  আমাদের  অমত্মর্জগতকে যে কোন বহিরাক্রমণ থেকে যেমন নিরম্নপদ্রব রাখতে পারে , ধর্মকেও তেমনি গভীর ও অপ্রবেশ্য গোপনতার মধ্যে রাখতে পারে  অক্ষত ।

 কিন্তু এই সমস্যার অন্য একটি দিকও বর্তমান। মানুষ এক সমাজবদ্ধ জীব। ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায়, পরোক্ষ কি সরাসরি আমাদের  অসিত্মত্ব বহু মানুষের সঙ্গে যুক্ত। একই ভুমিতে উৎপাদিত ফসল আমাদের  খাদ্য, একই প্রস্রবণ থেকে আমাদের  তৃষ্ণা নিবারণ করি এবং একই বায়ুতে আমাদের  জীবনধারণ । তাই এমনকি আমরা যখন একামত্মভাবেই আমাদের  স্বমতের কট্টর ও আপোষহীন ধারক তখনো পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেয়া কল্যাণকর । আমাদের যারা প্রতিবেশী তাদের  মন কখন কী কারণে তরঙ্গায়িত হয়, তাদের কর্মপ্রবাহের  মূল সূত্র  ও প্রবণতাগুলি কী রকম-এইসব যদি অমত্মত কিছু  পরিমাণেও জানতে পারি, আমাদের  অনেক লাভ ।  এইদিক থেকে এটা বিশেষভাবে কাঙিক্ষত যে, আমরা আমাদের  পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমঝোতা বৃদ্ধিকল্পে,নিকট কি দূরবর্তী যাই হোক, এক মধুর ও সখ্যময় প্রতিবেশিতার সাথে স্বার্থে বিশ্বের  সকল ধর্মকেই জানবার চেষ্টা করবো । অধিকন্তু আমাদের  ভাবনার সূত্রগুলি দৃশ্যত উপর থেকে যতটা বিক্ষিপ্ত বলে মনে হয়; প্রকৃতপক্ষে তা নয় । পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের নিয়ন্ত্রক ও চালিকা শক্তি যে-ভাবনাগুলি তারা আসলে বিচ্ছিন্ন নয়, তারা কয়েকটি বৈশ্বিক ধর্মচেতনা ও জীবমত্ম কিছু  বিশ্বাসের অবয়বে আমাদের অমত্মর্নিহিত কেন্দ্রস্থ কতিপয় বিন্দুর চারপাশে ঘনীভূত। এবং আমরা যদি বিশ্বনাগরিকত্বে বিশ্বাস করি তাহলে এটা আমাদের  কর্তব্যও বটে যে,পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্মবিশ্বাস ও তার দার্শনিক পদ্ধতি, যা সমগ্র মানবজাতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত হবার চেষ্টা করা।

অবশ্য এই প্রাথমিক মমত্মব্য কি বিবেচনা সত্ত্বেও, ধর্মবিষয়ক আলোচনার ক্ষেত্রটি বুদ্ধি ও আবেগের পারস্পরিক  বৈরিতাহেতু এতটাই পিচ্ছিল যে, সততই শুধু মনে পড়ে, ’দেবদূতেরা যে পথে চলতে আতঙ্ক বোধ করে  নির্বোধেরা সেখানে ভীড় জমায়’। অবশ্য অন্য একদিক থেকে কাজটা খুব জটিলও নয়, কারণ এমন এক ধর্মের  নীতিসমূহ আমার আলোচনার বিষয়-যে ধর্ম ঐতিহাসিক এবং যার প্রবর্তক  একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। এমনকি স্যার উইলিয়াম মূরের মত একজন বৈরি সমালোচকও কোরআন শরীফ সম্পর্কে বলতে বাধ্য হন ’পৃথিবীতে সম্ভবত এমন আর একটি গ্রন্থও নেই যা বারোশ বছর ধরে  এমন বিশুদ্ধ ও অবিকৃত রূপ নিয়ে বিরাজমান’ । আমি এই সঙ্গে এই কথাও যুক্ত করতে পারি যে, নবী মুহাম্মদ (সঃ) এমন এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবনের প্রতিটি ঘটনা অতীব যত্ন ও সীমাহীন সতর্কতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ, এমনকি তাঁর জীবনের ÿুদ্রাতিÿুদ্র কর্ম ও আচরণগুলিও উত্তরকালের জন্য সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় সুরক্ষিত । তাঁর জীবন এর্ব কর্ম কিছুই কিছুমাত্র রহস্যেও আবরণে আচ্ছাদিত নয়; সবকিছু এত সুস্পষ্ট অবিকৃত ও তথ্যানুগ, এত সুরক্ষিত ও সুবিন্যস্ত যে , সঠিক তথ্যেও জন্য আজ আর কাউকে গবেষণায় প্রবৃত্ত হতে হয়না । সত্য উদ্ধার উদঘাটনে দুরম্নহ কোন অভিযানেও নামতে হয়না । প্রাপ্ত তথ্যাদি এত নির্ভুল এত খাঁটি যে, খোসা ছাড়িয়ে কি আবর্জনা মুক্ত করে  সত্যের দানাগুলিকে আলাদা বেছে নেবার দরকার পড়েনা।

 তাছাড়া আমার এই কাজ এখন কিছুটা সহক কারণ রাজনৈতিক কি অন্য কোন কারণে কিছু কিছু সমালোচক একদা ইসলামের বিরম্নদ্ধে যে অপব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিল, সেই ভূমিকা এখন নিস্প্রভ এবং ইসলাম সম্পর্কিত প্রমাদবহুল আলোচনার সেই দিনগুলিও এখন দ্রম্নত অসত্মমিত হচ্ছে। প্রফেসর বেভান তাঁর ’ক্যামব্রীজ মধ্যযুগের ইতহাস’ গ্রন্থে যথার্থই উলেস্নখ করেন, ’উনিবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যমত্ম মুহাম্মদ (সঃ) এবং ইসলাম সম্পর্কে  ইউরোপে যা কিছু ছাপা হয়েছে তা সবই এখন শুধু সাহিত্যিক কৌতুহলের উপজীব্য মাত্র’ । অতএব এই নিবন্ধ রচনায় আমার যে সমস্যা, সেই ভার অজ অনেকখানি লঘু ও সহজ অনুভব করি, কারণ ওই ধরনের ইতিহাস আজ আর বিশেষ গুরম্নত্ব বহন করেনা এবং তা নিয়ে বেশি সময় নষ্ট করারও প্রয়োজন নেই।

উদাহরণত, ইসলাম যে তরবারি-নির্ভর  এই ধরনের মমত্মব্য কোন উলেস্নখযোগ্য মহল থেকে আজ আর তেমন শোনা যায়না । ধর্মে কোন প্রকার জোর জবরদসিত্ম নেই-এটাই ইসলামের একটি সুপরিচিত নীতি। অথচ বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক গীবন বলেছিলেন, ’ইসলামের একটি ক্ষতিকর নীতি হলো তরবারির সাহায্যে সকল ধর্মকে উৎখাত করা’। ঊলেস্নখ করা বাহুল্য, এই অভিযোগ নিতামত্মই গোঁড়ামি ও অজ্ঞতাপ্রসূত। এবং বিখ্যাত ঐতিহাসিকরাও এই কথাই বলেন যে, এই ধরনের কোন অভিযোগের সামান্যতম ভিত্তিও কোরআন শরীফে নেই। এবং খ্রীস্টান ধর্মেও প্রতি বিজয়ী মুসলিম জাতির যে সার্বিক আচরণ, আইন ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যে সহিষ্ণুতা তা থেকেও প্রমাণিত হয়, এই অভিযোগ কত অসার ও অমত্মঃসারশূন্য। প্রকৃতপক্ষে মুহাম্মদ (সঃ) এর জীবনের যে অসাধারণ সাফল্য তার সঙ্গে তরবারির কোন সম্পর্ক নেই ; সেই সাফল্য একমাত্র তাঁর নৈতিক শক্তির উপরই পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত। সত্য যে তাঁকে জিহাদে অবতীর্ণ হতে হয়েছে, কিন্তু সে কেবল আত্মরক্ষার্থে ও সকল শামিত্মপ্রচেষ্টা বার বার ব্যর্থ হওয়ার কারণে পরিস্থিতি তাঁকে রণক্ষেত্রে যেতে বাধ্য করেছে। কিন্তু মনে রাখা আবশ্যক নবী মুহাম্মদ(সঃ) যুদ্ধনীতি ও যুদ্ধক্ষেত্রের পুরো চেহারাটাই বদলে দিয়েছিলেন। স্মরণ করতে পারি, সম্পূর্ণ আরব উপদ্বীপ ইসলামের ইসলামের পতাকাতলে আসা পর্যমত্ম তাঁর সমগ্র জীবন যত যুদ্ধ হয়েছে তাতে সর্বমোট হতাহতের সংখ্যা কয়েক’শর অধিক নয় । এবং এই যুদ্ধক্ষেত্রেও তিনি বর্বর আরববাসীকে মহান আলস্নাহর উদ্দেশ্যে আবশ্যিকভাবে রীতিমত জামাতবদ্ধ হয়ে নামাজ পড়বার শিক্ষা দিয়েছেন। এমনকি যুদ্ধের ভয়াবহ প্রচণ্ডতার মধ্যেও দিনে পাঁচবার  এই জামাতবদ্ধ নামাজ আদায়ের কোনরূপ ব্যত্যয় ঘটেনি । একদল মহান আলস্নাহর উদ্দেশ্যে যখন সেজদারত অন্যদল তখন শত্রম্নর মোকাবিলায় নিয়োজিত; নামাজশেষে নামাজীরা যুদ্ধে যাচ্ছেন আর যাঁরা ছিলেন যুদ্ধরত তাঁরা আসছেন নামাজে। কী বিস্ময়কর কল্পনাতীত এই দৃশ্য! অথচ এই সেই আরবদেশ যেখানে ভুলক্রমে এক গোত্রের একটি উট অপর গোত্রের চারণভূমিতে প্রবেশ করার মত তুচ্ছ কারণে পরস্পরের বিরম্নদ্ধে এমন ভয়াবহ লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, যা একদিক্রমে চলিস্নশ বছর ধরে  চলে, যে যুদ্ধে সত্তর হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটার পরেও আক্রোশ প্রশমিত হয়না এবং উভয় গোত্রেরই প্রায় নিশ্চিহ্ন হবার মত অবস্থা হয় । ইসলামের নবী সেই আরববাসীকে সর্বোচ্চ আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃংখলার এমন শিক্ষা দান করলেন যার মহিমা এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও নামাজের মধ্য দিয়ে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। চরম বর্বরতার যুগে রণক্ষেত্রে আলোকিত হয়ে ওঠে মানবিক মহিমায়। নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর কঠোর নির্দেশঃ প্রতারণা করা যাবেনা, বিশ্বাসভঙ্গ করা যাবেনা, নিহত ব্যক্তির অঙ্গচ্ছেদ করা যাবেনা,। তাঁর নির্দেশঃ শিশু নারী ও বৃদ্ধদের  হত্যা করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ, কোন ফলের গাছ বিনষ্ট কি কর্তন করা নিষিদ্ধ; নিষিদ্ধ,শত্রম্ন হলেও প্রার্থনারত কোন ব্যক্তিকে আঘাত করা। নিকৃষ্টতম শত্রম্নর প্রতিও তাঁর নিজের আচরণ তাঁর অনুসারীদের জন্য এক অদৃষ্টপূর্ব মহত্তম দৃষ্টামত্ম। মক্কা বিজয়ের পর তিনি ক্ষমতার সর্বোচ্চ সত্মরে  উপনীত । এই সেই  মক্কা নগরী যেখানে তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, তাঁর কথায় কেউ কর্ণপাত করেনি। ;এই সেই মক্কা , যে নগর তাঁকে ও তাঁর অনুগামীদের  উপর সীমাহীন অত্যাচার করেছে,তাড়িয়ে দিয়েছে, নির্দয়ভাবে বয়কট করেছে, এমনকি দু’শো মাইল দূরে  দিয়েও তিনি রেহাই পাননি। সেই মক্কা আজ তাঁর পদতলে। যুদ্ধের  নিয়ম অনুযায়ী  তিনি সঙগতভাবেই তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের  বিরম্নদ্ধে যা কিছু শত্রম্নতা ও নির্দয়তা ও প্রতিহিংসা আজ তার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারেন।  কিন্তু কী ব্যবহার তিনি প্রদর্শন করলেন ? কোন প্রতিশোধ কি প্রতিহিংসা নয়, মুহাম্মদ(সঃ) এর হৃদয় আজ মমতাপস্নুত; তিনি ঘোষণা করলেন, ’মানুষে মানুষে বিভেদ ও ঘৃণা আজ আমার এই দুটি পদতলে পিষ্ট ও বিনষ্ট হোক’। কোন সন্দেহ নেই, এই ঐক্যবদ্ধ মানবসমাই ছিল তাঁর অন্যতম লÿ্য। তাই তিনি আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধের অনুমতি দিয়েছেন বটে, কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছানোমাত্র নিকৃষ্টতম শত্রম্নও তাঁর ক্ষমা ও মার্জনা লাভ করে। এমনকি যারা তাঁ প্রিয়তম পিতৃব্য হামজা (রাঃ) কে হত্যা করে  তাঁর বক্ষপিঞ্জর ভেঙ্গে কলিজা চর্বণ করেছে তারাও তাঁর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়নি। বিশ্বভ্রাতৃত্বের নীতি ও মানবসাম্যেও যে মতবাদ তিনি ঘোষণা করেছিলেন,মানবতার বাসত্মব ও সামাজিক উত্তরণে বিশ্বসভ্যতায় সে এক বিরাট অবদান। অবশ্য যে কোন উলেস্নখযোগ্য ধর্মই এই  একই আদর্শবাদ ব্যক্ত কওে, কিন্তু ইসলামের  এই নবীর মধ্যেই কেবল তাঁর প্রকৃত ও পরিপূর্ণ বাসত্মব প্রয়োগ অবলোকন করি। এবং এই বাসত্মব ও ব্যবহারিক প্রয়োগের যে মূল্য ও সহত্ব তার অবশ্যই স্বীকার্য, বিশেষ করে যখন আজ পৃথিবীতে আমত্মর্জাতিক বোধ জাগ্রত হচ্ছে; যখন বর্ণ গোত্রের সকল কুসংস্কার ও ভেদরেখার অবসানে আজ অসিত্মত্বময় হয়ে উঠছে  মহত্তর মানবিক ও ভ্রাতৃত্বচেতনা। এবং ইসলামের এই বিশেষ দিকটির কথা বলতে গিয়ে  মিস সরোজিনী নাইডু যথার্থই উলেস্নখ করেন, ’ধর্ম হিসাবে ইসলামের মধ্যে গণতন্ত্রেও সর্বপ্রথম উন্মেষ ও প্রচার ও রূপায়ণ । কারণ আজানের সঙ্গে সঙ্গে যখনই নামাজীরা মসজিদে এসে প্রত্যহ পাঁচবার সমবেত হন, তখন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এমন এক বাসত্মব পরিগ্রহ কওে যেখানে রাজাপ্রজা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একই কথা ঘোষণা করেন যে-একমাত্র আলস্নাহই সকল মহত্বের অধিকারী’। ভারতবর্ষের  বিশিষ্ট এই মহিলা কবি আরো বলেন, ’ইসলামের এই অবিচ্ছেদ্য ঐক্যবোধ অবলোকন করে  আমি বার বার মুগ্ধ হই কারণ এ এমন এক ঐক্য যা মানুষের মধ্যে সহজেই জাগিয়ে  তোলে এক স্বতঃস্ফূর্ত ভ্রাতৃত্ববোধ । কেউ যখন লন্ডনে কোন মিশরবাসী কি আলজেরিয়, ভারতীয় কি তুর্কী মুসলামনের সাক্ষাৎ পা্য়, সে বুঝতে পাওে মাতৃভূমির বিভিন্নতায় কিছু এসে যায়না , সবাই মুসলমান, সবাই এক  অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ’। মহাত্মা গান্ধী তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিতে বলেন, ’কে একজন একদা বলেছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত ইউরোপীয়দের কাছে আতঙ্কের বস্ত্ত ছিল

ইসলামের আগমন, সেই ইসলাম যা স্পেনকে সুসভ্য করেছে, সেই ইসলাম যা মরক্কোতে বহন কওে এনেছিল জ্ঞানের আলোকবর্তিকা এবং  পৃথিবীকে শুনিয়েছিল

বিশ্বভ্রাতৃত্বের  বাণী । দক্ষিণ আফ্রিকার ইউরোপীয়রা   ইসলামকে ভয় পেয়েছিল, পাওয়ারই কথা কারণ তারা সাদা চামড়ার মানুষের মধ্যে সাম্য কি ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবী করতে পারে কিন্তু সর্বমানবিক ভ্রাতৃত্ব যদি পাপ হয় তারা একটু বেশিই ভীত হবে। এবং যদি সাম্যেও অর্থ হয় সকল বর্ণ গোত্রের সাম্য যা তাদের  কাছে আতঙ্কজনক, তাহলে সন্দেহ নেই তাদের  আতঙ্ক বেশ শক্তভাবেই সুপ্রতিষ্ঠিত’।

পৃথিবী সাক্ষী, প্রতি বছর হজ্ব মৌসুমে ইসলামী সাম্যের  কী বিষ্ময়কর আমত্মর্জাতিক দৃশ্যই না ফুটে ওঠে, যেখানে বর্ণ গোত্র ও মর্যাদার সকল ভেদরেখা নিঃশেষে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কেবল ইউরোপীয়রা নয়, আফ্রিকান,আরবি, ইরানী, ভারতীয়, চৈনিক সবাই এক স্বর্গীয় পরিবারের সদস্য হিসাবে মিলিত, সবার একই পোষাক, দুই প্রস্থ সাদা সেলাইবিহীন কাপড়, একটি কোমর পেঁচিয়ে পরা ও অন্যটি কাঁধের উপর দিয়ে ছড়িয়ে রাখা, সম্পূর্ণরূপে সাজসজ্জাহীন নগ্ন মসত্মক, মুখে একই  উচ্চারণ, ’প্রভু আপনার আদেশ পালনার্থে আমি উপস্থিত । আপনি এক এবং অদ্বিতীয়, প্রভু , আমি উপস্থিত’। এইভাবেই সেখানে উচ্চনীচের কোন ভেদ আর অবশিষ্ট থাকেনা । এবং তারপর সকল তীথযাত্রী-স্ব স্ব গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন, সঙ্গে নিয়ে যান ইসলামের এক তাৎপর্যময় আমত্মর্জাতিক মাহমা ও সৌরভ।

প্রফেসর হার্গরোনজ এর বিবেচনা মতে ’ইসলামের নবী বর্তৃক প্রতিষ্ঠিত যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ তা আমত্মর্জাতিক ঐক্য এবং সর্বমানবিক ভ্রাতৃত্বকে এমন এক বৈশ্বিক ভিত্তিভূমির উপর দ-ায়মান করে যা অন্য বহু জাতির কাছে আলোকবর্তিকা স্বরূপ।’ এই অধ্যাপক আরো বলেন, আসলেই বহুজাতিক ঐক্যের যে বৈশ্বিক ধারণা ও উপলব্ধি ইসলাম উপহার দিয়েছে তার তুল্য কোন উদাহরণ পৃথিবীর অন্য কোন জাতির ইতিহাসে নেই’। সন্দেহ নেই, গণতন্ত্রেও  যে সর্বোৎকৃষ্ট রূপ তা ইসলামের নবীই পৃথিবীকে প্রদর্শন করেছেন। খলিফা ওমর (রাঃ) , মুহাম্মদ(সঃ) এর জামাতা খলিফা আলি (রাঃ), খলিফা মনসুর , আববাস মামুনসহ বহু খলিফা এবং বাদশাহেকে একজন সাধাররণ অপরাধীর সত বিচারকের সম্মুখীন হয়ে ইসলামী আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। আমাদের  করো অজানা নয, আজকের দিনেও কালো নিগ্রোদের প্রতি সভ্য সাদা মানুষদের  কী আচরণ! অঞচ আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে হজরত মুহাম্মদ (সঃ) এর সময়ে একজন নিগ্রো ক্রীতদাস হজরত বেলাল (রাঃ) কী মর্যাদা পেয়েছিলেন তা স্মরণ করলে বিস্মিত হতে হয় । ইসলামের প্রথম যুগে মুয়াজ্জিনের কাজটা ছিল অতীব মর্যাদাপূর্ণ । এই সম্মান লাভ করেছিলেন হজরত বেলাল (রাঃ) । মক্কা বিজয়ের পর নবী মুহাম্মদ (সঃ) তাঁকে নামাজের জন্য আজান দিতে বললেন। কৃষ্ণবর্ণ পুরম্ন ঠোঁটের এই নিগ্রো মানুষটি ইসলাম জগতের সর্বাধিক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ও পবিত্রতম কারা শরীফের ছাদে গিয়ে  যখন দাঁড়ালেন, কিছু গর্বিত আরব তখন আর্তনাদ করে  উঠলো যে, ’কী নিদারম্নণ, কী বেদনাদায়ক । আজ এক কালো নিগ্রো ক্রীতদাস পবিত্র কাবাগৃহের ছাদে গিয়ে  দাঁড়িয়েছে আজান দেবার জন্য’  সেই মুহূর্তে মুহাম্মদ (সঃ) কোরআন পাকের আয়াত থেকে ঘোষণা করলেনঃ ’হে মানবজাতি, নিশ্চয়ই তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে বিভিন্ন পরিবার ও গোত্রে, যাতে এক অপরকে তোমরা জানতে পারো। নিশ্চয়ই তোমাদের  মধ্যে সেই ব্যক্তিই আলস্নাহর কাছে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত, যে সর্বাপেক্ষা অধিক পূণ্যবান। নিশ্চয়ই আলস্নাহ সর্ববিষয়ে সুপরিজ্ঞাত।’

এবং কোরআন শরীফের এই ক’টি মাত্র পংক্তি এতই শক্তিশালী প্রভাব বিসত্মার করেছিল, সাধন কছছিল এমন মানসিক রূপামত্মর যে, এমনকি ইসলামের খলিফারা পর্যমত্ম, যাঁরা জন্মসূত্রে বিশুদ্ধ আরব, এই নিগ্রো দাসের হাতে নিজ কন্যা সম্প্রদান করতে আগ্রহী হন। এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা সেই ইতিহাস-প্রসিদ্ধ আমিরম্নল মুমেনীন হজরত ওমর (রাঃ)ও এই নিগ্রো ক্রীতদাসের সঙ্গে দেখা হলেই দাঁড়িয়ে এই বলে সশ্রদ্ধ স্বাগত জানান,’আসুন , আমাদের  সর্দার, আমাদের  নেতা’।সমসাময়িক জগতে যে আরব ছিল সর্বাপেক্ষা অভিজাত্য-গর্বিত, কোরআন সেই আরবদের মধ্যে  কি অলৌকিক পরিবর্তনই না সাধন করেছিল! এই হেতুই জার্মানের শ্রেষ্ঠতম কবি গ্যেটে কোরআন শরীফ সম্পর্কে নির্দ্বিধায় বলেন,’ এ এমন এক গ্রন্থ যার মহিমময় প্রভাব ও অনুীলন যুগা যুগ ধরে একইভাবে অব্যাহত থাকবে।’ এবং বার্নাড’শ বলেন, ’আগামী এক শতব্দীর মধ্যে কোন একটি ধর্মেও দ্বারা যদি ইংল্যন্ড তথা ইউরোপ শাসিত হবার ঘটনা ঘটে, সে ইসলাম।’

এবং ইসলামের এই একই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নারীজাতিকেও পুরম্নষের নিগড় থেকে মুক্তি দিয়েছিল । স্যার চার্লস আর্চিবাল্ড হ্যামিল্টন বলেছেন, ’মানুষ যে জন্মগতভাবে নিষ্পাপ এই কথা ইসলামই শিখিয়েছে । ইসলামই বলেছে, নারী পুরম্নষ এই উপকরণ থেকে  সৃষ্ট,  উভয়ে একই আত্মার অধিকারী কোন তারতম্য নেই উভয়ের  মধ্যে । তারা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ও মানসিক উৎকর্ষ অর্জনের ক্ষেত্রেই সমশক্তি ও যোগ্যতা সম্পন্ন’। আরবজাতির এটা বড় ঐতিহ্য

ছিল, যে সমত্মান অস্ত্রচালনায় দক্ষ সেই উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হবে। কিন্তু ইসলামের আগমনেই দুর্বল নারীজাতির সুরক্ষার ব্যবস্থা হলো, এবং তারা লাভ করলো পিতামাতার সম্পদের উত্তরাধিকার । নারীদের  যে সম্পদেও মালিকানা, বহু শতাব্দী পূর্বে ইসলামই তা নিশ্চিত করেছে। এবং স্মিয়য়কর, যে ইংল্যান্ড আজ গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে অভিহিত, সিই ইংল্যন্ড মাত্র এক’শ বছর আগে ১৮৮১ খ্রীস্টাব্দে ইসলামের এই আদর্শ রূপায়নে ’বিবাহিত মহিলা বিধান’ নামে একটি আইন পাশ করেছে। কিন্তু বহু শতাব্দী পূর্বেই ইসলামের নবী (সাঃ) স্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করেছিলেন, ’পুরম্নষ ও নারী পরস্পরের পরিপূরক, এক অপরের অর্ধাংশ। অতীব পবিত্র নারীর অধিকার, লক্ষ রেখো তাদের  জন্য সংরক্ষিত অধিকার যেন পূর্নরূপে অক্ষত থাকে।’

রাজনীতি কি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ইসলামের যোগ খুব প্রত্যক্ষ নয়, কিন্তু এমন কিছু গুরম্নত্বপূর্ণ নীতি ইসলাম নির্ধারণ করেছে যা মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব বিসত্মার করে। প্রফেসর ম্যাসাইনন-এর মতে-ইসলাম দুই চরমতম বিপরীতের মধ্যে রচনা করে  হিতকরী ভারসাম্য, এবং যে উন্নত চরিত্র সভ্যতার ভিত্তিস্বরূপ, তা গঠনে ইসলামের ভূমিকা খুবই সহায়ক। কিন্তু কি করে  সম্ভব হয় এই লÿ্য অর্জন? সম্ভব হয় ইসলামের উত্তরাধিকার আইন ও বাধ্যতামূলক জাকাত-এর যে বিধান , তার ব্যত্যয়হীন প্রয়োগের মধ্য দিয়ে; এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সব ধরনের  অপতৎপরতা, যেমন একচেটিয়া বাজার, সুদ, পূর্বনির্ধারিত অনর্জিত আয় ও মুনাফা, কৃত্রিম অভাবসৃষ্টির মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি-এসব সম্পূণরূপে নিষিদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে। ইসলামে জুয়া বেআইনী । অন্যদিকে স্কুল মসজিদ হাসপাতাল পানীয়জলের ব্যবস্থা এতিমখানা এ-সকল ক্ষেত্রেই অর্থব্যয় ইসলামে অত্যমত্ম উঁচুমানের পূণ্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত। মহানবী (সঃ) এর শিক্ষার মধ্য দিয়েই এতিমখানার সর্বপ্রথম উদ্ভব। বস্ত্তত এতিমদের  জন্য ব্যবস্থাপনার যে ধারণা, তা পৃথিবী এই নবী (সঃ) এর নিকট থেকেই লাভ করেছে যিনি নিজেও ছিলেন একজন এতীম। এই মুহাম্মদ (সঃ) সম্পর্কে কার্লাইলের একটি বিখ্যাত উক্তি, ’যা কিছু উৎকৃষ্ট সেই সাম্য করম্নণা ও মানবতার এক স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর, যেন প্রকৃরি মধ্য থেকে উঠে আসা সমত্মানটির জবানে প্রকৃতিগতভাবেই উচ্চারিত।’

একদা এক ঐতিহাসিক বলেছিলেন,কোন মহামানবকে যদি বিচার করতে হয়, তিনটি বিষয়ে পরীক্ষা করো । এক, তিনি কি তাঁর সমসাময়িক কালে পরিপূর্ণরূপে খাঁটি ও  অকৃত্রিম বলে গৃহীত হয়েছেন? দুই, তিনি কি এতটা বড় ছিলেন যে তাঁর আপন সময়ে প্রতিষ্ঠিত মানদ–র উর্ধে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন? এবং তিন, তিনি কি এমন কোন অবদান রেখে গেছেন যা পরবর্তী পৃথিবীর জন্য স্থায়ী সম্পদ?  এই তালিকা আরো বাড়ানো যায় কিন্তু তা অনাবশ্যক। কারণ মহত্ব নিরূপণের এই তিনটি পরীক্ষাই যথেষ্ট, যা দিয়ে নবী মুহাম্মদ(সঃ) এর শেষ্ঠত্ব অনুধাবন করা সম্ভব। শেষোক্ত দু’টি বিষয়ে ইতিমধ্যে কিছু আলোচনা হয়েছে; এখন প্রথম শর্তটির দিকে লক্ষ করি; নবী মুহাম্মদ (সঃ) কি তাঁর  সমসায়িক জনগণের  কাছে অকৃত্রিম ও খাঁটি বলে গৃহীত হয়েছেন? ঐতিহাসিক তথ্যাবলী থেকে এট প্রমাণিত,শত্রম্নমিত্র নির্বিশেষে সবাই একমত যে, মুহাম্মদ (সঃ) ছিলেন উৎকৃষ্টতম গুণাবলী ও অনুপম চরিত্রের অধিকারী । তাঁর ছিল নিরঙ্কুশ সততা নিষ্কলুষ নির্মলতম চরিত্র, তিনি ছিলেন সর্ববিধ মহত্তম গুণের আধার , তাঁর কথায় আদৌ বিশ্বস করতো না , সেই ইহুদীরা পর্যমত্ম তাঁর পূর্ণ পক্ষপাতহীনতার কারণে তাঁকেই নিজেদের  যে-কোন বিবাদ মীমাংসার জন্য বিচারক  মেনে নিতো । এবং যারা তাঁর কথায় কিছুমাত্র কর্ণপাত করেনি, তারাও বলতে বাধ্য হয়েছে ’ওগো  মুহাম্মদ (সঃ), আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলিনা, আমরা কেবল তাকে অস্বীার করি, যে তোমাকে কেতাব দান করেছে এবং যে তোমাকে ওহি প্রেরণ করে’। আসলে তারা ভাবতো, তিনি ছিলেন কোন অশুভ ভূতগ্রসত্ম । এবং তারা তাছকে এই অশুভ আত্মার আচ্ছন্নতা থেকে নিরাময় করবার জন্যই নিপীড়নের আশ্রয় নিয়েছিল । কিন্তু সেই তাদেরই শ্রেষ্ঠতম অংশ কিছু মানুষ তখনই অবলোকন করেছিলেন মুহাম্মদ (সঃ) এর মধ্য দিয়ে এক নতুন আলোর অভ্যুদয়, যে প্রভাত,- আলোয়  অবগাহন করবার জন্য দ্রম্নত ছুটে এসেছিলেন তাঁরা । এবং ইসলামের এই নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর জীবন ও ইতিহাসের এটা একটি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য বিষয় যে, যাঁরা তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে জানতেন, তাঁর সেই নিকট আত্মীয়, ভাই বন্ধু পরিজন কেউই তাঁর মহৎ ইদ্দশ্য কি কার্যক্রম উদ্বুদ্ধ হয়ে ছুটে আসননি, এসছিলেন তাঁর ঐশ্বরিক প্রেরণার যথার্থ্য অনুভব করে। যদি এই সকল মানুষ, যাঁরা ছিলেন শিক্ষিত বিজ্ঞ ও সম্ভ্রামত্ম, ছিলেন সর্বোপরি নবী জীবনের সমল কিছু সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ওয়াকিবহাল, তাঁদের  চেসসোমন্যতম বিচ্যুতি চালাকি ফাঁকিবাজি, কিঞ্চিতত্তম জাগতিক লোভ কি বিশ্বাসভঙ্গের  ÿুদ্রতম লক্ষ্মণও ধরা পড়তো, মুহাম্মদ (সঃ০ এর যে আশা, মানুষের  মধ্যে নবজন্ম নবপ্রেরণার সঞ্চার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের যে প্রচেষ্টা, সমাজ সংস্কারের যে কার্যক্রম তা সবই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতো, তাঁর স্বপ্নসৌধ খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়তো, সবকিছু ধুলিস্যাৎ হয়ে যেতো মুহূর্তেও মধ্যে্ অথচ কী দেখি আমরা? দেখি, তাঁর অনুগামীদেও ভক্তি ও আনুগত্য এতই অপরিমেয় যে, তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আপন আপন জীবনের একমাত্র পরিচালক হিসাবে গ্রহণ করেছেন মুহাম্মদ (সঃ)কে্ সকর বিপদ ও নিগ্রহকে তাঁরা বরণ করে নিয়েছেন তাঁরই জন্য; অত্যাচারের কঠিনতম মুহূর্তে , শারীরিক-মানসিক পীড়নের দুঃসহতম অবস্থাও, এমনকি নিশ্চিত মৃত্যুও মুঝে দাঁড়িয়ে, তাঁরা তাঁদেও আস্থায় ও শ্রদ্ধায় ও আনুগত্যে অটুট অবিচল্ আর এইরকমই যদি হয়, ইতিহাস যদি এই কথাই বলে, তাহলে এট কি সম্ভব যে তাঁরা তাঁদেও অধিনায়কের মধ্যে কখনো সামান্যতম স্খলনও লক্ষ করেছিলেন?

 ইসলামে যাঁরা নবদীতি্ষত, সেই তাঁদের  ইতহাস যদি লক্ষ করি, দেখবো কী মর্মস্পর্শী  দৃশ্য, কী নির্মমতম পীড়নই না জর্জরিত করেছে সেই সব নিরপাধ-মানব-মানবীকে। সুমাইয়া (রাঃ) নামণী এক নির্দোষ মহিলা , তাকে বলস্নমের আঘাতে আঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে  ফেলা হয়েছে। ইয়াছির (রাঃ) যাঁর  দু’টি পা দুই উটের সঙ্গে বেঁধে ইট দুটিকে দুইদিকে তাড়া করা হলো । খাববাব (রাঃ) কে জলমত্ম জয়লার উপর শোয়ানো হয়েছে, তারপর অত্যাচারীরা তাঁর বুকের উপর এমন সজোরে পা তুলে দাঁড়িয়েছে যাতে তিনি নড়াচড়া করতে না পারেন, তাঁর অগ্নিদগ্ধ পিঠের চামড়া ও চর্বি পুড়ে গলে গেছে। খাবান বিন আদী  (রাঃ)ও  শরীরের মাংস কেটে কেটে এমন নৃশংস অত্যাচার করা হয়েছে যা লোমহর্ষক ।এবং এই অত্যাচারের এ পর্যায়ে যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো,’ তুমি কি চাওনা, তোমার স্থলে মুহাম্মদকে এই শাসিত্ম প্রদান করা হোক’? খাবান (রাঃ) আর্তনাদ করে  উঠলেন, ’অসম্ভব! মুহ্মমদ(সঃ) কে রক্ষার জন্য আমি নিজে , আমার পরিবার, আমার সমত্মান-সমত্মতি সবকিছু হাসিমুখে উৎসর্গ করতে আমি বদ্ধ পরিকর।’&কটি দু’টি নয়,এ-রকম শত শত হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা উলেস্নখ করা যায়। কিন্তু এই সকল ঘটনা কী প্রতিফলিত করে, কোন্ সত্য প্রমাণিত হয় এখানে? প্রমাণিত হয়, ইসলামের এই প্রথমকালের সমত্মানেরা কেবল নিছক আনুগত্যই প্রকাশ করেননি, মুহাম্মদ (সঃ) এর পদপ্রামেত্ম তাঁরা তাঁদের  সমগ্র প্রাণমন, হৃদয় আত্মা ও অমত্মর নিঃশেষে উৎসর্গ করেছিলেন। অনুগামীদের  এই যে গভীর বিশ্বাস, এইযে প্রসত্মরকঠিন আস্থা, এ-থেকে কি প্রমাণিত হয় না যে মুহাম্মদ (সঃ) ছিলেন কত ঐকামিত্মক ও বিশ্বসত্ম, ছিলেন অর্পিত দায়িত্বেও প্রতি কত সৎ ও নিষ্ঠাবান।

ঊলাবাহুল্য , এই সকল নবদীক্ষিতরা কেউই নিমণবংশের ডশ নিমণমানের ছিলেননা। ইসলামের সেই উন্মেষকালে যাঁরা মুহাম্মদ (সঃ) এর পাশে সমবেত হয়েছিলেন, তাঁরা ছিলেন মক্কার সর্বাপেক্ষা উৎকৃস্ট ও সম্ভ্রামত্ম মানুষ; অর্থ সম্মান ও সামাজিক অবস্থান, রম্নচি ও আভিজাত্যে তাঁরাই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। এবং অনেকে তাঁর নিকট-আত্শীয়ও বটে, যাঁরা তাঁকে আদ্যোপামত্ম আপাদমসত্মক চিনতেন । উলেস্নখযোগ্য, সুউচ্চ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ইসলামের যে প্রথম চারজন খলিফা তাঁরা সকলে এই সময়েরই মুসলমান। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতে আছে, ’পৃথিবীর কসল নবী ও ধর্মবেত্তার মধ্যে মুহাম্মদ (সঃ)ই সর্বাপেক্ষা সার্থক ও সফল’ এই উক্তি নিঃসন্দেহে যথার্থ । কিন্তু উলস্নখ করা আবশ্যক, এই সাফল্য কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়। এই সাফল্যেও প্রকৃত কারণ, তাঁর সমসাময়িক কালের মানুষ তাঁর মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছিল নিখাদ অকৃত্রিম ও খাঁটিত্ব । এই সাফল্য তাঁর উচ্চ-প্রশংসিত ও স্মিয়কররূপে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বেরই ফসল। সত্যই কী অলৌকিক অসাধারণ ও বিস্ময়কর এই মুহাম্মদ (সঃ) এর ব্যক্তিত্ব, যার সঠিক পরিচয় তুলে ধরা বাসত্মবিকই অত্যমত্ম দুরূহ। আমরা কিঞ্চিৎ আলোকপাত করতে পারি মাত্র। কিন্তু এইট সমধিক সত্য যে, এই ব্যক্তিত্বের অতি সামান্যই কারো পক্ষে প্রতিফলিত করা সম্ভব্ সত্যই তাঁর জীবন ও চরিত্রের মধ্যে কী নাটকীয় বহুবর্ণ দৃশ্যেও সমাহার, জীবনের সর্ববিধ ঐশ্বর্যেও  কী চিত্রোপম সুষমা। একাধারে তিনি আলস্নাহর সংবাদবাহী পয়গম্বও, তিনি সেনাধ্যক্ষ, তিনি বাদশাহ, তিনি যোদ্ধা ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারক, তিনি বাগ্মী সমাজসংস্কারক, তিনি অসহায় এতিমের আশ্রয়স্থল, উৎপীড়িত ক্রীতদাসের রক্ষক, নারীসমাজের মুক্তিদাতা, তিনি আইনপ্রণেতা বিচারক ও জাগতিক মোহমুক্ত এক আধ্যাত্মিক তাপস। এবং আশ্চর্য,সকল ভূমিকা ও জীবনের সর্ববিধ ক্ষেত্রেই তিনি সাফল্যের শ্রেষ্ঠতম  প্রতীক, এক অদ্বিতীয় মহানায়ক।

এতিম মানেই অসহায়ত্বের চূড়ামত্ম, এই ভূপৃষ্ঠে এতিম অবস্থাই তাঁর জীবনের শুরম্ন; বস্ত্তগত ক্ষমতার উচ্চতম শীর্ষ হলো বাদশাহী, এই বাদশাহী দিয়েই তাঁর জীবনের  সমাপ্তি।এতিম বালক থেকে উৎপীড়িত মুহাজির এবং তারপর এক মহাসম্রাটরূপে অভিষিক্ত। কি আধ্যাত্মিক কি নশ্বর-জাগতিক সকল ক্ষেত্রেই  মুহাম্মদ(সঃ) একটি জাতির  অবিসংবাদিত অধনায়ক ও ভাগ্যনিয়মত্মা, যিনি সকল পরীক্ষা ও প্রলোভন, জীবনের সব উত্থান পতন ও পরিবর্তন, আতঙ্ক কি উজ্জ্বলতা সবকিছুর মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন জগৎসমক্ষে এক অনির্বাণ দীপশিখা ; এবং তিনি বেরিয়ে এলেন বিজয়ীর বেশে সার্বিক মানবজীবনের অক্ষত অনাহত এক আদর্শরূপে। তাঁর সাফল্য  জীবনের কোন একটি ক্ষেত্রেই কেবল সীমাবদ্ধ নয়, মানবজীবনের  সর্ববিধ ক্ষেত্রেই  তিনি অত্যুত্তম আদর্শ। দৃষ্টামত্মস্বরূপ, নিরঙ্কুশ নৈতিক অন্ধকার ও সর্বপস্নাবী  বর্বরতা থেকে কোন জাতিকে মুক্ত ও পবিত্র করে তোলা যদি মহত্বের একটি পরিচয় বলে বিবেচিত হয, তাহলে মুহাম্মদ (সঃ) অবশ্যই মহৎ। কারণ তাঁর প্রখর ও অনবদ্য ব্যক্তিত্বের স্পর্শই আরবদেরকে অধঃপাতের নিমণতম সত্মর থেকে তুলে এনে পবিত্র পরিশুদ্ধ উন্নত এক মহান জাতিতে পরিণত করলো, যারা উঠে দাঁড়ালো গভীর অন্ধকূপ থেকে শিক্ষা ও সভ্যতার এক আলোকবর্তিকা হাতে। মহত্ব বলতে যদি একটি বহুধাবিভক্ত মানবম-লীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও করম্নণা, প্রেম ও সখ্যের বন্ধনে এক নিবিড় ঐক্যরচনা বোঝায়, উষর মরম্নভূমির বুকে আবির্ভূত এই নবী মুহাম্মদ(সঃ) নিঃসন্দেহে মহত্বের মুকুট  পরিধানের যোগ্য। মহত্বের অর্থ যদি হয় অন্ধ কুসংস্কার ও অহিতকর সকল কর্মধারার সমূল উৎখাত ও সংস্কারসাধন, তাহলে বলতেই হয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের অমত্মর থেকে তিনি নিঃশেষে উৎপাটন করেছিলেন এই কুসংস্কার, এই অলীক ও অতিপ্রাকৃতিক শঙ্কা। যদি বলি, মহত্ব এক উচ্চতর নৈতিক মান তাহলেও স্মরণ করতে পারি , মুহাম্মদ (সঃ) শত্রম্ন মিত্র নির্বিশেষে সবার কাছেই ছিলেন আল-আমীন অর্থাৎ পরম বিশ্বসত্ম ও সত্যবাদী।  যদি ধরা যায়,দেশবিজয়ী কোন রাষ্ট্রনায়কই ’মহৎ’ অভিধায় আখ্যায়িত হবার যোগ্য তাহলে উলেস্নখ করতে পারি, নিতামত্মই করম্নণার পাত্র সহায় সম্বলহীন এতিম অবস্থা থেকে মুহাম্মদ (সঃ) মাথা উঁচু করে  দাঁড়িয়েছিলেন সমুদয় আরবের শাসনদ–র অধিকর্তারূপে; যিনি ছিলেন যুগপৎ খসরম্ন ও সিজরের যে যোগফল তার সমতুল্য, যিনি এমন এক সাম্রাজ্যেও প্রতিষ্ঠাতা যা চৌদ্দ’শ বছর ধরে  এখনও অক্ষত। নেতার প্রতি যে প্রশ্নাতীত আনুগত্য, তাকেও যদি মহত্বেও অভিজ্ঞান বলে বিবেচনা করি, দেখবো এই নবীর নামের মধ্যেই কী ঐন্দ্রজালিক শক্তি ও মহিমা, যা আজো পর্যমত্ম সমগ্র বিশ্বেও কোটি কোটি হৃদয়কে সম্মোহিত ও অভিভূত করে  রেখেছে।  এই নবী মুহাম্মদ (সঃ) এথেন্স কি পারস্য, ভারতবর্ষ কি চীনের  কোন বিদ্যাপীঠে দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়ন করেননি কিন্তু কি বিস্ময়কর, তিনি যা ঘোষণা করলেন তা মানবজাতির জন্য অনমত্মকালের প্রেক্ষাপটে চিরকল্যাণকর এক সহাসত্যের বাণী । নিরক্ষর, কিন্তু তাঁর বাকশৈলীতে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে এমন সৌরভ ও শিল্প ও বাগ্মিতা যা শ্রোতার বিমুগ্ধ চোখ দু’টিকে করে  তোলে অশ্রম্নসজল। জাগতিকভাবেই একেবারেই রিক্ত এক এতিম কিন্তু সকলেরই প্রিয়পাত্র, সবার প্রাণের মণিকোঠায় তাঁর স্থান। তিনি কোন সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেননি, কিন্তু সৈন্যদলকে তিনি ভয়াবহতম অবস্থা, ক্রুরতম বৈরিতার বিরম্নদ্ধেও নিপুণ ও নিভূলভাবে সুবিন্যসত্ম করতে জানেন; এবং তাঁর অধিনায়কত্বে শুধু নৈতিক শক্তি ও দৃঢ়তার কারণে জয়ও পুনঃ পুনঃ করায়ত্ব হয় ।

 মৌলিক প্রকৃতিদত্ত শক্তির অধিকারী এবং সর্বতোভাবে প্রতিভাবান, এমন প্রচারক পৃথিবীতে খুবই বিরল। হিটলারও তাঁর মেইন ক্যাম্পে এই একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন । বলেছেন, ’বড় কোন তাত্ত্বিক খুব কমই একজন বড় মাপের নেতা হতে পারেন। বরং একজন আন্দোলনকারীর মধ্যে এমন সব গুল পরিদৃষ্ট হয় যা তাকে একজন উৎকৃষ্ট নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। কারণ নেতৃত্ব মানে জনগণকে আন্দোলিত ও চালনা  করার শক্তি। অথচ তত্ত্বজ্ঞের মধ্যে সাধারণত নেতৃত্বদানের এই যোগ্যতার বিশেষ স্ফূরণ লক্ষ করা যায়না। তাই একই ব্যক্তির মধ্যে যুগপৎ তাত্ত্বিকতা, সাংগঠনিক শক্তি ও নেতৃত্বদানের ক্ষমতা, এই তিনটি গুণের সার্থক সমন্বয় ঘটেছে এমন মানুষ পৃথিবীতে দুর্লভতম; এবং একেই বলে মহত্ব’।  ধরাপৃষ্ঠে বিচরণশীল একটি রক্তমাংসের মানুষ এই নবী মুহাম্মদ(সঃ) এর মধ্যে পৃথিবী সবিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছে এই দুর্লভতম মহত্ব। এবং আরো বেশি বিস্ময়কর, রেভারেন্ড বসওয়ার্থ স্মিথ যা বলেন, ’তিনি ছিলেন একই সঙ্গে রাষ্ট্র এবং গীর্জা দু’টোরই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, একই সঙ্গে সিজর এবং পোপ । কিন্তু পোপ হয়েও তিনি কখনো পোপের দাবী করেননি; এবং তিনি সিজর বটে কিন্তু সম্পূর্ণ রিক্ত অনাড়ম্বর এক সিজর, যাঁর না ছিল কোন সদাপ্রস্ত্তত সৈন্যবাহিনী, না কোন দেহরক্ষী, না রাজপ্রাসাদ, না কোন নির্দিষ্ট বেতন ভাতা। কখনো কোথাও যদি এমন দাবী করবার মতো কেউ থাকেন যে, তাঁর শাসন ও প্রশাসন সম্পূর্ণরূপে এক অপার্থিব ঐশ্বরিক অধিকারপ্রসূত, তাহলে তিনি মুহাম্মদ (সঃ)। কারণ ক্ষমতার সকল পার্থিব আনষঙ্গিকতা ও ভিত্তি ও সহায়তা ছাড়াই তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী । ক্ষমতার কোন আভরণ তাঁর প্রয়োজন নেই, ক্ষমতার সকল বাহ্যিক জৌলুষমুক্ত তিনি সম্পূর্ণরূপে নিরাভরণ; তাঁর ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক জীবন একই রকম অনাড়ম্বর সরলতার মধ্যে স্থাপিত ও আবর্তিত।

মক্কা জয়ের পর দশলক্ষ বর্গমাইলেরও অধিক এক বিশাল এলাকা তাঁর পদানত, অথচ সমগ্র আরবের একচ্ছত্র অধিপতি এই নবী মুহাম্মদ(সঃ) নিজ হাতে নিজের জুতো ও মোটা পশমের কাপড় সেলাই করছেন, ছাগলের দুধ দোহন করছেন, ঘর ঝাড়ৃ দেয়া, আগুন জ্বালানো ইত্যাদি পরিবারের সব কাজই তিনি করছেন নিজ হাতে। যে মদীনায় তিনি বাস করেছেন, তাঁর জীবনের শেষ দিকে সেই মদীনা হয়ে উঠেছে বিপুলভাবে সম্পদশালী, সর্বত্রই ঐশ্বর্যের ছড়াছড়ি । অথচ এমন প্রাচুর্যের মধ্যেও একাধিক্রমে অনেক  দিন অনেক সপ্তাহ এই সম্রাটের গৃহে কোন উনুন জ্বলেনি, দিন অতিবাহিত হয়েছে শুধু শুকনো খেজুর আর পানি খেয়ে । তাঁর পরিজনদের  উপর্যপুরি অনেক রাত কেটেছে খাদ্যাভাবে অনাহারে ÿুধার্ত অবস্থায় । তিনি কখনো নরম বিছানায় শয়ন করেননি, তাঁর শয্যা ছিল খেজুর পাতার মাদুর । এবং ব্যসত্ম পরিশ্রামত্ম দিনের শেষে তিনি খুব কমই বিশ্রাম গ্রহণ করেছেন। তাঁর অধিকাংশ রাত কেটে যেত নামাজে এবাদতে; আপন স্রষ্টার কাছে কেঁদে কেঁদে শুধু এই শক্তি ও সাহায্য প্রার্থনা করেছেন, যাতে সুচারম্নভাবে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হন।  এবং জানা যায়, তিনি স্রষ্টার কাছে কান্নায় এমনভাবে ভেঙ্গে পড়তেন, কান্নার আবেগে তাঁর কণ্ঠস্বও এমনভাবে রম্নদ্ধ হয়ে যেত, যেন মনে হতো ফুটমত্ম কোন জলপাত থেকে শব্দ উত্থিত হচ্ছে্ ইতিহাস সাÿ্য দেয়, তিনি যেদিন মৃত্যুবরণ করলেন সেদিন তাঁর সম্পদ বলতে ছিল মাত্র কয়েকটি মুদ্রা, যার কিয়দংশ ঋণ পরিশোধ ও কিছু অংশ অভাবী লোকের মধ্যে বিতরণেই নিঃশেষ হয়ে যায়; যে কাপড় পরে  তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সেই কাপড় ছিল বহুস্থানে তালিযুক্ত। এবং যে গৃহ থেকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল আলো সেই গৃহ ছিল অন্ধকার, সেই গৃহে সেদিন তৈলাভাবে কোন প্রদীপ জ্বলেনি।  অবস্থার পরিবর্তন ঘটেঠে কিন্তু মহানবী (সঃ) এর কোন পরিবর্তন নেই। জয়ে কি পরাজয়ে, ক্ষমতায় কি রিক্ততায়, সংকটে প্রাচুর্যে কি দারিদ্রে্য সর্বদা একই মানুষ, চরিত্রের একই প্রকাশ। সত্যই, ঈশ্বরের সকল নিয়ম ও বিধানের মত নবী পয়গাম্বরেরাও অপরিবর্তনীয়।

কথা আছে, একজন সৎ মানুষ ঈশ্বরের মহত্তম সৃষ্টি । মুহাম্মদ (সঃ) ছিলেন সততার সর্বোচ্চ উদাহরণ্ তিনি ছিলেন সর্বাংশে একজন মানুষ ; মানবপ্রেম ও মানুষের জন্য করম্নণা ছিল তাঁর আত্মার সঙ্গীত । মানুষের সেবা, মহত্তর লক্ষ্য মানুষের উত্তরণ, মানুষকে শিক্ষিত পুত পবিত্র করে তোলা – এক কথায় মানুষকে প্রকৃত মানুষে পরিণত করাই ছিল তাঁর আদর্শ, শুরম্ন থেকে শেষ পর্যমত্ম তাঁর সমগ্র জীবনের লÿ্য। এবং কথায় ও কর্মে ও চিমত্মায় সব কিছুতেই তাঁর যে মানবকল্যাণামিতা ও ব্রত, সে তাঁর আত্মা থেকে উৎসারিত প্রেরণা ও আত্মা-নির্দেশিত পথরেখারই বহিঃপ্রকাশ । তিনি ছিলেন সর্বামত্মঃকরণে  সর্বাধিক অনাড়ম্বও ও স্বার্থশূন্য। কিন্তু  কী পরিচয়ে তিনি আখ্যায়িত হতে চেয়েছেন ? প্রথমে আলস্নাহর একজন বান্দাহ(দাস) তারপর পয়গম্বর। এবং তিনি বলেননি, তিনিই একমাত্র পয়গম্বও; বরং বলেছেন, জানা-অজানা আরো অনেক পয়গম্বও পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন। এবং তাঁর এ-সকল কথার কোন একটিতে যদি কেউ অবিশ্বাস  কি সন্দেহ পোষণ করে সে সে আর মুসলমানই থাকেনা, এটা ঈমানেরই একটি অপরিহার্য শর্ত। একজন পশ্চিমী লেখক বলেছেন, ’সমসাময়িক অবস্থা এবং অনুগামীদেও সীমাহীন শ্রদ্ধা ও আনুগত্য দেখে বলা যায়, মুহাম্মদ(সঃ) এর সর্বাপেক্ষা যে অলৌকিকত্ব তা হলো তিনি কখনোই কোন অলৌকিক শক্তির দাবী করেননি’। কিছু অলৌকিকক ঘটনা ঘটেছে কিন্তু তা কাউকে আকৃষ্ট কি প্রভাবিত করার জন্য নয়; সে কৃতিত্ব সম্পূর্ণ আলস্নাহর এবং তা আলস্নাহরই কোন রহস্যময় প্রক্রিয়ার অধীন বলে ঘোষণা  করেছেন তিনি। তাঁর সরল ও সুস্পষ্ট ঘোষণা. তিনিও অন্য সকলের মত একজন মানুষ মাত্র। পৃথিবী কি স্বর্গেও কোন ধনভান্ডার তাঁর হাতে নেই, এবং ভবিষ্যতের গর্ভে কী রহস্য লুকায়িত সে বিষয় ও তাঁর অজানা। এবং এসব কথা তিনি এমন এক সময়ে বলেছেন, যে কালে অলৌকিকত্বের প্রতি বিশ্বাস ও দুর্বলতা একটি সাধারণ ঘটনা, যা এমনকি সাধারণ মানের সাধু পুরম্নষদের ও আয়ত্তাধীন বলে মানুষের ধারণা এবং যে কালে আরব ও আরবের বাইরে  এমন পরিবেশ বিরাজমান, অতিপ্রাকৃত ও অলৌকিক বিশ্বাস যেখানে ঘনবদ্ধ। বরং তিনি তাঁর অনুগামীদের  দৃষ্টি ও মনোযোগ ফিরিয়ে  দিলেন প্রকৃতি ও প্রতৃতিবিজ্ঞানের চর্চা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার দিকে, যাতে তাঁরা প্রকৃতিকে অনুধাবন করতে সক্ষম হন এবং সম্যক উপলব্দি করতে পারেন ঈশ্বরের মহিমা। কোনআন পাক ঘোষণা করছে, ’আকাশ ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যে যা বর্তমান কিছুই তা খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করা হয়নি, সকল সৃষ্টির মধ্যেই নিহিত রয়েছে এক পরম সত্য কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা অনুধাবন করেনা’। পৃথিবী অলীক ও অর্থহীন নয় ; এই সৃষ্টির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত এক গভীর  সত্য ও তাৎপর্য দ্বারা ম–ত।

উলেস্নখযোগ্য, পবিত্র কোরআন শরীফে প্রকৃতিবজ্ঞিানের চর্চা ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের দিকে আহবান জানিয়ে যত বাক্য নাজিল হয়েছে, তার সংখ্যা নামাজ রোজা হজ্জ ইত্যাদি বিষয়ে প্রত্যাদিষ্ট বাক্যসমূহের যোগফল থেকে কয়েকগুণ বেশি। এবং এই প্রভাব হেতুউ মুসলমানদের  হাতে এমন এক বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা নিরীক্ষা ও গবেষণার সূত্রপাত ঘটলো যা গ্রীকদের নিকট ছিল অজ্ঞাত। ইবনে বাইতার নামে একজন মুসলিম উদ্ভিদবিজ্ঞানী পৃথিবীর  নানা প্রামত্ম থেকে সংগৃহীত উদ্ভিদ নিয়ে এমন এক গ্রন্থ রচনা করেন যাকে অতুলনীয় বলে মেয়ার তাঁর  ‘Gesh der Botanicca-s’   গ্রন্থে উলেস্নখ করেছেন। অন্যদিকে  আলবিরম্ননী দীর্ঘ চলিস্নশ বছর ধরে  দেশে দেশে ভ্রমণ করেন শুধু নানা প্রকার খনিজধাতুর নমুনা সংগ্রহের জন্য ;  এবং মুসলিম জ্যোতির্বিদরাও গবেষণকর্মে যে দীর্ঘ অখ- সময় ও শ্রম নিবেদন করেন তা স্মরণযোগ্য। অথচ  এ্যারিস্টটল পদার্থবিজ্ঞানের উপর বই লিখেছিলেন কিন্তু জীবনে তিনি একবারও কোন বিষয় পরীক্ষা করে  দেখেননি। তিনি প্রাকৃতিক ইতিহাস নিয়েও  লিখেছেন কিন্তু লিখেছিলেন খুবই অসতর্কভাবে; এইটুকু যাচাই করবার কষ্টও স্বীকার করেননি যে, অন্য প্রাণীদের  তুলনায় মানুষের দমত্মসংখ্যা সত্যই বেশি না কম । গ্যালেন, যিনি ধ্রম্নপদী শবব্যবচ্ছেদ বিদ্যার শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ বলে স্বীকৃত, বলেছিলেন মানুষের নীচের যে-চোয়াল তা দু’টি অস্থি দ্বারা গঠিত;এবং এই ধারণাই বহু শতাব্দী ধরে  প্রামাণ্য বলে গৃহীত হয়ে আসছিল। কিন্তু আবদুল লতীফ নামে একজন মুসলিম বিজ্ঞানী যখন নরকঙ্কাল নিয়ে সরাসরি পরীক্ষা করে  দেখলেন, পৃথিবীর  ভুল ভাঙ্গলো। এই ধরনের বহু দৃষ্টামত্ম থেকে রবার্ট  প্রিফল্ট তাঁর বিখ্যাত ’The Making of Humanity’ গ্রন্থে এই সিদ্ধামেত্ম উপনীত হন যে, ’আমাদের  যে বিজ্ঞান, আরবদেও কাছে তার ঋণ কেবল বিষ্ময়কর কিছু আবিষ্কার ও বিপস্নবাত্মক তত্ত্বের  মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, নেই ঋণ আরো গভীর ও অপরিমেয়। বিজ্ঞান তার অসিত্মত্বেও প্রশ্নেই আরবদের  কাছে ঋণী’। এবং এই রবাল্ট প্রিফল্ট আরো বলেন-তত্ত্বীয় নিয়মমালা রচনা , নানা বিভাগে জ্ঞানের সুবিন্যাস ও শ্রেণীকরণ এ-সব গ্রীকদের অবদান কিন্তু কেলশসাপেক্ষা অধ্যবসায়ী অনুসন্ধান, জ্ঞানের প্রত্যক্ষ উপাদান সমূহের সংগ্রহ ও একত্রীকরণ, দীর্ঘ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ,গবেষণা, পরীক্ষা-নীরিক্ষা এ-সবই ছিল গ্রীকদের  স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত্ আসলে আমরা যাকে বিজ্ঞান বলে জানি-পরীক্ষা নিরীক্ষা ও  গবেষণার নবতর পদ্ধতি,পর্যবেক্ষণ, পরিমাণ, অঙ্কশাস্ত্রেও উন্নয়ন ইত্যাদিও মধ্য দিয়ে যে ইউরোপীয় আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশ, তা গ্রীকদের  অজ্ঞাত ছিল। প্রকৃতপক্ষে সমগ্র ইউরোপে বিজ্ঞানচর্চায় এই বোধ ও প্রবণতা, এই ধরনের গবেষণা-পদ্ধতি প্রথম সূচিত হয়েছে আরবদের  দ্বারা। এবং মুহাম্মদ(সঃ) এর শিক্ষাপ্রসূত এই একই বাসত্মব চারিত্র্য, নবতর বিজ্ঞান-চেতনার যেমন জন্ম দিয়েছে তেমনি তথাকথিত পার্থিব ও প্রাত্যহিক  ক্রিয়াকর্মকেও নতুনভাবে মহিমান্বিত করেছে। কোরআন ঘোষণা করছে, আলস্নাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর এবদাতের জন্য। কিন্তু ইসলামে এই ’ইবাদত’ কথাটি একটি বিশেষ তাৎপর্যে ম–ত। এবদতকেবল উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, আলস্নাহর সন্তুষ্টিলাভের জন্য ও মানবকল্যাণে কৃত সব কাজই এবদত বলে গণ্য । ইসলাম মানুষের জীবন ও কর্মধারাকে অতি পবিত্র বলে ঘোষণা করে , যদি তার সুবিচার ও সততা ও সৎ নিয়তের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় । পাপপূণ্যের যে বহু শতাব্দী-বাহিত ভেদরেখা ইসলাম তা মুছে দিয়েছে। কোরআন বলে , তুমি যদি হালাল খাদ্য খাও  এবং আলস্নাহর শোকর কর সেটাও এবাদত। মুহাম্মদ (সঃ) এর হাদীস-কেউ যদি তার স্ত্রীর মুখে এক টুকরো খবার তুলে দেয় সেটাও একটি পূণ্যেও কাজ, আলস্নাহ যার পুরস্কার প্রদান করবেন। অপর একটি বর্ণনামতে রাসূল(সঃ) বলেছেন,’কেউ যদি তার আপন অমত্মরের আকাঙক্ষা-বাসনাকে পূর্ণ করে , তার জন্যও সে পুরস্কৃত হবে; শর্ত এইটুকু যে তার ইচ্ছাপূরণের উপায় হবে বৈধ’। এই কথায় একজন উপস্থিত শ্রোতা বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, হুজুর, সেই ব্যক্তি-তো আসলে প্রবৃত্তির ডাকে সাড়া দিয়ে নিজ বাসনাইে তৃপ্ত করলো। সঙ্গে সঙ্গে মুহাম্মদ(সঃ) জবাব দিলেন-’মনের কোন কামনাকে অন্যায় পথে পূর্ণ করার জন্য কউ যদি শাসিত্ম পায় তাহলে ন্যায় ও বৈধ পথে পূর্ণ করলে পুরস্কৃত হবেনা কেন’। পার্থিব সংশ্রবশূন্যতা জীবনের মহিমাকে উচ্চে তুলে ধরার এই-যে ধর্মেও এক নবতর ধারণা, এই ধারণই সৃষ্টি করলো নৈতিক মূল্যবোধের  ক্ষেত্রে এক নয়া মেরম্নকরণ । প্রাত্যতিক ও পারস্পরিক মানবসম্পর্কেও উপর ধর্মেও এ-যে গভীর প্রভাব,সর্বমানবচরিত্তের উপর তার এই-যে শক্তিশালী কার্যকারিতা, দায়িত্ব ও অধিকারবোধের এই-যে ধারণা ও সীমারেখা এবং একই সঙ্গে সুবিজ্ঞ দার্শনিক প্রাজ্ঞতা ও শিক্ষাদীক্ষাহীন অজ্ঞ মানসপট, উভয়ত একটি ধর্মেও এইযে একই রকম উপযোগিতা ও গ্রহণযোগ্যতা, এটা ইসলামের এই নবী প্রবর্তিত শিক্ষার একটি বড় বৈশিষ্ট্য।

 অবশ্য এটাও বিশেষ সর্ততার সঙ্গে মনে রাখার আবশ্যক যে, সৎকর্ম সমূহের উপর জোর ও গুরম্নত্ব প্রদানের যে-অর্থ, তা কিন্তু কোনক্রসেই বিশ্বাস বা ঈমানের  শৈথিল্যকে প্রশ্যয় দেয়না । দেখতে পাই চিমত্মার ক্ষেত্রে নানা ধরনের দার্শনিক মতবাদ। কোথাও কর্মের তুলনায় বিশ্বাসকেই বড় বলে বিবেচনা করা হয়, আবার কোথাও কর্মই বড়। কিন্তু ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে, খাঁটি বিশ্বাস ও তদানুযায়ী সৎকর্মানুষ্ঠন এই দুটোরই উপর। এখানে লÿ্য  বাং লÿ্য অর্জনের পথ দু’টোই সমান গুরম্নত্বপূর্ণ। দুইয়ে মিলে্ট এমন এক সুসংবদ্ধ ঐক্যেও গ্রন্থনা যা্কত্রে খুবই প্রাণবান ও কার্যকর ও সমৃদ্ধি সঞ্চারক ; কিন্তু পরস্পর বিচ্ছিন্নতা মানেই উভয়ের ক্ষয় ও মৃত্যু।  ইসলামের বিশ্বাস কখনো কর্ম থেকে আলাদা নয় । সঠিক ফলাফলের লক্ষ্য সঠিক বিশ্বাস এখানে রূপলাভ করে  সঠিক কর্মসাধনে। কোরআন শরীফে কত পুনঃ পুনঃই না ব্যক্ত হয়েছে এই কথা ’যারা বিশ্বসী ও সৎকর্মশীল একমাত্র তারাই প্রবেশ করবে জান্নাতে’। পঞ্চাশবারের কম নয়, পুনঃ পুনঃ এই একই  কথার এমন পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে যেন বিষয়টির প্রতি সম্যক গুরম্নত্বপ্রদানে ভুল না হয় ।ধ্যাননিমগ্ন উপাসনাকে উৎসাহিত করা হয়েছে সত্য, কিন্তু সেই উপাসনা কোন প্রকৃত লÿ্য কি গমত্মব্য নয়। কর্মের সাথে সম্পর্কহীন কোন বিশ্বাসীর স্থান ইসলামে নেই ; এবং যারা বিশ্বাসী অথচ অন্যায়কর্মে লিপ্ত এমন ব্যক্তির কথা ইসলামে অচিমত্মনীয়। কারণ ঐশ্বরিক যে বিধান, তা নিছক বিশ্বাস কি আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়,তা কার্যকারণের সাথে সম্পর্কিত। এই বিশ্বাস মানুষের অনমত্মযাত্রায় এমন এক পথরেখা নির্দেশ করে , যেখানে জ্ঞান থেকে কর্ম এবং কর্ম থেকে সাফল্যের পরিপূর্ণ তৃপ্তিলাভ সম্ভব হয় । কিন্তু কী সেই খাঁটি বিশ্বাস যা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সঠিক আমল পূর্ণতম সাফল্যেও দিকে ধাবিত হয়? ইসলামী বিশ্বাসের যে প্রাণকেন্দ্র তাহলো আলস্নাহর একত্ব। এক আলস্নাহ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, এই বিশ্বাসই কেন্দ্রবিন্দু, যা ইসলামের সকল শিক্ষা সাধনাকে ধারণ করে আছে। এবং তিনি (আলস্নাহ) কেবল তাঁর ঐশ্বরিক ও অবিনশ্বর  অসিত্মত্বের  কারণে নয় , উৎকৃষ্ট অনুপম গুণাবলীর কারণেও মহিমময়। এবং অন্য অনেক ক্ষেত্রে যেমন, আলস্নাহর গুণাবলী সম্পর্কে ইসলাম গ্রহণ করেছে সঠিক মধ্যপন্থা। আলস্নাহর উৎকৃষ্ট ও মহত্তম গুণসমূহ বিস্মৃত থাকা যেমন ইসলাম অনুমোদন করেনা, তেমনি অন্যদিকে এমন ধারণাও প্রত্যাখান কওে, যা তাঁকে বস্ত্তগত বিষয়বুদ্ধিও সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে। কোরআন একদিকে ঘোষণা করে-সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে তুলনা হয় এমন কিছুই নেই এবং অন্যদিকে এইকথাও বলে যে, তিনি সর্বদর্শী ও সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ । কিছুই নেই, যা তাঁর জানশোনার বাইরে। তিনি এমন এক সহাসম্রাট যিনি সকল ত্রম্নটি ও অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র ও নিষ্কলুষ । তাঁর অসীম ক্ষমতার অপরাজেয় জলপোত সততই সাম্য ও সুবিচারের মহাসমুদ্রে ভাসমান। তিনি করম্নণাময় ও দয়ালু ; তিনিই সবার প্রতিপালক ও অভিভাবক । এবং আলস্নাহ সম্পর্কে ইসলাম শুধু এই সকল ইতিবাচক বর্ণনা দিয়েই ক্ষান্ত হয়না; বিপরীত দিকে থেকেও ইসলামের বক্তব্য অত্যমত্ম সুস্পষ্ট। ইসলাম বলে, আলস্নাহই একমাত্র অভিভাবক, তিনি ছাড়া কারো আর কোন অভিভাবক নেই ; যে-কোন ধ্বংসের তিনিই একমাত্র সংশোধক ও ত্রাতা, তিনি ব্যতীত দ্বিতীয় কোন ত্রাতা কি মেরামতকারী নেই ; সকল ক্ষতির তিনিই নিরাময়কারী এবং তিনি ছাড়া এমন কেউ নেই যে ক্ষতিপূরণ করতে পারে। তিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, তিনি অভাবমুক্ত, তিনি শরীর ও আত্মার সৃষ্টিকর্তা, বিচারদিবসের মহাপ্রভু, এককথায় কোরআনের ভাষ্যানুযায়ী সকল মহত্তম উৎকৃষ্টতম গুনাবলীর তিনি আধার।

কিন্তু বিশ্বজগতের প্রেক্ষাপটে মানুষের কী অবস্থান ? কী তার মর্যাদা ও পরিচয় ? কোরআন বলে, ’বিশ্বজগতের যা-কিছু তা সবই মানুষের সেবায় নিয়োজিত’। সমগ্র বিশ্বব্রহ্মা- মানুষেরই শাসনাধীন। কিন্তু  মানুষকে নিয়ে সৃষ্টিকর্তার কী অভিপ্রায় ? এই প্রেক্ষিতে কোরআন শরীফে আলস্নাহ বলেন, ’হে মানুষ , আলস্নাহ তোমাকে সর্বোৎকৃষ্ট গুণাবলসহ সৃষ্টি করেছেন, দান করেছেন জীবন ও মৃত্যু কিন্তু এ-সবই পরীক্ষার নিমিত্ত ; দেখা হবে, কে সৎকর্মশীল আর কে পথভ্রষ্ট’। মানুষ যদিও কিছু পরিমাণে স্বাধীন ইচ্চশক্তির অধকারী কিন্তু প্রত্যেকেরই জন্ম ও জীবন এমন একটি পূর্বনিধারিত ও সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও পরিবেশের অধীন যার উপর তার কোন নিয়নত্রণ নেই। এবং এই প্রেক্ষিতেইসলামে দেখতে পাই, আলস্নাহর ঘোষণা হলো-সবকিছু আমার ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণাধীন, আমি যা ভালো মনে করি সেটাই মানুষের নির্বন্ধ। মানুষের অস্থায়ী নশ্বরতার সঙ্গে মিলিয়ে এই মহাজাগতিক রহস্যময় পরিকল্পনা পুরোপুরি উপলব্ধি করা কঠিন, কিন্তু এটা সত্য যে, সম্পদে কি দারিদ্রে্য, স্বাস্থ্যে কি রম্নগ্নতায়, উত্থানে-পতনে আমি অবশ্যই মানুষকে পরীক্ষা করে  দেখবো । নানা সময়ে নানা মানুষে এই পরীক্ষার ধরন ভিন্ন কিন্তু কোন সংকটেই তোমরা অধৈর্য কি হতাশাগ্রসত্ম হয়োনা এবং অবলম্বন করোনা কোন অবৈধ পন্থা। এটা এক ক্রামিত্মকাল। ঐশ্বর্যে তোমরা আলস্নাহকে বিস্মৃত হয়োনা; মনে রেখো, আলস্নাহর সকল নেয়ামতের তোমরা বিশ্বসত্ম আমানতদার। তোমরা সততই পরীক্ষাধীন; প্রতিটি মুহূর্তে চলছে তোমদের  পরীক্ষা। পার্থিব জীবনের এই  নশ্বও অধ্যায়ে এই পরীক্ষার কোন ছেদ নেই, এবং এমন প্রশ্ন উত্থাপনেরও কোন অবকাশ নেই যে, কেন এই পরীক্ষা ? মনে রেখো, তোমার জীবন ও মৃত্যু আলস্নাহরই জন্য।

অবশ্য কেউ কেউ এটাকে অদৃষ্টবাদ বলতে পারে। কিন্তু এই ধরনের অদৃষ্টবাদ মানুষের জন্য শক্তিবর্ধক ও কর্মোদ্দীপক এবং সর্বদা সতর্কতা রক্ষারও সহায়ক। পৃথিবীর এই ক্ষণস্থায়ী জীবন মানব-অসিত্মত্বের শেষ কথা নয়; মৃত্যুর পর অন্য এক অনমত্ম জীবন অপেক্ষমান। এই জীবন এই মৃত্যু একটি দ্বার, একটি মধ্যবর্তী যোজকাত্র, যা অনমত্ম জীবনের এক অদৃশ্য বাসত্মবতাকে উন্মোচন করে । যত ÿুদ্র কি তুচ্ছই হোক প্রতিটি কর্মই রচনা করে এক-স্থায়ী অভিঘাত ; এবং এই কর্মেও সঠিক হিসাবও কোননা কোন উপায়ে নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত। আলস্নাহর রহস্যময় প্রক্রিয়ার কিছু সামান্য বুঝা গেলেও অধকাংষই মানববুদ্ধির  অগম্য। আজ যা কিছু মানুষের দৃষ্টিসীমার বাইরে  রাখার হয়েছে তা সবই একদিন উন্মোচিত হবে। এবং তখন যারা পূণ্যবান তারা আলস্নাহ পাকের এমন করম্নণা ও পুসস্কারলাভে ধন্য হবে, যা কোন চÿু কখনো দর্শন করেনি, কোন কর্ণ কখনো শ্রবণ করেনি এবং কোন হৃদয়ও কখনো করেনি। তারাই পর্যায়কমে উত্তীর্ণ হবে উচ্চ থেকে উচ্চতর অবস্থানে। কিন্তু জীবনে প্রাপ্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে যারা ব্যর্থ হয়েছে, এক অনিবার্য নিয়মে তারা তাদের প্রতিফল পাবে ; তারা এমন এক কঠিন আত্মিক শাসিত্মর মধ্যে নিপতিত হবে, যা তাদেরই নিজস্ব উপার্জন। এ-এক ভয়াবহতম অগ্নিপরীক্ষা। দৈহিক যন্ত্রণা তবুতো কোনভাবে সহনীয় কিন্তু আত্মক যন্ত্রণা অসহ্য। যে ইচ্ছা ও প্রবণতা অন্যায় কর্মে প্রবৃত্ত করে , তার বিরম্নদ্ধে নিরমত্মর সংগ্রামের জন্যই এই জীবন। এবং এই পথেই জেগে ওঠে জাগতিক মোহমুক্ত বিবেকের উপলব্ধি ; এই পর্যায়েই আত্মা তার পারমার্থিক উৎকর্ষতা লাভের জন্য হয়ে ওঠে ব্যাকুল ও বর্সপ্রকার আত্মবিনাশী অপশক্তিার বিরম্নদ্ধে বিদ্রোহ।। এবং এইভাবেই সেই চূড়ামত্ম পর্যায়ে উত্তরণ, যেখানে আত্মা লাভ করে অবিচল স্থৈর্য, স্রষ্টার তৃপ্তিময় নৈকট্য, অনমত্ম আলোকময় শামিত্ম। আত্মার সম্মুখে আর কোন প্রতিরোধ নেই, সংগ্রামের দিস শেষ ; সত্য হয়েছে জয়ী, মিথ্যা পরাভূত। সকল সংকট ও জটিলতা ও আত্মবিভক্তির অবসান।

মানুষের সম্পূর্ণ সত্তা আলস্নাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পিত, পরম আনুগত্যের মধ্যে বিলীন ও একাকার। সমসত্ম সংগুপ্ত শক্তির উন্মোচন,আত্মার স্থিতি তখন এক পরম শামিত্মর আলয়ে। আলস্নাহ তখন বলবেন, ’হে পূণ্যাত্মাগণ এই সেই নিরবিচ্ছিন্ন শামিত্ম, প্রভুর কাছে প্রত্যাবর্তনের এই সেই পূর্ণতম শামিত্ম ও পরিতৃপ্তি। তোমরা আজ আনন্দিত, তোমদের প্রভুও সন্তুষ্ট, আমার অনুগত বান্দাদের  অমত্মর্ভুক্ত হও এবং প্রবেশ করো জান্নাতে’। মানবজীবনের এই হলো চূড়ামত্ম গমত্মব্য। একদিকে বিশ্বজগতের উপর তার আধিপত্য অন্যদিকে মহাপ্রভুর নৈকট্যের  মধ্যে তার স্থিতি ও প্রশামিত্ম । এই পর্যায়ে প্রভুর সন্নিধানে সেও আনন্দিত প্রভুও আনন্দিত। এখানেই পরিতৃপ্তি, পূর্ণতম পরিতৃপ্তি’ প্রশামিত্ম, পূর্ণতম প্রশামিত্ম। এবং এই পর্যায়ে স্রষ্টার প্রতি প্রেমই তার আত্মার খাদ্য এবং জীবনের গভীরতম সত্মর থেক উৎসারিত সলিল তার তৃষ্ণা-নিবারক পানীয়।দুঃখ কি পরাজয় তাকে আর বিচলিত করেনা এবং সাফল্যও করেনা গর্বিত কি উলস্নসিত। বলতে হয়, পশ্চিমা জাতিসমূহ আজ শুধু মহাজাগতিক প্রভুত্ববিসত্মারে  সচেষ্ট কিন্তু তাদের  আত্মা বড় অস্থির ও অশামত্ম ও তৃপ্তিহীন। এবং ইসলাম প্রদর্শিত জীবনের এই  দার্শনিকতায় অভিভূত টমাস কার্লালাইল লিখেছেন-’এবং তারপরও ইসলাম, স্রষ্টার কাচে আমাদের  সবাইকে সমর্পন করতেই হবে, আমাদের সমসত্ম শক্তি তাঁরই চরণে নিবেদিত। মৃত্যু হোক কি মৃত্যুর চেয়ে গুরম্নতর কিছু হোক, তিনি যা করেন, আমাদের  জন্য যা প্রেরণ করেন তা সবই কল্যাণকর ও উত্তম। স্রষ্টার পদপ্রামেত্ম নিজেজে নিঃশেষে নিবেদন করাই আমার কাজ’।এই লেখক একই সঙ্গে আরো উলেস্নখ করেন, ’গ্যেটে যে-কথা বলেছেন, একে যদি ইসলাম বলে, আমরা কি সবাই ইসলামের মধ্যে সম্পৃক্ত হয়েই বেঁচে নেই’। গ্যেটের এই প্রশ্নের জবাবে কার্লাইল নিজেই আবার বলেন-’অবশ্যই। কোন সন্দেহ নেই যে আমাদেও জীবন ইসলামের মধ্যেই নিমজ্জিত ও পরিক্রমারত। এবং এই মানব-অধ্যুষিত ধরাপৃষ্টে স্বর্গ থেকে অবতীর্ণ ও প্রকাশিত যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, এখনো পর্যমত্ম ইসলামই তার সর্বোচ্চ শীর্ষদেশ’।

অনুবাদঃ আবু জাফর

 

মূল  English Article টি পড়তে ক্লিক করুন   এখানে

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s