বাংলা প্রথম পত্র (১০ম)

রফিকের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি স্কুলে পড়ছে। রফিক বিদেশি গান-বাজনা বেশি পছন্দ করেন। কথাও বলেন ইংরেজিতে। অন্যেরা তাঁর সঙ্গে ইংরেজিতে তাল মেলাতে না পারলে তাদের তিনি অবজ্ঞা করে বলেন, ‘তোরা তো এখনো বাঙাল-ই রয়ে গেলি’। রফিকের মা প্রায়ই ছেলেকে বলেন, ‘তোর সঙ্গে কথা বলে সুখ নাই।’
ক. ‘বঙ্গবাণী’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?
খ. ‘হিন্দুর অক্ষর’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
গ. ‘তোরা তো এখনো বাঙাল-ই রয়ে গেলি’- —উক্তিটির মাধ্যমে রফিকের যে মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়, সে সম্পর্কে কবির অভিমত ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘তোর সঙ্গে কথা বলে সুখ নাই’- —রফিকের মায়ের এ উক্তি কবির মানসিকতাকেই সমর্থন করে ‘বঙ্গবাণী’ কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ করো।
১ (ক) নং নম্বর প্রশ্নের উত্তর:
‘বঙ্গবাণী’ কবিতাটি ‘নূরনামা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

১ (খ) নং নম্বর প্রশ্নের উত্তর:
‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় হিন্দুর অক্ষর’ বলতে বাংলা ভাষাকে বোঝানো হয়েছে।তত্কালীন সময়ে এদেশের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি। ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন কিছু রক্ষণশীল গোঁড়া মুসলমান তাই তাদের মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে আরবি-ফারসির প্রতি গভীর অনুরাগ দেখাতে থাকে। কূপমণ্ডুকতার কারণে তারা মনে করত, কোরআন-হাদিসের ভাষা আরবি। কাজেই আরবি-ফারসি ভাষা ছাড়া আল্লাহ-রাসুূলের সান্নিধ্য লাভ সম্ভব নয়। তা ছাড়া এদেশের প্রাচীন অধিবাসী ছিল হিন্দু এবং তাদের ভাষা ছিল বাংলা। আর বাংলা বর্ণমালাগুলো এসেছে ব্রাহ্মীলিপি থেকে রূপান্তরিতভাবে, যা হিন্দুদের তৈরি করা। ফলে মুসলমান হয়ে এ ভাষাকে ভালোবাসা সম্ভব নয়। ফলে তারা ভাষাকে অবজ্ঞা করে হিন্দুর অক্ষর বলত।

১ (গ) নং নম্বর প্রশ্নের উত্তর:
‘তোরা এখনো বাঙাল-ই রয়ে গেলি’—এ উক্তির মাধ্যমে রফিকের স্বদেশ ও স্বভাষার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে।‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় কবি আবদুল হাকিম মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি চরম ক্ষোভ ও ধিক্কার প্রদর্শন করেছেন। কবির মতে, যারা এদেশে জন্মগ্রহণ করে, এদেশের আলো-বাতাসে বড় হয়ে ভিনদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরক্ত এবং মায়ের মুখের ভাষার প্রতি উন্নাসিকতা দেখায়, তারা শিকড়হীন, পরগাছা। কবি মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগহীন সেসব পরগাছাকে দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যেতে বলেছেন। আর মাতৃভাষাকে যারা অবজ্ঞা করে বা ঘৃণার চোখে দেখে, কবি তাদের জন্ম পরিচয় সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেছেন। কবির ভাষায়, ‘যেসবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সেসবে কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’আলোচ্য উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই, রফিক এদেশের সন্তান হয়েও বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মোহাচ্ছন্ন। কথা বলা, গান শোনা থেকে শুরু করে সকল আচার-আচরণেও তাঁর ভিনদেশি আবহ। শুধু তা-ই নয়, নিজের সন্তানদেরও তিনি বিদেশি ভাষার প্রতি অনুবাগী অনুরাগী করে তুলছেন। ইংরেজির প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধ। তার সঙ্গে ইংরেজিতে তাল মেলাতে না পারলেই তিনি অবজ্ঞার সুরে বলেন, ‘তোরা এখনো বাঙাল-ই রয়ে গেলি।’ তাঁর সামগ্রিক আচরণে স্বদেশ, স্বভাষা এবং স্বজাতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। আর এ মানসিকতার ধারক ও বাহকদের কবি চরম ধিক্কার দিয়েছেন।

ঘ. ‘তোর সঙ্গে কথা বলে সুখ নাই’—রফিকের মায়ের এ উক্তি কবির মানসিকতাকেই সমর্থন করে ‘বঙ্গবাণী’ কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ করো।

১ (ঘ) নম্বর প্রশ্নের উত্তর:
‘তোর সঙ্গে কথা বলে সুখ নাই’ নাই’—রফিকের মায়ের এ উক্তি কবি আবদুল হাকিমের মানসিকতাকেই সমর্থন করে। আর এ উক্তির মাধ্যমে নিজ ভাষার প্রতি রফিকের মায়ের গভীর মমত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছে।বস্তুত: মাতৃভাষা আমাদের অনুভূতি প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। আমাদের মনের বহু বর্ণিল অনুভূতিগুলো নিঃসীম আকাশে পাখা মেলতে পারে মাতৃভাষার মাধ্যমেই। আর সে অনুভূতিগুলো অনায়াসে অন্যের কাছে বাঙ্ময় হয় মাতৃভাষাতেই। কিন্তু অন্য ভাষায় সহজাত সে বোধ ও বিশ্বাস প্রকাশ দুরূহ এবং অন্যের কাছেও তা দুর্বোধ্য। দেশের সাধারণ মানুষের মতো রফিকের মা-ও বিদেশি ভাষা বোঝেন না। তাই তাঁর ছেলে তাঁর সঙ্গে বাংলা ভাষাতেই কথা বলুক, তিনি তা-ই আশা করেন। রফিক কথা-বার্তা, চাল-চলন এবং আচার-আচরণে সম্পূর্ণভাবে ইংরেজির প্রতি মোহাচ্ছন্ন এবং মাতৃভাষার প্রতি উন্নাসিক। মায়ের সঙ্গেও তিনি ইংরেজিতে কথা বলেন। কিন্তু মা তা বুঝতে পারেন না। তাই রফিকের এ আচরণে মা মারাত্মকভাবে হতাশ হয়ে বলেছেন- , ‘তোর সঙ্গে কথা বলে সুখ নাই’।’ আসলে এ উক্তির মাধ্যমে রফিকের মায়ের মাতৃভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং মাতৃভাষা বিদ্বেষীদের প্রতি শ্লেষাত্মক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় আবদুল হাকিম বলেছেন, দেশি ভাষা তথা মাতৃভাষা সকলের বোধগম্য। সাধারণ কথোপকথন হোক আর কাব্যসাধনা হোক, মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করলে তা অনায়াসে প্রকাশ করা যায় এবং অন্যের কাছে তা সহজবোধ্যও হয়। কবির মতে, স্রষ্টা সর্বজ্ঞ এবং সর্বজ্ঞাত। তাঁকে ডাকার জন্য বিশেষ কোনো ভাষার দরকার নেই। তিনি সব ভাষাই বোঝেন। আর প্রত্যেক ভাষাই নিজ নিজ ভাষাভাষীদের কাছে পবিত্র আমানত। তাই তো কবি আরবি-ফারসির প্রতি কোনো রাগ বা বিদ্বেষ পোষণ করেননি। তবে মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি প্রবল ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। তাদের জন্ম পরিচয় সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেছেন। কিন্তু রফিকের মায়ের অনুভূতিতে কবির মতো তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ পায়নি। হয়তো মা হিসেবে সন্তানের প্রতি এ জাতীয় আচরণ শোভন ও সম্ভব নয়।তার পরও সর্বোপরি রফিকের মায়ের এ মানসিকতাতেই আবদুল হাকিমের স্বদেশ ও স্বভাষার প্রতি পরম মমত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s