Why Hazarat Mohammad (SM) is the greatest?

তুমি সুন্দর, তুমি সুন্দরতম

মহানবী (সাঃ) কে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আপনি উত্তম স্বভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত’ ‘সত্যপথের উপর অবিচলভাবে দন্ডায়মান’। বলা হয়েছে, ‘রসুল তোমাদেরকে যা প্রদান করেন তা গ্রহণ করো, যা নিষেধ করেন তা-থেকে বিরত থাকো। তিনি ‘রাহমাতুল্ লিল আলামীন’ বিশ্বজগতের জন্য অনুগ্রহ,তিনি সর্বোত্তম আদর্শ ‘উসওয়াতুল হাসানা’। হাভার্ড কি অক্সফোর্ড সনদ নয়, নয় কোন নোবেল কমিটির চা-চক্রপসূত অভিজ্ঞানপত্র- মহানবী (সাঃ) কে এই পরিচয়ে অভিনন্দিত করেছেন বিশ্বস্রষ্টা স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন; এবং সেই্ আল্লাহ্ পাক যিনি ‘আহকামুল হাকিমীন’ শ্রেষ্ঠতম বিচারক। এবং আল্লাহ্ পাক যেহেতু সর্বপ্রকার সীমাবদ্ধতা ও পক্ষপাতিত্ব থেকে পবিত্র- তাঁর বিচার অভ্রান্ত, তাঁর সিদ্ধান্ত নির্ভুল, তাঁর প্রদত্ত সার্টিফিকেট তর্কাতীত। আর যেহেতু আল্লাহ্ পাকের পক্ষ থেকে অবিসংবাদিতরূপে উচ্চারিত এই বিশেষণ ও অভিজ্ঞান, সন্দেহের কোন অবকাশ নেই; নেই এইজন্য যে, আল্লাহ্ যেহেতু স্বয়ং বলেছেন, অতএব তা বিশ্বাসীদের কাছে অকাট্য ও প্রশ্নাতীত। আল্লাহ্ বলেছেন, সেটাই বড় প্রমাণ, এক্ষেত্রে এবং আল্লাহ্ কর্তৃক প্রেরিত যে কোন বক্তব্যের ক্ষেত্রে কোনরূপ সংশয়ের ক্ষীণতম রেখাও যদি জেগে উঠে, সেই ঈমানের একটি বড় বিপর্যয়। তবূ কেউ যদি মনে করেন, বিশেষণসমূহ যথার্থই ষোল-আনা খাঁটি কিনা, যথাপাত্রে আরোপিত কিনা তা যাচাই করা আবশ্যক্, তিনি তা অবশ্যই সর্বতোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

আল্লাহ্ পাক বলেছেন, মহানবী (সাঃ) উত্তম স্বভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং সত্যপথের উপর অটুট ও অবিচল। কতিপয় অজন্ম ও জাহান্নামীদের কথা আলাদা, কিন্তু এটাই সত্য যে, বহু অনুসন্ধান ও গবেষণা করেও এমন একটি সুক্ষতর ত্রুটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা এই মহামানবের মানবিক স্বভাবের মহত্বকে কণামাত্রও অবনমিত করে। এবং তাঁর স্বভাবের উৎকর্ষতা এতই প্রশ্নাতীত যে, পারমাণবিক মাইক্রোস্কোপ দিয়েও একটি খুঁত আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। তাঁর শত্রুমিত্র কি সার্বক্ষণিক সহচর সবাই দেখেছে-মানবস্বভাবের যে-অভিব্যক্তি সর্বাধিক সর্বোত্তম, সর্বতোভাবে যথাযথ এবং সর্বাপেক্ষা অধিক সৌন্দর্য ও সুষমাময় তারই উজ্জ্বলতম প্রতিফলন তাঁর কথা ও কাজ ও আচরণ। এবং তাঁর পুরো জীবন, একেবারে তুচ্ছতম খুঁটিনাটি কর্মসমুহসহ, এমন একশ,ভাগ সত্য ও সৌন্দর্যের নিখুঁত প্রতিবিম্ব যে, আল্লাহ্ পাক যদি ঘোষণা নাও করতেন, পৃথিবীর মানুষই তাঁকে এই অভিধায় বিভূষিত করত যে, মোহাম্মদ (সাঃ) নিঃসন্দেহে চিরকালীন বিশ্বের কাঙ্খিত কিন্তু কল্পনাতীত উৎকর্ষতা ও সত্যের অদ্বিতীয় বাস্তব দৃষ্টান্ত। আল্লাহ্ পাক দ্ব্যর্থহীন ও সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, কিন্তু তিনি যদি নীরবও থাকতেন, মানুষ নিজেই বলতো, বার বার বলতো-‘এমন আর হয়না, হওয়া সম্ভবও নয়’ ; যেমন পূর্ণ জাহেলিয়াতের ঘন অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়েও সকল আরববাসী তাঁকে বলেছিল ‘আল-আমিন’ পরম বিশ্বস্ত পরম সত্যবাদী।

মানব সৃষ্টির আলিকাল থেকে মানুষ মানুষেরই মধ্যে আদর্শ অনুসন্ধান করে আসছে। কিন্তু মানুষের পর্যবেক্ষণ ও বিচাক্ষমতা কোনদিনই খুব একটা নীরোগ ও সম্পূর্ণ ছিলনা, বরং ছিল নানা ধরনের কুহক ও বিভ্রম ও তাকৎক্ষণিক আত্মস্বার্থ দ্বারা চালিত। এই কারণে মহত্ব কখনো অতিরঞ্জিত হয়েছে, অথবা জেনে শুনে কখনো অপাত্রে আরোপিত হয়েছে্, অথবা মানুবিক সুষমা ও সৌন্দর্য ও সম্পূর্ণতার পরিবর্তে সমসাময়িক চাহিদা অনুযায়ী, মহত্ব বিচারের মাপকাঠি ধরা হয়েছে অলৌকিকত্ব কি ক্ষমতা কি আপাত-অজেয় চাতুর্যশক্তি। একদা রোমানদের আদর্শ ছিল জুলিয়াস সিজর,গ্রীক বুদ্ধিজীবিদের আদর্শ ছিল প্লেটো-এ্যারিস্টটল, আধুনিক বুদ্ধিজীবিদের আদর্শ বাট্রান্ড রাসেল অথবা সাঁত্রে, সাম্যবাদী কমরেডদের কাছে মার্কস কি লেনিন কি মাও, মার্কিনিদের কাছে লিঙ্কন বা ওয়াশিংটন, কবিদের কাছে আদর্শ হলো গ্যেটে, রবীন্দ্রনাথ বা সেক্সপীয়ার-আবহমান ইতিহাসের প্রচ্ছদে এইরকম কত যে অসংখ্য আদর্শ ছড়িয়ে আছে, ছড়িয়ে ছিল তার শেষ নেই। তাঁদের সম্মানিত অবস্থান নিয়ে তর্ক করা বাহুল্য,কারণ স্ব স্ব যোগ্যতা বলে এই গুণান্বিত পুরুষেরা যে যথার্থই মানুষের সম্ভ্রম অর্জন করেছিলেন, এটা সত্য। কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্য হলো তাঁরা কেউই সম্পূর্ণ নন, তাঁরা পরিপূর্ণ মানবতার এক অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। তাঁরা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য আয়ত্ব করেছেন সত্য কিন্তু সার্বিক বিচারে‘সবোত্তম হওয়াতো দূরের কথা, উত্তমই নন। চার্চিল ছিলেন কূটনৈতিক মিথ্যাচারের‘বিশ্ব ওস্তাদ’, রুজভেল্ট নিজে নিজের সম্পর্কে বলেছেন,তাঁর গৃহীত সিদ্ধান্ত সমূহের শতকরা পঞ্চান্ন থেকে ষাট ভাগ ছিল ভুল। লেনিন ছিলেন নিষ্টুর, তাঁর আদর্শই ছিল নরহত্যা; মার্কস প্রতিভাবান কিন্তু পাগলাটে ও বাস্তব-জীবন-বিচ্ছিন্ন। আর মাও সেতুং? অনেক গুণের অধিকারী কিন্তু তিনি ছিলেন নির্বিচারে বৈভববিলাসী ও নির্বিচেক নারী-নিপীড়ক। আব্রাহাম লিঙ্কন সন্দেহ নেই একজন বড় মাপের মানুষ, কিন্তু তাঁর স্ত্রী তাঁকে অতিশয় নগণ্য ও উপেক্ষার যোগ্য বলেই জ্ঞান করতেন। এবং ঋষিপ্রতিম গান্ধী গভীর দুঃখের সঙ্গে এই স্বীকারোক্তি করেছেন, মৃত্যুপথযাত্রী জননীকে ফেলে তিনি অন্য কক্ষে সস্ত্রীক নিশিযাপনের তুচ্ছ আরামটুকু পরিহার করতে পারলেন না বলেই, তাঁর জননী তাঁর কোলে মাথা রেখে শেষ-নিশ্বাষ ত্যাগ করবেন, তা হলোনা। বাট্রান্ড রাসেল একজন শান্তিকামী ও অঙ্কবিদ ও দার্শনিক বটে কিন্তু ভেতরে ছিলেন আত্মসংযমে অক্ষম ও রিরংসু। গ্যেটে ছিলেন পদ-লিপ্সু ও রাজশক্তি-কেন্দ্রের যথাসম্ভব নিকটবর্তী থাকার চেষ্টায় একটি ঘূর্ণায়মান লাটিম। আর আমাদের রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই মহাকবি ও দেবোপম, কিন্তু ছিলেন খুবই প্রচারব্যগ্র ও প্রজাপীড়ক। জগদ্বিখ্যাত কলম্বাস ছিলেন মিথ্যাবাদী ও লোভী। জাহাজ থেকে যিনি প্রথম ভূমি দেখতে পাবেন তার জন্য নির্ধারিত ছিল পুরস্কারস্বরূপ একটি বড় মাসোহারা; কিন্তু সত্য সত্যই যিনি দেখেছিলেন তাকে প্রতারণা করে কলম্বাস নিজে এই মাসোহারা আত্মসাৎ করেছিলেন। আর ক্যালেন্ডার দেখে দেখে চন্দ্র কি সূর্যগ্রহণের ভবিষ্যদ্বাণী করে সরলমনা রেড-ইন্ডিয়ানদের কাছে তিনি যে দেবতা সেজেছিলেন সেই চালাকির কথা তো বহুবিদিতি। বরং এ-তুলনায় কালোমানিক পেলে অনেক ভালো। তাঁকে একটি অর্ধমিনিটের বিজ্ঞাপনে অংশগ্রহণের জন্য একদা প্রস্তাব করা হয়েছিল। একটি সিগারেট কোম্পানীর হয়ে পেলে শুধু বলবেন, ‘হায়! আমি পেলে এবং আমি ধূমপান করিনা কারণ এটা আমার স্বাস্থ্য ও শিশুদের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু আমি যদি ধূমপান করতাম তাহলে এই সিগারেটই পান করতাম’। দশ মিলিয়ন ডলারের এই প্রস্তাব পেলে প্রত্যাখান করেছিলেন। এবং মেরি টেলর,ফিলাডেলফিয়ার অনিন্দ্যুন্দরী রমনী যাকে ‘প্লেবয়’ ধরনের একটি পত্রিকার প্রচ্ছদে ছবি দেবার জন্য ল্যারি নামক এক ধনাঢ্য ব্যক্তি টাকার অঙ্ক বাড়াতে বাড়াতে শেষ পর্যমত্ম দশ লক্ষ ডলার অফার করেও এই নারীকে রাজী করাতে ব্যর্থ হলো। কী অসাধারণ ও পুত চরিত্রের অধিকারিণী এই নারী। ডলারের কাছে সম্পূর্ণরূপে খরিদ হয়ে যাওয়া ক্রীতদাসরূপী আধুনিক পাশ্চাত্যবিশ্বের একেবারে বিপরীত মেরুতে দণ্ডায়মান এই মহীয়সী নারী সারা জগতের এক নিঃশব্দ অহংকার। অথচ এর চেয়ে অনেক কম টাকায় ও তুচ্ছ কারণে বিক্রি হয়ে গেছে বহু পৃথিবীবিখ্যাত আদর্শবান পুরুষ। কম্যুনিষ্ট মেনিফেস্টোতে উল্লেখ আছে, টলস্টয় ছিলেন‘সাম্যবাদী’ কিন্তু ‘ফিউডাল সাম্যবাদী’, অনেকটা ব্রেখটের মতই, যে-ব্রেখট বলতেন-আমি সাম্যবদের একজন একনিষ্ট ভক্ত বটে কিন্তু এই ভক্তির কারণে আমি আমার বাড়ি ও গাড়ি হারাতে রাজী নই। ইতিহাসে মহামানবরূপে চিহ্নিত এক-একটি ব্যক্তির এই হলো উদাহরণ। কিন্তু এসব উদাহরণই অস্বাভাবিক নয়, বরং খুবই স্বাভাবিক। আসলে যা বলতে চাই তা হলো, আমাদের জ্ঞাত ইতিহাসের পাতায় পাতায় যাঁরা মহামানবরূপে বৃত ও অভিনন্দিত, তাঁরা সবাই ছিলেন নানা দিকে নানা রূপ স্ববিরোধিতা ও মানবিক দুর্বলতার স্বাভাবিক শিকার। বুদ্ধদেব ‘নির্বাণ’ লাভ করেছিলেন কিন্তু তা ছিল প্রকৃতপক্ষে জীবনের রূঢ়তা থেকে পলায়নপরতারই নামান্তার এবং শ্রীচৈতন্যের ‘সর্বপ্রেমের’ প্রকৃষ্ট আহবান ছিল সত্যাসত্যের ব্যবধানলুপ্ত এক আপোষকামী আপাতমধুর সমন্বয়ধর্মিতা। কনফুসিয়াসের শিক্ষা ও তাঁর নিজের ব্যক্তিগত জীবন ছিল মোটামুটি উৎকৃষ্ট কিন্তু তিনি ছিলেন নিতান্তই চীনা সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ এক ভাষ্যকার, যাঁর অবস্থান ছিল সর্বমানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বহু দূরবর্তী। এবং এই কনফুসিয়াসের শিক্ষা তাঁর সমসাময়িক রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাবিধানে কিছু সাফল্য বয়ে আনলেও, সেই শিক্ষায় মানুষের ব্যক্তিজীবন খুব একটা আলোকিত হয়নি। এবং বহু বিখ্যাত সন্ত পল সত্যই কতটা ‘সন্ত’ ছিলেন তা তর্ক ও গবেষণাসাপেক্ষ কিন্তু তিনি ছিলেন প্রশ্নাতীতভাবে চতুর। এবং এই সাধু যিনি জীবদ্দশায় ছিলেন যীশুখ্রীষ্টের প্রধানতম শত্রু, যীশুর পর তিনিই হয়ে গেলেন যীশুর ‘স্বকণ্ঠ নির্দেশবলে’ যীশুর প্রতিনিধি। তারপর ‘যীশুকথিত বাণীর এই নবব্যাখ্যাকার সব নিষিদ্ধ বস্ত্তকে সিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হলেন না, সম্পূর্ণ অনুচিত ও অসম্ভব ও অবৈজ্ঞানিক এক তত্ত্ব- Doctrine of Atonement প্রায়শ্চিত্তবাদ- উপহার দিয়ে বিশ্ববিখ্যাত হয়ে গেলেন। আবারও উল্লেখ করি এ-সব অস্বাভাবিক নয়, এই ধরনের বহু চাতুর্য ও আত্নবিভক্ত, বহু ফাঁক ও ফাঁকি নিয়েই মানবচরিত্র। কোন ‘মহামানবই এমন নেই যার বিকীর্ণ আলোকরশ্মিও ভেতরে বাইরে প্রকাশ্যে কি গোপনে ছড়িয়ে নেই কৃষ্ণবর্ণ কিছু কিছু মেঘপুঞ্জ। সর্বকালের ইতিহাসে কেবল একটিই ব্যতিক্রম, তিনি হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)।

আল্লাহ পাক তাঁকে বলেছেন ‘সর্বোত্তম আদর্শ’। আগেই বলেছি, আলস্নাহ যদি কোরআন পাকে এই উচ্চারণ থেকে বিরতও থাকতেন, পৃথিবীর সরল ও সত্যপ্রিয় ও চক্ষুষ্মান মানুষ মহানবী(সাঃ)কে মানবাদর্শের ‘সর্বোত্তম’ নমুনা হিসাবেই স্বীকৃতি দিত। তাঁর পেশকৃত ‘তাওহীদবাদ’ কি ‘রিসালাত’ নিয়ে মতানৈক্য ঘটতে পারে, বক্রদৃষ্টিসম্পন্ন হতভাগারা তাঁকে নবী বলে না-মানতে পারে কিন্তু মানুষ হিসানে তাঁর নিখাদ ও সর্বকালজয়ী সতত-সমুজ্জ্বল মহত্বকে সেকালের বা একালের বা কোন কালের কোন আবু জেহেলও একবাক্যে মেনে নিতে কোনরূপ দ্বিধা করবেনা, করার কোন পথই নেই। নাজ্জাশীর দরবারে কাফেররা উপস্থিত হয়ে যখন মোহাম্মদ (সাঃ) এর দেশত্যাগী অনসারীদেরকে তাদের হাতে প্রত্যর্পণের আরজু পেশ করলো, নাজ্জাশী জানতে চাইলেন-মোহাম্মদ লোকটা কেমন? মোহাম্মদ(সাঃ) এর সর্বতোভাবে ক্ষতিসাধনে বদ্ধপরিকর এই কাফেরদের অন্তর শত্রুতার আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে কিন্তু নবী (সাঃ) এর দীর্ঘ চল্লিশ বৎসরাধিক-কালের জীবন থেকে এমন একটি সামান্য ত্রুটিও তারা খুঁজে পেলোনা, যা নাজ্জাশীর কাছে তুলে ধরা যায়। কাফেররা তাঁকে বুঝতে না পেরে অথবা অন্ধ একগুঁয়েমিবশত যাদুকর বলেছে, কবি বলেছে, ভুতে পাওয়া উন্মাদ বলেছে কিন্তু কেউ কখনো বলেনি, তিনি মিথ্যেবাদী কি দুশ্চরিত্র অনির্ভরযোগ্য প্রতিশ্রুতিভঙ্গকারী বা লোভী। তাঁকে হত্যা করবার জন্য বহু নিষ্ঠুর পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে কিন্তু এই নৃশংস দুশমনেরা কেউ বলেনি, মোহাম্মদ অসৎ বা দুষ্ট প্রকৃতির, হিংসুক বা স্বার্থপর বা কলহপ্রিয়্ । তাহলে? প্রাণঘাতী শত্ররাুই যখন একটিও কোন দোষের কথা বলেনা, বলতে পারেনা, তখন আর সন্দেহ কি যে তিনি সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বোত্তম। হেরা পর্বতের গুহায় যেদিন প্রথম জিব্রাঈল (আঃ) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো, ভয়ে-আতঙ্কে তিনি কাঁপতে কাঁপতে ফিরে এলেন ঘরে। এবং এসেই খাদীজা (রাঃ)কে বললেন,‘আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমি বোধহয় বাঁচবোনা।’সেই মুহূর্তে খাদীজা (রাঃ) তাঁকে অভয় দিয়ে কি বলেছিলেন? বলেছিলেন,‘অসম্ভব আল্লাহ আপনাকে কিছুতেই অসম্মানিত করবেননা এবং খ্যাতির যথোচিত প্রসার না-ঘটিয়ে তুলেও নেবেন না। কারণ মানবতার চরমোৎকর্ষের যে মূল সাতটি গুণ তা সবই আপনার মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। আপনি আত্মীয়তার হক আদায়কারী,সর্বদা সত্যবাদী,পূর্ণমাত্রায় বিশ্বাসী আমানতদার,অনাথ অক্ষম এতিম বিধবা প্রতিবন্ধীদের ভার বহনকারী,অভাবগ্রস্ত বেকারদের জন্য উপার্জনের ব্যবস্থা গ্রহণে সদা সচেষ্ট। অথিতিদের প্রতি যত্নবান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় দুস্থ মানুষের নিকটতম বন্ধু ও সাহায্যকারী; এতগুলি মানবিক গুণের পূর্ণতম বিকাশ ঘটেছে যাঁর চরিত্রে , কোন সন্দেহ নেই,আল্লাহপাক তাঁকে অবশ্যই সাফল্য দান করবেন। বলাই বাহুল্য, দীর্ঘ পনের বছরের একান্ত জীবনসঙ্গিনীর এই বক্তব্য। কে না জানে প্রকৃত রহস্য উন্মোচনে স্বামী প্রসঙ্গে স্ত্রীর সাক্ষই হলো সর্বাপেক্ষা নির্ভুল ও অকাট্য; অতএব এই সাক্ষ্য থেকেও সন্দেহবাদীরা অনুমান করতে পারে মোহাম্মদ(সাঃ) কেমন ছিলেন, কী অনুপম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন তিনি। অথচ নবী (সাঃ)এর চরিত্র বৈশিষ্ট্য যখন সর্বমান্য এবং সর্বগ্রাহ্যরূপে মক্কাবাসীদের কাছে একটি অবিসংবাদিত সত্য, একটি পরম গৌরবের বস্ত্ত, তিনি তখনো নবী হননি; অন্তত লোকসমক্ষে এবং তাঁর নিজের কাছেও নবুয়্যতের বিষয়টি তখনো লুক্কায়িত ও অজ্ঞাত ও অঘোষিত। অতএব নবুয়্যত পূর্ব জীবনেই যিনি পুত-পবিত্র ও ত্রুটিহীন ও কলঙ্কশূন্য এক সর্বজনস্বীকৃত মহান চরিত্রের অধিকারী , তাঁর কিঞ্চিদধিক বাইশ বছরের নবুয়্যতি-জিন্দেগীর মহত্ব নিয়ে কোন প্রশ্নই ওঠেনা।

সব নবী রাসূলই নিষ্পাপ ও সর্বপ্রকার মানবিক দূর্বলতা থেকে মুক্ত। কারণ যাই হোক,তাঁদের প্রকৃতিই এমন যে, কোন পাপ কি অন্ধকার তাঁদেরকে স্পর্শই করতে পারেনা। ইতিহাসবিশ্রুত মহামানবদের সঙ্গে নবী রাসূলদের একটি বড় প্রভেদ হলো, অন্যেরা দুএকটি বিশেষ দিকে কিছুটা আলোকোজ্জ্বল বটে কিন্তু তাঁদের জীবেনর বাকি অংশে তাঁরা খুবই সাধারণ। অনেক দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছি, এতদসঙ্গে আরো দুএকটি উল্লেখ করতে পারি। সিজার ছিলেন প্রজাবৎসল, বীরও ছিলেন অথচ আততায়ীর হাতে নিহত হবার বহু আগেই আত্মজয়ে অক্ষম এই বীর ধরাশায়ী হয়েছিলেন ক্লিওপেট্টার মোহিনী শরবর্ষণে। এ্যান্টনিও একই রকম, গ্লানিদগ্ধ এই বীরপুরুষ জীবনের সঙ্গে রণে ভঙ্গ দিয়ে ক্লিওপেট্টার উচ্ছিষ্ট যৌবনের মদির পেয়ালায় হাবুডুবু খেতে খেতে শেষপর্যন্ত আত্মতহ্যা করেছিলেন। আর একালের মহামতি আইনস্টাইন মস্তিষ্কচর্চায় মেধাবী ও বাহ্যত মানবপ্রেমী বটে কিন্তু মানুষটি প্রকৃতপক্ষে দায়িত্বহীন ও আপন খেয়ালের হাতে স্বেচ্ছাসমর্পিত এক ‘নকল ভালমানুষ’।এবং এই কারণে তাঁর বিশেষ অনুরাগী জীবনীলেখকদের ও সংশয় জাগে যে, তাঁর সারল্য সম্ভবত অকৃত্রিম নয়, এই সারল্য লোকসমক্ষে উপস্থাপনকল্পে একটি প্রস্ত্তত নাটক। এই হেতু ,যেখানে অভিনয় করবার কি সতর্ক ছদ্মবেশ ধারণের সুযোগ ছিলনা, সেখানেই ধরা পড়ে গেছেন এই মহামানব। পরিত্যক্ত প্রথমাকে অর্থদানে ‘বাধিত করা ও অতি-তরুণী দ্বিতীয়াকে সর্বস্ব সমর্পণ-কোনটাই মহামানবোচিত নয়। আইনস্টাইন আণবিক বোমার মর্মান্তিক ধ্বংস ক্ষমতাদৃষ্টে‘খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন সত্য, কিন্তু এই বোমা নির্মাণের জরুরী অনুরোধ জানিয়ে রুজভেল্টকে যিনি প্রথম চিঠি লিখেছিলেন তিনি আইনস্টাইন। এবং এই মহামানব ছিলেন এতটাই নিপুণ ও অক্লান্ত ‘সুরসিক’ যে, কৌতুকবর্ষণে তিনি স্থানকালপাত্র জ্ঞানকে খুব কমই বিবেচনায় আনতেন, যে কারণে তাঁর কৌতুক মাঝে মাঝেই অনাবশ্যক নিষ্ঠুরতার জন্ম দিত। তাঁকে একদা কোন দুঃস্থ সঙ্গীতঙ্গ আর্থিক কষ্টের কথা জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন; আইনস্টাইন প্রত্যুত্তরে তাঁকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন ও খবরের কাগজ না পড়ার ‘সদুপদেশ’ দিয়েই মহান দায়িত্ব সম্পাদান করেন। কিন্তু নবী রাসূলদের জীবনের সংগঠনই আলাদা। তাঁদের মস্তিষ্ক ও হৃদয়, শরীর ও শরীরের সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, তাঁদের অভিপ্রায় স্বপ্ন ও কথা ও কল্পনা সবকিছুই অকল্পনীয়রূপে সৎ ও পবিত্র এবং চূড়ান্ত ঔচিত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।এইজন্যই নবীরাই অবশ্যই এক একজন সাহসী যোদ্ধা কিন্তু তাঁরা কেউই এতটুকু নৃশংস হতে পারেন না; তাঁদের সমগ্র চেতনায় সর্বক্ষণ জড়িয়ে থাকে মুগ্ধতা ও সৌন্দর্যবোধ কিন্তু কণামাত্র অশ্লীলতার কোন আভাস মেলেনা। প্রেম ও সেণহে নবীদের অন্তর সর্বদাই কুসুমের চেয়ে কোমল, ক্ষমা ও ঔদার্যে ভরপুর কিন্তু সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় তাঁদের ভূমিকা সামান্যতম শৈথিল্য কি দুর্বলতা দ্বারাও এতটুকু বিচলিত হয়না। মোহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন এই পুত-চরিত্র নবীদের নেতা, সকল নবীর সম্মিলিত শ্রেষ্ঠত্বের চেয়েও বড়; অতএব তাঁর চরিত্রের উৎকর্ষতা যে কী চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল তা বস্ত্ততই কল্পনাতীত।

কথার শেষ নেই, শেষ হবারও কথা নয় কারণ অনমত্মকাল ধওে বর্ণনা করলেও এই বর্ণনার শেষ হবেনা। এইজন্যই আল্লাহপাক সংক্ষিপ্ত ও চূড়ান্ত কিছু বিশেষণ সহযোগে মানব সম্প্রদায়কে বুঝিয়ে দিয়েছেন, অনন্ত মহাশূন্যের মত অনন্ত মহত্বে মুভ্রতম ও সততোজ্জ্বল এক দীপাধার এই মোহাম্মদ(সাঃ)। সত্যই মহানবী (সাঃ) এর গুণগত উৎকর্ষতা এমন উচ্চতম চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যা যে কোন মানুষের ধারণা ও কল্পনারও অতীত। যখন দেখি তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে কণামাত্র অসংগতিও নেই, নেই এতটুকু স্ববিরোধিতা, যখন দেখি পার্থিব ও পারলৌকিক উভয় জগতের বিশাল প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে যে আদেশ নির্দেশ ভয় ও নিষেধ ও দায়িত্বের কথা তিনি বলেন, তিনি নিজে নেই উচ্চারণের পরিপূর্ণতম নিখুঁত প্রতিকৃতি, তখন আর বুঝতে কষ্ট হয়না আল্লাহপাক কর্তৃক বিঘোষিত বিশেষণসমূহ কী অমোঘ। পবিত্র কোরআন শরীফে যত কথা আছে মোহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন তার প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের এক নির্ভুল অবয়ব। তাঁর তেষট্টি বছরের যে নতিদীর্ঘ পার্থিব জীবন, পবিত্র হাদীস গ্রন্থসমূহ সেই জীবনের এক অতি বিশ্বস্ত দর্পণ; ক্ষুদ্র বৃহৎ খুঁটিনাটি সব কথা ও কাজের একটি হুবহু লেখ্যরূপ্ এই হাদীস শরীফ থেকে এটা প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণিত, জীবনের যে কোন বিষয়ে তিনিই উৎকৃষ্টতম নমুনা। কোন একটি বিষয়েও তাঁর পেশকৃত নিয়ম ও নির্দেশের চেয়ে উৎকৃষ্টতর কিছু হয়, তা ভাবাই যায়না। মানুষ স্বভাবতই বড় অগভীর ও সত্যমিথ্যা সম্পর্কে উদাসীন এবং প্রায় সততই চিত্ততারল্য ও ছেলেমানুষি তর্কপ্রবণতা দ্বারা চালিত ফলে অনেক মানুষই তাঁকে চিনতে পারছেনা। । অনেক মানুষ তাঁকে চিনেও চিনতে পারছেনা। অথচ আদৌ বেগ পাবার কথা নয়, নবী মোহাম্মদ (সাঃ) যে কী বিশাল মহিমা ও মহত্ব ও পূর্ণাঙ্গ সৌন্দর্যের অধিকারি ছিলেন তা খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়। এমন মানুষ কি পৃথিবী কখনো দেখেছে, যে-কোন বিষয়ে যাঁর এক-একটি কথাই কোটি কোটি অনুসারীর জন্য সর্বকালোপযোগী এক-একটি অবশ্যমান্য অপরিবর্তনীয় আইন। একটি মানুষ সত্যই কী অভাবিত পর্যায়ে উত্তীর্ণ হলে এটা সম্ভব যে, বাথরুম থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে, মেহমানদারি থেকে রাষ্ট্রপরিচালনার উচ্চতম দফতর পর্যন্ত তিনি যে বিষয়ে যা বলেছেন তাই-ই অকাট্য। নিদ্রায় কি জাগরণে বিশ্রাম কি সফরে সজনে বিজনে গৃহে কি সমজিদে সংকটে সাফল্যে তিনি যা করেছেন যেভাবে করেছেন, যা বলেছেন যেটুকু বলেছেন তা সবই চিরদিনের জন্য চূড়ান্ত হয়ে গেল। অথচ কত কংগ্রেস কত মনীষী-সমন্বিত উর্বও পার্লামেন্ট কত কত আইন ও ধারা উপধারা তৈরি করেছে কিন্তু সম্মিলিত মেধা ও প্রজ্ঞাপ্রসূত সেই আইন কোনটাই বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, পুনঃ পুণঃ বর্জন ও সংশোধন ও পরিমার্জনই হলো এই সব আইনের স্বাভাবিক নিয়তি ও পরিণতি। অথচ কী বিস্ময়কর, খেজুরপাতার ছাউনি দেয় একটি জীর্ণ মসজিদ বা ততোধিক জীর্ণ একটি অপরিসর বাসগৃহ বা যখন যেখানে আছেন সেখান থেকে একেবারেই অক্ষর পরিচয়হীন একটি মানুষ যা বললেন, তাই হয়ে গেল সর্বকালের সমল মানুষের জন্য এক অক্ষয় ও চিরন্তন ঐশ্বর্য। শুনতে যাই হোক এটা সত্য , নবী (সাঃ) শেখানো এমনকি বাথরুম প্রবেশের একটি দোয়াও অত্যাবশ্যক বিবেচনায় কোটি কোটি মুসলমান যেভাবে হাজার হাজার বছর ধরে পাঠ করে আসছে ও করবে, সেই স্থায়িত্বের একটি ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশ অর্জনও যে-কোন অমরত্বলিপ্সু মহাকবির কোন শ্রেষ্ঠতম পংক্তির পক্ষে অসম্ভব।

শত মনীষীর জীবন নিয়ে মাইকেল হার্ট একটি বই লিখেছেন। এই বইয়ে যথোচিতভাবেই মহানবী (সাঃ) কে এক নম্বরে স্থান দেয়া হয়েছে। এই সততা ও ঋজু সত্যপ্রীতি নিঃসন্দেহে প্রসংশনীয় কিন্তু নির্বাচিত মনীষীদের স্থান-নির্ধারণে লেখকের একমাত্র বিবেচ্য ছিল ‘প্রভাব’। লেখকের দৃষ্টি যদি নিবদ্ধ হতো, শুধু প্রভাব কি অবদান নয়, মানবিক মহত্ব ও সৌন্দর্যের উপর, তাহলে মাইকেল হার্ট নিশ্চয়ই অন্যরকম ভাবতেন। অনুমান করি, হার্ট তাঁর প্রকাশককে সম্মত করে এমন একটি গ্রন্থ উপহার দিতেন, যার প্রথমে থাকতো মহানবী (সাঃ) এর কথা এবং তারপর কিছু পৃষ্ঠা সাদা ও শূন্য রেখে শুরু হতো অন্য নীষীদের জীবনী । এবং ওই অপরিহার্য শুভ্র-শূন্য পৃষ্ঠাগুলির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে হার্ট লিখে দিতেন-এটা প্রতীকী, আসলে সৌন্দর্য শুভ্রতা ও পবিত্রতার প্রশ্নে মোহাম্মদ(সাঃ) এর এত বিপুল পশ্চাতে অন্য যে-কোন মাহমানবের কুণ্ঠিত অবস্থান যে, ন্যায় ও সত্যের খাতিরে কোন মনীষীকেই তাঁর সংলগ্ন করা সমীচীন নয়, মধ্যবর্তী সাদা পৃষ্ঠাসমূহ এই সত্যেরই একটি প্রতীকী অভিব্যক্তি। মোহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন বিশ্বজগতের আশীর্বাদ; পবিত্র কোরআনের ভাষায়‘ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল লিল আলমীন।’আপনাকে বিশ্ব জগতের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করা হয়েছে।’ এক বর্ণ এদিক ওদিক নয়, একেবারে শতকরা একশ’ভাগ খাঁটি এই পরিচয়। তাঁর সস্নেহ দৃষ্টি এমন সর্বব্যাপী ও সজাগ ছিল যে, একটি শীর্ণ ক্ষুধার্ত উট দেখলে ও তার মালিককে তিনি দায়িত্ব সম্পকে সতর্ক করে দিতেন;সবাইকে কঠিনভাবে সাবধান করে দিয়েছিলেন-উট ঘোড়া যাই হোক বাহনের উপরই যেন তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপানো না হয়, অপ্রয়োজনে গাছের একটি পাতাও ছেঁড়া নিষিদ্ধ। একটি দুটি নয়, এইরকম বহু তথ্য থেকে এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, শুধু মানুষ নয়, মানুষ তো বটেই, পশু-পতঙ্গ বৃক্ষলতা সবদিকেই তাঁর প্রেম ও মমতা ছিল স্বতোৎসারিত ও সদাজাগরুক। এবং কী অনুপম ও অব্যর্থ এই প্রেম ও প্রেমের সঞ্চরণ যা কেবল তাঁর নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তাঁর লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি অনুসারীর মধ্য দিয়ে এক প্রবাহমান নদীর মতো বয়ে চলেছে সেই প্রেম কাল থেকে কালামত্মরে। পৃথিবীর বয়স কম হলোন, পৃথিবী তার দীর্ঘজীবনের অসংখ্য মহামানবকে দেখেছে। কিন্তু প্রেমে , বীরত্বে , বিনয়ে ঔদার্যে, সততা শুদ্ধতা ও শ্লীলতায়, ত্যাগে ও মহানুভবতায় ত্রুটিহীন বিচার ও বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এমন সর্বাঙ্গ সুন্দর সর্বগুণান্বিত নিখুঁত একটি মানুষ ছিল পৃথিবীর এমনকি ধারণার ও অতীত। এইজন্যই সম্রাট নাজ্জাশী তাঁকে না-দেখেও সর্বচিত্তমথিত শ্রদ্ধা ও আনুগত্য দিয়ে সমর্পণ করেছিলেন নিজেকে, আর প্রবল প্রতাপান্বিত হিরাক্লিয়াস তাঁর অন্তরনিহিত রূপান্তর চাঞ্চল্যকে গোপন করেছিলেন সত্য, কিন্তু সে কেবল রাজ- অমাত্যদের প্রতিরোধ ও বিদ্রোহের আশঙ্কায়। আসলে মোহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন পূর্ণ বৈভবে সতত দীপ্যমান এম সমুজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। মানব ইতিহাসে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের খুব একটা অভাব নেই, কিন্তু ওই সকল জ্যোতিষ্ক সঠিক অর্থে খুবই ক্ষীণপ্রভ খুবই নিষ্কিরণ; এবং বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, তাঁদের আলো দ্বারা অন্যেরা বিশেষ আলোকিতও হয়নি। এক ধরনের পার্থিব মুনাফা অর্জনের লক্ষ ভক্ত ও অনুসারীবৃন্দ তাঁদেরকে পুঁজি হিসাবে ব্যবহার করেছে মাত্র। অথচ মহানবী (সাঃ) ছিলেন এমন এক আলোর অধিকারী যাঁর সংস্পর্শে আসামাত্রই সব অন্ধকারকে পরাভূত করে মানুষের চৈতন্য জেগে উঠতো এক অনিঃশেষ প্রভায়। হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) হজরত ওমর ফারুক (রাঃ) সহ লক্ষ লক্ষ সাহাবীর জীবনচিত্র এর প্রমাণ। জিদ বা অন্ধত্ববশত যে যাই বলুক, জ্ঞান-বিজ্ঞানে অভ্রভেদী এই বিশ্ব কি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে সক্ষম যে, তার শত শত মনীষীসমৃদ্ধ হার্ভার্ড ও অক্সফোর্ড ও হাজার হাজার সমৃদ্ধ লাইব্রেরীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একজন অতি সাধারণ সাহাবীর সমতুল্য মানবিক গুণসম্পন্ন সৎ ও চরিত্রবান একটি মানুষও গড়ে তুলতে পারে। পারে না, পারা সম্ভবও নয়; কারণ সাহাবীরা ছিলেন মোহাম্মদ(সাঃ) নামক এক নিষ্কলঙ্ক দীপাধার থেকে আলোকিত ও প্রজ্জ্বলিত এক-একটি প্রকৃত নক্ষত্র। সে তুলনায় আধুনিক ও পৌরাণিক বহু আলোকবর্তিকা নিতান্তই হঠাৎ ও দ্রুত জ্বলে-ওঠা এবং ততোধিক দ্রুত নিভে যাওয়া এক একটি উল্কামাত্র। অথচ সাহাবীরা তো বটে এমনকি তাবেয়ীন তাবে তাবেয়ীন সবাই চিনে ক্ষুদ্রবৃহৎ এক একটি আসল জ্যোতিস্ক। বলার অপেক্ষা রাখেনা, বিশেষ নিহারিকা থেকে এই সকল জ্যোতিষ্কের জন্ম, তিনি নবী মোহাম্মদ (সাঃ) । এবং এই নবী (সাঃ) এর চরিত্রমহিমা থেকে বিচ্ছুরিত আলোর স্বরূপই আলাদা, যে কারণে তাঁর মৃত্যুও সঙ্গে সঙ্গে সেই আলোকরশ্মি নিঃশেষ কি নিষ্প্রভ হয়ে যায়নি; আল্লাহপাক এমন অক্ষয়ভাবে সংরক্ষণ করেছেন যে, রোজ- কিয়ামত পর্যন্ত এই আলো বিকীর্ণ হতে থাকবে। বধির ও জন্মান্ধরা যাই বলুক, এটা কোন ভক্তের অত্যুক্তি নয়, এটা সর্বকালীন শাশ্বত বাস্তবতা। আশ্চর্য নয় কি যে, এই পৃথিবীতে এমন একটি মুহূর্ত নেই, একটি স্থান নেই যেখানে মহানবী (সাঃ) এর পবিত্র নাম কোটি কোটি কণ্ঠে সর্বাধিক শ্রদ্ধায় ও অনুরাগে সরবে-নীরবে উচ্চারিত না হচ্ছে। আল্লাহপাক অবশ্য কোরআন শরীফে দ্ব্যর্থহীনভাবে এই ভবিষ্যদ্ববাণী আগেই করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনার সূচনা অপেক্ষা আপনার পরিণতি অনেক উৎকৃষ্ট’ এবং বলেছেন ‘ সুউচ্চে তুলে ধরা হয়েছে আপনার নাম’। পৃথিবীর মানুষ আজ হতবাক হয়ে দেখছে, একজন মানুষের ‘পরিণতি’ সত্যই কী সীমাহীন উজ্জ্বলতা ও ‘নাম’ কী অপরিমেয় উচ্চতা লাভ করতে পারে। এবং এই ঔজ্জ্বল্য ও নাম কী অবিনশ্বর তাও দেখছে। এবং দেখছে মোহাম্মদ (সাঃ) তো বটেই, এমনকি তাঁকে নিয়েও সপ্রেম অনুরাগে যাঁরা যেটুকু লিখেছেন, সেই রচনাও তাঁরই নামের মহিমায় আল্লাহপাকের অভিপ্রায়ে চিরকালের জন্য এমন স্থায়ী রূপ পরিগ্রহ করলো, যে-অনুরণন কখনো থেমে যাবেনা। শেখ সাদী (রাঃ) এর ‘বালাগাল উলা বি কামালিহি ’ নাতটি এর প্রমাণ মাত্র চারটি পংক্তি অথচ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে কিন্তু এই চতুর্পদী নাতটি বেঁচে থাকবে চিরদিন চিরকাল । পূর্ণতম শুদ্ধতা ও পবিত্রতা ও সৌন্দর্যে প্রস্ফুটিত না হলে কি এই অসম্ভব সাফল্য লাভ করা সম্ভব।

এইজন্যই কোন গবেষক যদি পৃথিবীর সব অভিধান তন্ন তন্ন করে খুঁজে দুটি তালিকা প্রস্থুত করেন- একটি ত্রুটি ও কলঙ্কের, অপরটি গুণ ও সৌন্দর্য ও সততার-তাহলে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষায় তিনি দেখতে পাবেন মহানবী (সাঃ)এর মধ্যে তালিকাভুক্ত একটি ত্রুটিও নেই; এবং বহু পরিশ্রমে প্রস্ত্ততকৃত তালিকায় এমন কোন গুণই নেই যা মোহাম্মদ(সাঃ) এর মধ্যে অনুপস্থিত। অর্থাৎ তিনি সর্বপ্রকার ত্রুটি ও ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্ত এক সর্বগুণান্বিত সর্বোৎকৃষ্ট ও ধারণাতীত সৌন্দর্যের অধিকারী সর্বোত্তম সুন্দরতম মানুষ। এইজন্যই ব্লাসফেমিই আইনের খুব একটা আবশ্যকতা নেই। নেই এইজন্য যে ,হাজার হাজার বছরের মানববংশে এমন কোন মহামনবের সাক্ষাৎ কি এই পৃথিবী কখনো পেয়েছে যিনি বলতে পারেন বা পারতেন-তোমরা আমার সম্পর্কে যা জানো , গোপন কি প্রকাশ্য, সবকিছু সবাইকে জানিয়ে দিও। কণামাত্র কোন ত্রুটি থাকলেও কি এভাবে বলা যায়? অতএব এমন পরম পবিত্র মহাব্যক্তিত্বের সুরক্ষার জন্য কোন আইনের প্রয়োজন পড়েনা। যারা মহানবী (সাঃ) এর উপর স্বকপোলকল্পিত উদ্দেশ্যমূলক কলংক লেপন করে কথা বলে, ইবলিশের সেই শিষ্য-প্রশিষ্যদের কাজই হলো সত্য ও সুষমার বিরম্নদ্ধে তৎপরতা অব্যাহত রাখা। তারা নিন্দুক নয়, তারা মিথ্যাবাদী; তস্কর কি জালিয়াতদের যে আইনে বিচার হয় , এই মিথ্যাবাদীরা সেই আইনেরই আওতাধীন। এই মিথ্যাবাদীরা কিসের ক্রীতদাস কাদের ক্রীতদাস তারাই জানে। এবং বলা বস্ত্তই বড় দুরূহ, কেবল আল্লাহপাক জানেন, নিশ্চয়ই কোন গূঢ় রহস্য আছে এই মূঢ় মিথ্যাচারিতার। অবশ্য এ-নিয়ে আমাদের কোন কৌতুহল নেই; শুধু দুঃখ হয এই ভেবে যে , সত্য ও সুন্দরের বিপরীতে কত মানুষ কত সস্তায়ই-না একেবারে পানির দামে বিক্রয় হয়ে গেল।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s